টানা তাপপ্রবাহ

শিখন ঘাটতি পোষাতে সমাধান অনলাইন ক্লাসের পরামর্শ

পবিত্র রমজান, ঈদুল ফিতর ও গ্রীষ্মকালীন অবকাশ শেষে টানা ২৬ দিন পর গত ২১ এপ্রিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার কথা ছিল। তবে দেশজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় দীর্ঘ ছুটি শেষেও পুনরায় এক সপ্তাহ বন্ধ রেখে গত রবিবার থেকে স্কুল-কলেজ খুলেছে। তবে তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে স্কুল খোলায় বিপাকে পড়ে শিক্ষার্থীরা।  খোলার দিন দুই শিক্ষক এক শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয় গরমজনিত কারণে। এ ছাড়া অসুস্থ হয়ে পড়ে আরও অনেকে। পরবর্তীতে হাইকোর্টের নির্দেশনায় আবারও বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে স্কুল-মাদ্রাসার ক্লাস।

টানা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় নির্দিষ্ট সময়ে সিলেবাস শেষ করা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন শিক্ষকরা। এমন পরিস্থিতিতে শিখন ঘাটতি পোষাতে অনলাইন ক্লাসে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন শিক্ষাবিদরা। অভিভাবকদের মধ্যেও অনেকেই এই মত দিয়েছেন। ইতিমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকসহ আরো কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইন ক্লাসের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এছাড়া রাজধানীর বেশ কয়েকটি স্কুল-কলেজেও অনলাইন ক্লাস নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা বিবেচনায় নিয়ে সময়ের চাহিদা অনুযায়ী অনলাইনে ক্লাসের পরিধিও বাড়ানো প্রয়োজন। মহামারির ঝুঁকি বা এ ধরনের সংকটে ভবিষ্যতে দীর্ঘ সময় শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার বাইরে থাকবে না। এছাড়া বন্ধ থাকার চাপটাও শিক্ষার্থীদের উপর পড়বে না। এক্ষেত্রে করোনাকালীন সময়ের অভিজ্ঞতাটা কাজে লাগানো যায় বলে পরামর্শ দেন তারা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, বর্তমানে হচ্ছে কমিউনিকেশনের যুগ। এই সময়ে আমাদের অভিভাবকদের কাছে সংশ্লিষ্ট ডিভাইসগুলো আছে। গ্রামাঞ্চলেও অনেকটা একই পরিস্থিতি। এই ধরনের দুর্যোগ দুর্বিপাকে শিক্ষা কার্যক্রম যেন ব্যহত না হয়, সেজন্য অনলাইনে যাতে ক্লাসগুলো নেওয়া যায় সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

তিনি বলেন, এটি করতে পারলে শিক্ষার্থীদের মাঝে স্মার্টনেস বাড়বে, প্রযুক্তির সাথে তাদের সংযুক্ত হওয়ার ক্যাপাসিটিও বাড়বে। ফলত একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবনে ব্যহত হবে না, বন্ধ থাকার কারণে তাদের উপর অতিরিক্ত চাপ শুক্রবার খোলা রাখার, শনিবার খোলা রাখার এসব চাপ তাদের উপর পড়বে না। এবং শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তির বিষয়ে সচেতন হবে কিভাবে প্রযুক্তির ব্যবহার করা যায়। আর এই অভিজ্ঞতা তাদের পরবর্তী শিক্ষা ধাপেও কাজে লাগবে এবং ধীরে ধীরে তারা আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষার্থী হওয়ার যোগ্যতার দিকে ধাবিত হবে। আমরা যদি প্রাইমারি লেভেল থেকেই এই ব্যবস্থাটা রাখতে পারি, তাহলে   দূর্যোগ দুর্বিপাকে অনলাইন প্লার্টফর্ম ব্যবহার করে ক্লাস সচল রাখতে পারব। আর তাতে সম্ভাব্য ক্ষতি এড়াতে পারব।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. সীতেশ চন্দ্র বাছার দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা যেকোন সময় বিরুপ পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে পারি। বিশেষ করে বর্তমানে এশিয়া উপমহাদেশে তাপদাহ চলছে। এর কারণে প্রায় সব দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ব্যহত হচ্ছে। এক্ষেত্রে আমাদের যে পূর্ব অভিজ্ঞতাটা ছিল করোনাকালীন সময়ে অনলাইন ক্লাসের, সেটি কাজে লাগাতে পারি। যার ব্যবহার আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইতিমধ্যে করছি। যার জন্য আমাদের সেশনজট হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

তিনি আরো বলেন, গত দুই মাস ধরে স্কুল, মাদ্রাসা এবং কলেজগুলো প্রায় বন্ধ ছিল, কিছুটা তো ক্ষতি হয়েছে। প্রাইমারি থেকে মাধ্যমিক এবং কলেজ সকল পর্যায়ে আমরা করোনাকালীন সময়ে অনলাইন ক্লাস করেছি। এই সিস্টেমটাকেই যদি আমরা ডেভেলপ করতে পারি, কাজে লাগাতে পারি। তাহলে এই।ঘাটতিগুলো তৈরি হবে না। আমরা এখন ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকার হয়েছি, আগামীতে স্মার্ট বাংলাদেশে পরিণত হবো। এই বিষয়গুলোকে যদি আমরা সমন্বয় করে ফেলতে পারি, তাহলে অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম ব্যহত হবে না। 
 
এদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়ার চাহিদা বাঞ্ছনীয় নয় বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধে এক ধরনের মানসিকতা তৈরি হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, স্কুল গরমের জন্য বিপজ্জনক, আর মাঠ-ঘাট নয়? যেসব জেলায় তাপমাত্রা কম সেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়ার তো কোনো কারণ নেই।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী খন্দকার হাসান শাহারিয়ার এক আইনি নোটিশে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সিলেবাস কমিয়ে মে থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালুর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়। যদি একান্তই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলতে হয় তাহলে মে থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত তাপপ্রবাহের সময়ে ক্লাসের সময় সকাল শিফট ভোর ৬টা থেকে সকাল ৮টা এবং ডে শিফট সকাল সাড়ে ৮টা থেকে সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত চালু রাখার কথা বলা হয়।