অভাব জবাবদিহিতার

আধুনিক রাষ্ট্রের মূল দুটি ভিত্তি হচ্ছে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা। অথচ বাংলাদেশ রাষ্ট্রে সার্বিক জবাবদিহিতায় ধস নেমেছে বলে বিশেষজ্ঞরা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। বিভিন্ন খাতে অনিয়ম ধরা পড়লেও তার প্রতিকার হচ্ছে না। এ ছাড়া ব্যাংক খাতে যেসব আইন তৈরি হয়েছে সেগুলো মূলত লুটপাটের জন্যই। দেশ রূপান্তরের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, শনিবার দ্য ঢাকা ফোরাম আয়োজিত ‘রিজিওনাল অর্থনীতি : এখন বাংলাদেশ’ শীর্ষক কর্মশালায় দেশের শীর্ষ অর্থনীতিবিদ এবং পররাষ্ট্র ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এসব কথা বলেন। তারা দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।

আলোচনায় বক্তারা উল্লেখ করেন উন্নয়নের অর্থায়ন পুরোপুরি ঋণনির্ভর হয়ে পড়ার পাশাপাশি উন্নয়নের খরচের অদক্ষতাও বহুগুণ বেড়েছে। অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ, প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হওয়াটাই স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে ঋণের বোঝা তো আছেই, খরচও উল্টো দিকে হেঁটেছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিপুল অর্থে নেওয়া প্রকল্পগুলো বোঝায় পরিণত হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে যশোর হাইটেক পার্কের কথা এসেছে, যা এখন কমিউনিটি সেন্টার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ব্যাংক খাতে দুর্নীতি এবং অনিয়ম একে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এই খাতে সরকারের সার্বিক জবাবদিহিতায় ধস নেমেছে বলে বক্তারা উল্লেখ করেন। ব্যাংক খাতে নিয়ম তৈরি হয়েছে দুর্নীতির জন্য, লুটপাটের জন্য। অন্যদিকে উন্নয়নের বয়ানের জন্য সরকার খুব দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। এসব অনিয়মের ধারাবাহিকতায় পুরো ব্যবস্থাটাই ‘অদক্ষ অর্থনৈতিক শাসনে’ পরিণত হয়েছে। ফলে বড় সামষ্টিক অর্থনীতির ধসের আভাস পাওয়া যাচ্ছে, বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান।

কর্মশালায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ সামষ্টিক অর্থনীতিতে জবাবদিহিতার অভাবের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘ব্লু ইকোনমিতে যে পলিটিকস আছে সেটি আমরা দেখি না। সামষ্টিক অর্থনীতির কোনো সমন্বয় নেই।’ দেশের রাজনীতিতেও জবাবদিহিতার উল্লেখ করেন আলোচকরা। রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষত বিরোধী দলের ভূমিকার বিষয়ে বিভিন্ন রকম মত থাকলেও তারা একমত হন যে, গত জাতীয় নির্বাচনটি ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করা হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে আমরা। ব্যবসা, রাজনৈতিক দল ও আমলারা একটা জালে আটকা। এ জালের সঙ্গে আছে আন্তর্জাতিক সমর্থন। যারা সিভিল সোসাইটিতে আছেন তারাও দুর্বল। সিভিল সোসাইটি বলতে আমরা যাদের বুঝি, তারা কোনো না কোনো সমস্যায় জর্জরিত। তাদের নৈতিক স্খলন হয়েছে।’ অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নে বিশেষজ্ঞরা যে জবাবদিহিহীনতার উল্লেখ করেছেন তা আশঙ্কাজনক। জবাবদিহিতার অভাবে দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো ধসে পড়া সার্বিকভাবে দেশের মানুষ ও দেশের ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত।

জবাবদিহিতার অভাব আমরা অন্যান্য ক্ষেত্রেও দেখতে পাই। সম্প্রতি তীব্র তাপপ্রবাহের ফলে দেশের পরিবেশ ও সমন্বয়হীন উন্নয়নের ব্যাপারগুলো সামনে এসেছে। আমরা দেখতে পাই, রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে অপরিকল্পিত উন্নয়নের চাপে পরিবেশ বিপর্যস্ত হয়েছে। সৌন্দর্যবর্ধনের নামে লাখ লাখ গাছ কেটে সেখানে চারাগাছ লাগানো হয়েছে। এতে কেবল মানুষেরই ভোগান্তি হয়নি, চরম সংকটে পড়েছে প্রাণপ্রকৃতি। তবে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা জবাবদিহিহীনতার যে উল্লেখ করেছেন তা আশাব্যঞ্জক। যেকোনো সমাধানেরই প্রথম ধাপ হচ্ছে সমস্যা চিহ্নিত করা। জনগণ আশা করে, পরিস্থিতি যত প্রতিকূলই হোক, সমাজের গণ্যমান্য এবং বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিরাই যার যার ক্ষেত্র থেকে সমস্যা নিয়ে সোচ্চার হবেন এবং এসব সমাধানে সক্রিয় ভূমিকা নেবেন।