বিএনপির সক্ষমতা ও দুর্বলতা নিয়ে বাহাসে জড়িয়েছেন অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য্য ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আসিফ নজরুল। ড. দেবপ্রিয়র দাবি, ক্ষমতা গ্রহণের ক্ষেত্রে বিএনপির বুদ্ধিমত্তার অভাব রয়েছে। বিপরীতে আসিফ নজরুলের দাবি, বিরোধী দলের বুদ্ধিমত্তার অভাব আছে। কথা সত্য। কিন্তু গুম, খুন, অত্যাচার, নিপীড়নের জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে এত বেশি ভয়াবহভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, কিন্তু কেউ কিছু বলছে না।
আজ শনিবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে দ্য ঢাকা ফোরাম আয়োজিত ‘রিজিওনাল অর্থনীতি: এখন বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারে এ বাহাসে জড়ান তারা। এ সময় কথা বলেন দেশের শীর্ষ অর্থনীতিবিদ, পররাষ্ট্র ও রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা। এতে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ।
বক্তব্য রাখেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য্য, ড. মোস্তাফিজুর রহমান, পিপিআরসির চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আসিফ নজরুল, সাবেক মুখ্য সচিব আলী ইমাম মজুমদার প্রমুখ।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য্য বলেন, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অর্থনৈতিক অত্যন্ত জটিল অবস্থায় রয়েছে। বিশেষ করে সামগ্রিক দায়দেনা ও বেসরকারি খাতের দায় খুবই জটিল। অবস্থা এখন এমন হয়েছে যে, নিট রপ্তানি আয় ইতিবাচক থাকার পরও প্রবৃদ্ধির ধারা আরও শ্লথ হয়েছে। গত বছরের বাজেটে শুধু চ্যালেঞ্জ ছিল মূল্যস্ফীতি, এবারের বাজেটে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদেশি ঋণের ঝুঁকি।
তিনি বলেন, এ পরিস্থিতির বড় কারণ যে রাজনৈতিক জবাবদিহিতার প্রয়োজন ছিল সেটি নেই। নাগরিকদের দুর্ভাগ্য যে তারা কায়েমি স্বার্থের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে।
বিএনপির সমালোচনা করে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, নির্বাচনের আগে বিরোধী দলের ২৭ দফা আমি খুব যত্নের সঙ্গে পড়েছি। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো এত জটিল পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ কি সেটি বলা নেই। এই দফাগুলোতে মূল্যস্ফীতি ও সামষ্টিক অর্থনীতি ঠিক করার কোনো পরিকল্পনা নেই। আওয়ামী লীগ তো তাও স্মার্ট বাংলাদেশের চেতনা দিয়েছে, আপনারা এ ধরনের কোনো কিছুই দিতে পারেননি।
বিএনপির উদ্দেশ্যে ড. দেবপ্রিয় বলেন, কি জন্য লক্ষ্য মানুষ জমায়েত হয়ে আবার ফিরে যায়, তারা কোথায় হারিয়ে যায়, তাদের মনের বিষয় বোঝার ক্ষমতা তাদের নেই। কারণ তারা সম্পূর্ণ বিদেশ নির্ভর হয়ে পড়েছে। স্থানীয় নির্বাচনে কাউকে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হচ্ছে না, কেউ অংশ নিলেও তাদেরকে অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে। পেশাজীবী সংগঠনগুলোকে দুর্বল করে রাখা হচ্ছে বিএনপির পক্ষ থেকে। পেশাজীবী সংগঠনের নেতা নির্বাচিত হলেও তাকে দায়িত্ব নিতে দেওয়া হচ্ছে না।
এ সময় বিএনপিকে নিয়ে দেবপ্রিয়র এসব অভিমতের বিরোধিতা করে ড. আসিফ নজুরল বলেন, ২৪ এর নির্বাচনে বিএনপি নিজ থেকে অংশগ্রহণ করেনি এমন নয়, বিএনপিকে নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার জন্য বাধ্য করা হয়েছে।
দেবপ্রিয়কে উদ্দেশ্য করে আসিফ নজরুল বলেন, আপনার এসব অভিযোগের সম্পূর্ণ বিরোধিতা করছি। ২০০৮ সালে নির্বাচন বর্জনের পরামর্শ দিয়েছিল এ নাগরিক সমাজই। ওই সময় হোটেল লেকশোরে যে সভার আয়োজন করা হয়েছিল ওখানে দেবপ্রিয় দার সিপিডি, সুজনসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম আমরা স্পষ্টভাবে মনে করতে পারি। তারা বর্জন করার পরামর্শ দিয়েছিল, আমি নিজে সেখানে উপস্থিত ছিলাম।
এ সময় আসিফ নজরুলকে থামিয়ে দিয়ে ড. দেবপ্রিয় বলেন, আমরা তখন বলেছিলাম, নির্বাচন পিছিয়ে দেন। অংশহগ্রহণের সুযোগ করে দেন। ওই মুহূর্তে নির্বাচন হওয়া ছিল বেশ কঠিন।
ড. আসিফ নজরুল এ সময় বলেন, তখন মেজরিটিই বলেছিল কোনোভাবেই নির্বাচনে অংশ নেওয়া যায় না। ২০২৪ এর নির্বাচনে বিএনপি কী বর্জন করেছে, নাকি তাদের নির্বাচন বর্জন করতে বাধ্য করা হয়েছে। গণ-গ্রেপ্তার ও গায়েবি মামলার পর আমরা যদি এই দোষ বিরোধী দলকে দেই তখন হয়কি, বিরোধী দলকে যা ইচ্ছা বলেন সমস্যা হয় না। এর ফলে সরকার আরও অত্যাচারী ও আরও একতরফা ও নিষ্ঠুর হওয়ার কনফিডেন্সটা দেয়।
দেবপ্রিয়র কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, দেবপ্রিয় দা বলেছেন, বিরোধী দলের বুদ্ধিমত্তার অভাব আছে। কথা সত্য। কিন্তু বর্তমানে যে সংকট, ভুয়া নির্বাচন, ব্যাংক লুট হয়ে যাচ্ছে, তারল্য সংকট, লক্ষ কোটি টাকা পাচার হচ্ছে, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হচ্ছে, পত্রিকার স্বাধীনতা নেই- এই ১৭-১৮ বছরে যে অত্যাচার, এজন্য যে স্থায়ী গোষ্ঠী তাদের আমরা কতক্ষণ সমালোচনা করব, নাকি বিরোধী দলকে পথ দেখাব। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে এত বেশি ভয়াবহভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, কিন্তু কেউ কিছু বলছে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাক-স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে জানিয়ে আসিফ নজরুল বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাক-স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। ড. ইমতিয়াজের মতো শিক্ষককে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এ সরকারের আমলে ঢাবিতে ৯০০ এর ওপর নিয়োগ হয়েছে। কিন্তু কথা বলার কেউ নেই। সাদা দল নির্বাচন করার সাহসই পায় না। দেশের সবচেয়ে সিনিয়র জাজ এসে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের কাছ থেকে সংবর্ধনা নেন।