বৈশাখের (গত সোমবার বিকেলে) এক ঘণ্টার মুষলধারের বর্ষণে ডুবন্ত নগরীতে পরিণত হয়েছিল বাণিজ্যিক রাজধানী খ্যাত চট্টগ্রাম। দেশের দ্বিতীয় প্রধান এই নগরীতে বৃষ্টি হলেই ষোলশহর দুই নম্বর গেইট থেকে বহদ্দারহাট পর্যন্ত পানি জমে, চিরায়ত এই বাক্যের কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। এই বাক্যের পরিবর্তনের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে এ পর্যন্ত প্রায় চার হাজার কোটি টাকা খরচ করা হলেও এবারের বৈশাখের প্রথম বৃষ্টিতেও ডুবল চট্টগ্রাম।
চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ২০১৭ সালের আগস্টে একনেকে ৫ হাজার ৬১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকার প্রকল্পটি (গত বছরের বাজেট বাড়িয়ে ৮ হাজারর ৬২৯ কোটি টাকা করা হয়) একনেকে পাস করেছিল। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য পরবর্তী বছরের ৯ এপ্রিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাথে সমঝোতা স্বাক্ষরের পর ২৮ এপ্রিল নালা নর্দমা পরিষ্কারের মাধ্যমে কাজ শুরু করে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিযারিং ব্রিগেড। সেই থেকে নগরীর ৩৬টি খাল সংস্কার ও পুন:খননের কাজ এবং খালের উভয় পাশে স্থাপনা ভেঙে সম্প্রসারণের কাজ করলেও এখনো বৃষ্টি হলেই পানিতে ডুবছে নগরী।
গত সোমবারের এক ঘণ্টার টানা বর্ষণে নগরীর মুরাদপুর, ষোলশহর দুই নম্বর গেইট, প্রবর্তক মোড়, তিনপোলের মোড় ও আগ্রাবাদসহ বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে জলাবদ্ধতা মারাত্নক রূপ ধারণ করে। প্রকল্পের আওতায় ৩৬টি খালের মধ্যে ২০টি খালের সংস্কার ও সম্প্রসারণের কাজ পুরোপুরি শেষ এবং বাকিগুলোর কাজও শেষ হওয়ার পথে। কিন্তু তারপরও পানি জমে জলাবদ্ধতা ভয়াবহ রূপ ধারণ করল কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর জানতে কথা হয় জলাবদ্ধতা নিরসনে সেনাবাহিনীর প্রকল্প পরিচালক লে. কর্নেল ফেরদৌস আহমেদের সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কম সময়ে অধিক বর্ষণের কারণে পানি দ্রুত নেমে যেতে পারেনি। এ ছাড়া প্রথম বর্ষণ হওয়ায় নালা ও খালগুলোতে পানি প্রবাহে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। যার ফলে পানি আটকে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলেও ৩০ থেকে ৪৫ মিনিটের মধ্যে সব পানি নেমে গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কম সময়ে অধিক বৃষ্টি হলে পানি নেমে যেতে একটু সময় নিবে। এখন কত দ্রুত তা নেমে যাচ্ছে সেটাই বিষয়। তবে ছোটো ছোটো নালার সাথে বড় নালা বা খালগুলোর পানি প্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে কোথাও কোথাও। এতে নগরীর ভেতরে পানি জমে ছিল।’
এসব নালাগুলো সংস্কারের কাজ চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের। ৩৬টি খালের বাইরের নালা ও খালগুলো রুটিন অনুযায়ী সংস্কার করার কাজও সিটি করপোরেশনের। কিন্তু এবার নগরীর বিভিন্ন এলাকায় রাস্তার পাশের ফুটপাতের নিচের ড্রেনগুলোর দেয়াল আরসিসি ঢালাইয়ের মাধ্যমে সংস্কার কাজ করছে সংস্থাটি। এতে বিভিন্ন স্থানে ড্রেনগুলো ব্লকেজ হয়ে রয়েছে। নগরীর রেয়াজউদ্দিন বাজার তিনপুলের মোড়ে প্রতিবছর বৃষ্টি হলে পানি জমে। কিন্তু গত সোমবারের বৃষ্টিতে অনেক বেশি পানি জমেছিল।
এতো বেশি পানি জমার কারণ প্রসঙ্গে ব্যবসায়ীরা জানান, পাশে ড্রেনের কাজ চলছে এতে পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়া নগরীর স্টেশন রোড, ফিরিঙ্গীবাজার, পাথরঘাটাসহ এলাকায় এলাকায় ড্রেনের বা কালভার্টের কাজ চলছে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী শাহীন-উল-ইসলাম এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ছোটো ড্রেনের সাথে বড় ড্রেন ও খালের সংযোগ না থাকলে কিংবা পানি চলাচলে বাধাগ্রস্ত হলে পানি জমবে সেটাই স্বাভাবিক। তবে নগরজুড়ে রাস্তার পাশের অনেক ড্রেনের কাজ আমরা করছি এটা সঠিক। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার পরপরই এগুলো আবার পরিষ্কারও করে দেওয়া হচ্ছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘তবে এই বৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা আগামী বর্ষার আগেই সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধান করতে পারব।’
বর্ষায় আরো ভয়াবহ হতে পারে
এবারের বর্ষায় আরো ভয়াবহ পরিস্থিতি হতে পারে জানিয়ে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশ চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, ‘নগরীর অনেক খাল ও নালায় এখনো কাজ চলমান রয়েছে। খালের সীমানা দেয়াল নির্মাণের জন্য অনেক স্থানে বাধঁ দেওয়া রয়েছে। স্লুইস গেটগুলোও এখনো চালু হয়নি। ফলে এবারের বর্ষায় আরো ভয়াবহ হতে পারে।’
এদিকে ভারতীয় উপমহাদেশে এবার আরো বর্ষা বৃষ্টি হতে পারে বলে আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন। গত সপ্তাহে ভারতের পুনেতে দক্ষিণ এশিয়ার আবহাওয়াবিদদের সম্মেলনে এই আভাস দেওয়া হয়েছে। সেই সম্মেলনে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ।
তিনি আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বলেন, ‘লা-নিনা সক্রিয় হবে বলে এবার বাংলাদেশে বর্ষায় বেশি বৃষ্টি হবে। জুন-জুলাই ও আগস্ট এই তিন মাস বৃষ্টি হবে বলে আবহাওয়ার সকল বিষয় পর্যালোচনা করে আবহাওয়াবিদরা পূর্বাভাস দিয়েছেন।’
বৃষ্টি হলে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা দুর্ভোগ আরো বাড়বে সন্দেহ নেই। এনিয়ে কথা হয় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের সভাপতি ও চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর অঞ্চল ও পরিকল্পনা বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. রাশিদুল হাসানের সঙ্গে । তিনি বলেন,‘ পানি প্রবাহের জন্য সবগুলো নেটওয়ার্ক সচল থাকতে হবে। পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে স্বাভাবিকভাবেই জলাবদ্ধতা দেখা দিবে। এখন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে যেমন তাদের নালাগুলো পানি প্রবাহের জন্য সচল রাখা প্রয়োজন, তেমনিভাবে সেনাবাহিনীকেও প্রকল্পের আওতায় খালগুলোর পানি প্রবাহ সঠিক রাখা এবং স্লুইসগেটগুলো চালু করা প্রয়োজন। অন্যথায় বর্ষায় জোয়ারের পানি প্রবেশ করবে এবং জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেবে।’
জলাবদ্ধতার মেগা প্রকল্পের আওতায় ৫টি স্লুইস গেইট ইতিমধ্যে চালু হয়েছে এবং সিডিএ’র চাক্তাই থেকে কালুরঘাট রোড নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় ১২টি স্লুইস গেটও যুক্ত হয়েছে বলে জানান সিডিএ’র প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস। তিনি বলেন, ‘আমাদের ১২টি স্লুইস গেটের প্রায় সবগুলো লাগানো হয়েছে। এ মাসের শেষে এগুলোতে দুটি করে পাম্পও বসানো হবে। এতে করে জোয়ার ও বৃষ্টি একই সময়ে হলে ভেতরের জমে থাকা পানি পাম্পের মাধ্যমে পরিবাহিত করা হবে।’
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএ’র মেগা প্রকল্পের পাশাপাশি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বহদ্দারহাট থেকে বারৈয়পাড়া পর্যন্ত ১ হাজার ৩৬২ কোটি টাকায় একটি নতুন খাল খননের প্রকল্পর অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। গত বছর এর খনন কাজ শুরু হয়। অপরদিকে সিডিএ’র ২ হাজার ৭৭৯ কোটির প্রকল্পের আওতায় চাক্তাই থেকে কালুরঘাট সেতু পর্যন্ত উপকূলীয় বেড়িবাধ ও স্লুইস গেট নির্মানের আওতায় ১২টি স্লুইস গেট রয়েছে। এ ছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের আরেক প্রকল্পের আওতায় ১৬২০ কোটি টাকায় কর্ণফুলীর মোহনা থেকে উজানে মদুনাঘাট পর্যন্ত ২৩টি স্লুইস গেইট রয়েছে। সব মিলিয়ে ৪০টি স্লুইস গেটে নগরীর খালগুলো থেকে কর্ণফুলী থেকে জোয়ারের পানি প্রবেশ বন্ধ হওয়ার কথা।