বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজের ছাত্রাবাসে কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি শৈশব রায়ের অনুসারীরা আধিপত্য বিস্তার করতে না পারায় হোস্টেলের ৬টি কক্ষে লাঠি, এসএস পাইপ, রড লাইট দিয়ে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে প্রায় ১০ লাখ টাকার ক্ষতিসাধন ও মারপিটের ঘটনা ঘটিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে শিক্ষার্থীরা।
হামলায় নেতৃত্ব দিয়েছেন কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সহ সভাপতি অর্ঘ রায় ও ইন্টার্ন চিকিৎসক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস হোসেনসহ প্রায় ৩০/৪০ জন। এদিকে সভাপতির অনুসারীদের দাবি হোস্টেলে ছাত্রলীগের কর্মী নামধারীরা হামলা চালিয়েছে। এ ঘটনায় উভয় পক্ষের ১৫ জন আহত হয়েছেন।
বুধবার (১ মে) রাত ৯টার পর থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত এ ঘটনা ঘটে। রাতে ঘটনার প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার বেলা ২টার দিকে ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা ও ঘটনার সাথে জড়িত শিক্ষার্থীদের বিচারের দাবিতে মানববন্ধন করেছে ছাত্রলীগের কর্মীরা। এ ঘটনায় কলেজ কর্তৃপক্ষ ৫ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
বৃহস্পতিবার দুপুর ১টার দিকে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ছাত্র হোস্টেলে গিয়ে দেখা দেখা যায়, ৬ তলা ভবনের ২য় তলার ২০২, ২০৩ ও ২০৬ এবং ৩য় তলার ৩০২, ৩০৪ ও ৩১২ নং কক্ষ ভাঙচুর করা হয়েছে। এসব রুমে থাকা শিক্ষার্থীদের ল্যাপটপ, ডিএসএলআর ক্যামেরা, মোবাইল ফোন, ট্যাব, ফ্রিজ, টেবিল, চেয়ার, খাট, আলমারি, বুকশেলফ, টেবিল ফ্যান, মিনি ওয়্যারড্রোবসহ বিভিন্ন ধরনের জিনিসপত্র ভাঙচুর অবস্থায় পড়ে আছে। যার বেশির ভাগই ব্যবহার অনুপযোগী।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজের ছাত্রলীগ নেতা শৈশব রায়কে সভাপতি ও মেহেদী হাসানকে সাধারণ সম্পাদক করে ছাত্রলীগের আংশিক কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। এ ঘটনায় এদিকে দুপুর দেড়টার পর হামলার শিকার হওয়া ছাত্রলীগের কর্মীরা বিচারের দাবিতে কলেজ প্রশাসন ভবনের সামনে মানববন্ধন করেন।
কলেজে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বর্তমান ছাত্রলীগের সভাপতি শৈশব রায় কমিটিতে আসার পর থেকে সাধারণ ছাত্রলীগের কর্মীদের তার পক্ষে নেয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু কলেজ শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন রনির অনুসারীরা এতে রাজি হয় না। কারণ রনির প্রায় শতাধিক অনুসারী ওই ছাত্রবাসে রয়েছে। তাদের পক্ষে না নিতে পেরেই এ ঘটনার সূত্রপাত হয়।
মারপিটে আহত শিক্ষার্থী অর্পণ বলেন, ২৯ এপ্রিল ছাত্র হোস্টেলের সামনে দুই শিক্ষার্থীকে সভাপতির অনুসারীরা মারপিট করে। ৩০ এপ্রিল বুধবার সন্ধ্যার আগে কলেজের শিক্ষার্থী আলী হাসানের পড়ার টেবিল বের করে নিয়ে আসে সভাপতির অনুসারীরা। এ সময় ওই টেবিলে থাকা হিউম্যান বোন (কঙ্কাল) বিক্রির প্রায় ৩০ হাজার টাকা নিয়ে আসে বলে অভিযোগ করা হয়।
এ ঘটনায় রাতে বগুড়া সদর থানায় জিডি করতে আসেন শিক্ষার্থীরা। এতে ক্ষিপ্ত হয় হয়ে ২য় তলা ৩টি কক্ষ ও ৩য় তলার ৩টি কক্ষের সকল জিনিসপত্র ভাঙচুর করা হয়। যেখানে আমাদের ব্যবহারের সকল জিনিসপত্র নষ্ট করা হয়েছে। এতে প্রায় ১০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। হামলায় নেতৃত্ব দিয়েছেন কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সহ সভাপতি অর্ঘ রায় ও ইন্টার্ন চিকিৎসক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস হোসেনসহ প্রায় ৩০/৪০ জন।
ইমতিয়াজ নামে আরেক শিক্ষার্থী জানান, নিজেদের পক্ষে নিতে না পেরে তারা সভাপতির অনুসারীরা হামলা চালিয়ে ১০ জন শিক্ষার্থীকে আহত করেছে। তারা সকলে ছাত্রলীগের কর্মী। ছাত্রলীগের নাম ধরে যারা এ কাজ করেছে তাদের বিচার হওয়া জরুরি।
কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. আরিফ হোসেন বলেন, হামলা চালিয়ে ছাত্রলীগের সাধারণ কর্মীদের ক্ষতি সাধন করা হয়েছে। তা সত্যি দুঃখজনক। তদন্ত করে এঘটনায় জড়িতদের শাস্তির দাবি জানান তিনি।
এদিকে ছাত্রলীগ কর্মীদের হামলা অভিযোগ তোলা কলেজ শাখা ছাত্রলীগেরসহ সভাপতি অর্ঘ রায় বলেন, যারা হোস্টেলে হামলার কথা বলছে, তারা সকলে বিগত কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন রনির অনুসারী। তারা এই কমিটিতে জায়গা না পেয়ে নিজেরায় অরাজকতা তৈরি করে দোষারোপ করছে। আসলে ওরা পূর্বে থেকে এই ক্যাম্পাসে ভাঙচুর চালিয়েছে। গত বুধবার রাতেও তারা ইটপাটকেল ছুড়ে আমাদের কয়েকজন কর্মীকে আহত করেছে। যারা হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। আমাদের ৫ জন এ ঘটনায় আহত হয়েছে।
ইন্টার্ন চিকিৎসক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ডা. ইলিয়াস হোসেন বলেন, হোস্টেলের ঘটনায় যারা আহত হয়েছে তাদের চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। অপ্রীতিকর অবস্থা চলাকালে তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। তখন সেখানে কলেজে অধ্যক্ষ সহ অন্যান্য স্যাররা উপস্থিত ছিলেন। আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম, কিন্তু তাই বলে এ ঘটনার সাথে জড়িত না। ঘটনাটি ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে ঘটনাটি ঘটেছে।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, হামলায় কলেজ শাখা সভাপতির অনুসারীরা ঘটিয়েছে। মূলত সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন রনির অনুসারীদের পক্ষে নিতে না পারা এবং কলেজ হোস্টেল ও ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তার করতেই এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে।
এ বিষয় ছাত্র হোস্টেলের সহকারী হোস্টেল সুপার সহযোগী অধ্যাপক ডা. মিজানুর রহমান জানান, এ ঘটনা জানার সঙ্গে সঙ্গে আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করি। আমরা কলেজের অধ্যাপক নিতাই চন্দ্র সরকারকে প্রধান করে ৫ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী সাত দিনের মধ্যে তদন্ত কমিটি রিপোর্ট জমা দিলে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মোবাইলে কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি শৈশব রায় বলেন, পারিবারিক একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বর্তমানে সিলেটে আছি। একটি টেবিল দখলকে কেন্দ্রে করে কিছু দুষ্ট প্রকৃতির শিক্ষার্থীরা বিনা উসকানিতে আমার কর্মীদের ওপর হামলা চালিয়ে বেশ কয়েকজনকে আহত করেছে। এ ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করতে ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করতে জরুরি সভা আহ্বান করা হয়েছে।
কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন রনি বলেন, গতকালের ঘটনা নিয়ে কিছু জানি না। বর্তমানে যারা দায়িত্বে আছেন তারাই বিষয়টি দেখবেন। পড়াশোনা ও রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন শেষে আমি ক্যাম্পাস থেকে অনেক আগেই চলে এসেছি। তাই এ বিষয়ে কিছুই জানি না।
মেডিকেল পুলিশ ফাঁড়ির এসআই আনিসুর রহমান বলেন, ছাত্রলীগের দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে আহত কয়েকজনকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে। অধ্যক্ষের নির্দেশে তিনজন শিক্ষার্থীকে কলেজ ক্যাম্পাসে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।