বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের নির্বাহী সভা হয়েছে সাত মাস পর। যে সভায় চলমান নারী ফুটবল লিগের শীর্ষ চার দলকে কাউন্সিলরশিপ দেওয়ার প্রস্তাব বার্ষিক সাধারণ সভায় পাঠানোর প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ নিয়ে উত্তাপ ছড়িয়েছিল সভায়। বেশ ক’জন সদস্য এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। সহ-সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ মহি সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে দিয়েছেন নোট অব ডিসেন্ট। তাতেও বাফুফের সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন ও তার আস্থাভাজন মাহফুজা আক্তার কিরণের একগুঁয়েমির কাছে নত স্বীকার করতে হয়েছে অন্যদের।
সভাসূত্রে জানা গেছে, কিরণের এই প্রস্তাবনা অনুমোদন করতে বেশ তৎপর ছিলেন সভাপতি সালাউদ্দিন। এতেই পরিস্কার, আসছে অক্টোবরে বাফুফের নির্বাচনকে সামনে রেখে পকেট ভোটার বানাতে আঁটঘাঁট বেঁধে নেমেছে সালাউদ্দিন নেতৃত্বাধীন একটি পক্ষ।
দীর্ঘ সাত মাস পর নির্বাহী সভা হওয়ায় ছিল অনেকগুলো এজেন্ডা। তবে সালাউদ্দিন-কিরণরা গিয়েছিলেন মূলত ভোট ব্যাংক বানানোর মিশন নিয়ে। যদিও এই সিদ্ধান্ত প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বেশ ক’জন সদস্যের বিরোধিতায়। জোড়াতালির নারী লীগের প্যাড সর্বস্ব ক্লাবগুলোকে ভোটাধিকার দেওয়ার পক্ষে ছিলেন না অনেকেই। সভা শেষে আরেক সহ-সভাপতি ও একটি নারী ক্লাবের মালিক আতাউর রহমান ভুঁইয়া মানিক বলেন, ‘ডেলিগেটস বাড়ানোর একটা প্রস্তাবনা ছিল। ওমেন্স লিগ থেকে চারটি ক্লাবকে ডেলিগেট করা হবে মর্মে এজিএম-এ প্রস্তাব পাঠানো হবে। এজিএম-এ অনুমোদিত হলে তারা ডেলিগেট হিসেবে আসবে। ৯টি ক্লাব আবেদন করেছিল ডেলিগেটস হওয়ার। তবে বোর্ড চারটিকে অনুমোদন দেওয়ার ব্যাপারে সুপারিশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এজিএম-এ যদি এটা অনুমোদন হয়, তবে তারা আসন্ন বাফুফে নির্বাচনে কাউন্সিলর হতে পারবেন।’
২০২৩ সালে বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) আয়োজন করেনি বাফুফে। সেটা ২৯ জুন আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। সেখানেই নারী লিগের দলগুলোর কাউন্সিলরশিপের বিষয়টি অনুমোদনের জন্য তোলা হবে। এই সিদ্ধান্তের বিরোধীতা করা সহ-সভাপতি মহি বলেন, ‘আমি নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছি। বাফুফে ভবনে রেখে মেয়েদের বিভিন্ন দলে ভাগ করে দিয়ে একটা লিগ হচ্ছে। সেটার কেন কাউন্সিলরশিপ দিতে হবে?’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘ফিফা থেকে যেখানে আমাদের কাউন্সিলরশিপ কমানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, সেখানে আমরা নির্বাচনকে সামনে রেখে কাউন্সিলর বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছি। এটা ভীষণ লজ্জার। নির্বাচনে একটি পক্ষ চাইছে ভোট ব্যাংক বানাতে। এর তীব্র প্রতিবাদ করছি। আমিসহ অনেকেই এটা নিয়ে কথা বলেছি।‘
জানা গেছে, ১৫ নির্বাহী সদস্যর মধ্যে ভোটে ১১তম নির্বাচিত হয়েও নির্বাহী সভায় কিরণ রুলিং দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তখন একজন নির্বাহী সদস্য এর তীব্র প্রতিবাদ করেন। তিনি জানতে চান, সভাপতি থাকাবস্থায় কিরণ কেন রুলিং দিবেন? এক পর্যায়ে এক সদস্য সভায় চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে যান এবং টেবিলে কিল মারতে থাকেন। তখন আরও কয়েকজন এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ করেন। মহি জানান, ‘যদি কাউন্সিলরশিপ দিতেই হবে, তবে সবার আগে দেওয়া উচিত নিচের সারির যে ক্লাবগুলো বছরের পর বছর দল গড়ে খেলছে। পাইওনিয়র, তৃতীয়, দ্বিতীয় ও প্রথম বিভাগের অনেক ক্লাবকে কুড়ি-পচিশ বছর ধরে দল গড়ছে। দিলে তাদের আগে দিতে হবে।‘’
শুক্রবারের চার ঘন্টাব্যাপী সভায় অল্প সময়ের জন্য ভার্চুয়ালি উপস্থিত হয়েছিলেন সিনিয়র সহ-সভাপতি সালাম মুর্শেদী। এছাড়া সর্বাধিক ভোট পাওয়া সহ-সভাপতি ইমরুল হাসানও আসেননি। নারী লিগের দলগুলোকে কাউন্সিলরশিপ দেওয়ার আলোচনা শুরুর আগেই সভাস্থল ত্যাগ করেন আরেক সহ-সভাপতি কাজী নাবিল আহমেদ। তিন গুরুত্বপূর্ণ কর্তার অনুপস্থিতিতেই এক প্রকার জোর করেই পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষ চার ক্লাবকে কাউন্সিলরশিপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন সভাপতি সালাউদ্দিন।
এদিকে সভায় চলমান প্রিমিয়ার লিগ থেকে দু’টির জায়গায় একটি দল অবনমনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। লিগ শুরুর আগেই গোপালগঞ্জ নাম প্রত্যাহার করায় এবার একটি দলকে নেমে যেতে হবে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপ লিগে। তবে দ্বিতীয়স্তর থেকে উঠে আসবে দু’টি দল। সভায় বিসিএল-এর চ্যাম্পিয়ন ফকিরেরপুল ইয়ং মেন্স ক্লাব ও ঢাকা ওয়ান্ডারার্সকে অভিনন্দন জানানো হয় ও লিগের পয়েন্ট টেবিল অনুমোদন করা হয়। সম্প্রতিক পেশাদার লিগ ম্যনেজমেন্ট কমিটি আগামী মৌসুমের সূচী চূড়ান্ত করেছিল। সেটা বোর্ডে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে প্রতি দলে দু’জন অনূর্ধ্ব-১৮ বছরের ফুটবলার নিবন্ধন বাধ্যতামূলক একজনকে একাদশে খেলানোর সুপারিশ অনুমোদন করেনি নির্বাহী কমিটি। সভায় নতুন করে বয়স নির্ধারণ হয়েছে নিচের সারির তিনটি লিগের। এখন থেকে পাইওনিয়র লিগে অনূর্ধ্ব-১৪, তৃতীয় বিভাগে অনূর্ধ্ব-১৬ এবং দ্বিতীয় বিভাগ খেলবে অনূর্ধ্ব-২০ বয়সীরা। টিএন্ডটি ক্লাবকে প্রথম বিভাগে সরাসরি খেলার অনুমোদন দিয়েছে বোর্ড।
দীর্ঘদিন পর সভা অনুষ্ঠিত হলেও এর আলোচ্য সূচীতে ছিল না অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের বিষয়ে আলোচনা। এছাড়া বাফুফের স্টাফদের অর্গানোগ্রাম এজেন্ডায় থাকলেও আলোচনা হয়নি। বাফুফের নির্বাচনের তারিখও চূড়ান্ত হয়নি। তবে নির্বাচনের সময় চলতি ২০২৪ সালের এজিএম আ্য়োজনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।