নভেরা আহমেদ; মন ও মননে

আমাদের অল্প বয়সে বাসায় সাপ্তাহিক বিচিত্রা রাখা হতো। প্রচ্ছদে ছেনি, বাটাল নিয়ে কাজ করছে অদ্ভুত তীক্ষè, মেধাবী এক তরুণী। নিশ্চয়ই  সৃষ্টিশীল যে কোনো মানুষের জন্যই স্ট্রাগলের বিষয় যে তাকে নিজের জন্মভূমি ত্যাগ করতে হয়। এমনকি সৃষ্টিশীল মানুষেরা স্বাদ বদলের জন্য নানা দেশ, স্থান ভ্রমণ করে থাকেন। অনেকে প্রবাসে স্থায়ীভাবেও থাকেন, এটা অনেক সময় তাদের কাজ, চিন্তা, দর্শনের জন্য স্বাস্ব্যকর। বিচিত্রায় নভেরাকে পেলাম প্রথম ।

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনকে একটি স্মৃতিস্তম্ভের মাধ্যমে জাগ্রত রাখার চিন্তা থেকেই শহীদ মিনারের সৃষ্টি। প্রথম শহীদ মিনারের নকশা তৈরি করেছিলেন সাঈদ হায়দার আর রেখায় বদরুল আলম কিন্তু ২৬ ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানের নাজিমুদ্দিন, নূরুল আমীনের সশস্ত্র বাহিনী শহীদ মিনারটি নিশ্চিহ্ন করে ফেলে। বর্তমানে ঢাকা মেডিকেলের পাশে যে শহীদ মিনারটি তৈরি করা হয়েছে তার রূপকার নভেরা আহমেদ এবং হামিদুর রহমান। এই সত্য তথ্যটি তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের ডেইলি অবজারভারে প্রকাশিত হলেও সরকারি কাগজপত্রে কোনো অজানা কারণে নভেরা আহমেদের নামটি ছিল না। এ বিষয়ে The Pakistan Observer-এর বাক্যটি ছিল The memorial has been designed by Mr. Hamidur Rahman in collaboration with Miss Novera Ahmed… এবং নভেরা আহমেদ এবং হামিদুর রহমান যৌথভাবে শহীদ মিনারের ডিজাইন, পরিকল্পনা সব করা সত্ত্বেও শিল্পী হামিদুর রহমান কোনো অদ্ভুত কারণে কখনো এ বিষয়ে কোনো কথা বলেননি। শহীদ মিনারের মূল যে স্তম্ভটি, যাকে মাতৃমূর্তির রূপক মনে করা হয় তার আনতভঙ্গি তবে প্রথমে যে শহীদ মিনার তৈরি করা হয় তা কৌণিক ছিল না। তিনটি মিনারের নিচে স্টেইন গ্লাসের কাচ ছিল এবং হামিদুর রহমান ও নভেরা আহমেদের ভাস্কর্য ছিল মূল ডিজাইনে, যা পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়েছে। রোম, ভেনিসসহ ইউরোপের দেশগুলোতে ভাস্কর্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ শহরকে সাজানোর জন্য। নভেরা আহমেদও সেই চিন্তার ধারক-বাহক।

কোথাও উল্লেখ ১৯৩০ অথবা ১৯৩৫। ১৯৩৯-এর কথাও বলা হয়েছে অনেক লেখায়। নভেরার বাবা সৈয়দ আহমেদ কলকাতায় চাকরি করতেন। কলকাতার লরেটো থেকে নভেরা মেট্রিকুলেশন করেছেন। ওখানে থাকতেই সাধনা বোসের কাছে নাচ শিখেছেন, গানও গাইতেন। দেশভাগের পর নভেরার বাবা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের কুমিল্লায় বদলি হন ১৯৪৭ সালে। আর নভেরার বিয়ে হয় ১৯৪৫ সালে ১৪ বছর বয়সে এক পুলিশ অফিসারের সঙ্গে কলকাতায়। নভেরার বড় বোন কুমুম হকের মতে বিয়ের পরই ডিভোর্স হয়ে যায়। পরে চট্টগ্রামে চলে যান। এ সময়ে নভেরার বাবা-মা অস্থির হয়ে ওঠেন বিয়ের জন্য কিন্তু শিল্পী সিদ্ধান্ত নেন লন্ডনে গিয়ে ভাস্কর্য নিয়ে পড়বেন। ১৯৫০ সালে নভেরা যখন লন্ডনে আসেন শিল্পী হামিদুর রহমান তখন লন্ডনে ছিলেন, সেখানেই তার সঙ্গে পরিচয়, বন্ধুত্ব। নভেরা ১৯৫১ সালে ক্যাম্বার ওয়েল স্কুল অব ফাইন আর্টস অ্যান্ড ক্র্যাফটসের মডেলিং ও স্ক্যাপচারে কোর্সে ভর্তি হন। ওই সময়ে ওই স্কুলের ভাস্কর্য বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন ডক্টর ক্যারেল ফোগেল (Karel Vogel)। ১৯৫৫ সালে নভেরার প্রত্যয়নপত্রে অধ্যাপক লিখেছেন– 

Her studies from life shwos strong sense of observation, and certainly there is originality and depth of thought in her compositions. Her portraits head her full of life. Though in general working in the European way Miss. Ahmeds sculptures shwos hwo indelible is the unconsciousness influence of Eastern monumentality and traditions… The personality developed here well, I am convinced, become a first artist and inspiring teacher, given the necessary help and opportunity.

ইংল্যান্ড ছাড়াও নভেরা ভেনিস, প্যারিস এবং ইউরোপের আরও কয়েক জায়গায় গিয়েছিলেন। ইতালিতে তিনি ভেন্তুরিনা ভেন্তুরির কাছে কাজ শেখেন। ১৯৫৩ সালে হামিদুর প্রথমে দেশে আসেন পরে নভেরা আসেন। স্থপতি মাজহারুল ইসলামের উদ্যোগে পাবলিক লাইব্রেরিতে হামিদুর ও নভেরার একত্রে কাজ ।

১৯৬০ সালে পাবলিক লাইব্রেরিতে নভেরার প্রথম ভাস্কর্য প্রদর্শনী হয়, নাম ইনার গেজ। এই প্রদর্শনীটিতে নভেরা এ অঞ্চলে প্রথম আধুনিক ভাস্কর্যের উপস্থাপন করেন। পূর্বের পুতুল, দেব-দেবতার মূর্তি এসবের বদলে তার কাজের মধ্যে সাধারণ ব্রাত্যজনের ঘর-গৃহস্থালি, জীব-জন্তু, হাতি-ঘোড়া, শিশুকে অন্য ফর্মে উপস্থাপন করেন। এর পরে লাহোরে চলে যান। দ্বিতীয় প্রদর্শনীটি পাকিস্তানের দুই অংশের শিল্প-সমালোচক, শিল্পী সমাজ ও দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। লাহোরে আয়োজিত জাতীয় চিত্রশালা, ভাস্কর্য ও ছাপচিত্র প্রদর্শনীতে নভেরা ভাস্কর্য মাধ্যমে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার (রাষ্ট্রপতি পুরষ্কার) লাভ করেন। তার পুরস্কারপ্রাপ্ত কাজটি ছিল একটি বালকের মুখাবয়ব (প্লাস্টার বা সিমেন্টের তৈরি), নাম Child Philosopher ১৯৬১ সালের শেষের দিকে নভেরা নৃত্যে প্রশিক্ষণের জন্য বোম্বে যান, সেখানে একটি দুর্ঘটনায় নভেরা পায়ে আঘাত পান এবং লাহোরে ফিরে যান। লাহোর থেকে প্যারিসে চলে যান। ব্যাংককে ১৯৭০ সালের শেষের দিকে তার একক প্রদর্শনী হয়। তিনি ভিয়েতনাম যুদ্ধে ব্যবহৃত যুদ্ধাস্ত্র, যুদ্ধ সরঞ্জামকে ব্যবহার করে ভাস্কর্য তৈরি করেন। মূলত যুদ্ধের ভয়াবহতাকে তুলে ধরার জন্য তিনি এ প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। ব্যাংককে তার সঙ্গে ফটোগ্রাফার বন্ধু গ্রেগোয়া রুন ব্রুনস (গ্রিশা) এসেছিলেন।

১৯৭০-এর পর নভেরা স্থায়ীভাবে প্যারিসে থাকতে শুরু করেন। ১৯৭৪ সালে ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে নভেরার একবার দেখা হয়েছিল। এ সময়টাতে নভেরা এতটাই আত্মগোপন করেছিলেন যে, এস এম আলী শুনেছিলেন নভেরা আর নেই। এটা ১৯৮৯ সালের কথা। ১৯৯৪ সালে নভেম্বরে সংবাদের সাহিত্য পাতায় নভেরার বিষয়ে লেখেন মেহবুব আহমেদ। আর ১৯৯৭ সালে একুশে ফেব্রুয়ারির আগেই একুশে পদকের জন্য তার নাম ঘোষিত হয়। তবে তিনি পদক নিতে এ দেশে আসেননি। ১৯৯৮ সালের ১৪ এপ্রিল নববর্ষে নভেরা আহমেদের একক ভাস্কর্য প্রদর্শনী হয় শাহবাগের জাদুঘরে। জাদুঘরের একটি হলের নামকরণও করা হয় শিল্পীর নামে। ১৯৯৫ সালের মার্চ মাসে প্যারিসে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত জানান নভেরা বেঁচে আছেন। প্যারিসে বসবাস করেন শিল্পী শাহাবুদ্দিন এবং তার স্ত্রী আনা ইসলাম নভেরার ব্যাপারে উৎসাহী হয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করতে সক্ষম হন। প্যারিসে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পাসপোর্টের মেয়াদ ফুরিয়ে গেলে নভেরা নতুন একটি পাসপোর্টের জন্য প্যারিসের বাংলাদেশ দূতাবাসের ইকতিয়ার চৌধুরীর সঙ্গে বলেন। এ অবস্থার বিবেচনায় মনে হয় নভেরা আহমেদ যে ধরনের ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদ নিয়ে চলতে চেয়েছেন, কাজ করেছেন, করতে চেয়েছেন তা তখনকার বাঙালি সমাজের জন্য বোধগম্য পর্যন্ত ছিল না। একজন শিল্পী সে নারী বা পুরুষ যে জেন্ডারেরই হন না কেন তার সবচেয়ে বড় পরিচয় তার শিল্পীসত্তা। নভেরাও তার সময়কালে যে ধরনের উপেক্ষার সম্মুখীন হন, তাকে এ দেশ-স্থান ছাড়তে বাধ্য করে। তিনি যখন বুঝতে পেরেছিলেন যে এ দেশে বা অঞ্চলে তিনি যে মাধ্যমে কাজ করেন তা নিয়ে সে সময়ে খুব বেশিদূর এগোনো কঠিন হবে এবং লিঙ্গীয় পরিচয়ের কারণেও বাধাটা অনেক প্রকট ছিল।

প্যারিসের স্টুডিওতে ২০১৪ সালে যে প্রদর্শনী হয় সেখানে (The Goat of Chantemele/শতমলের ছাগল)-এর ছবি ছাপা হয়েছে। এটিও ভিন্নমাত্রার। ছাগলটি তিন পায়ে দাঁড়িয়ে ভারসাম্য রাখছে, কিছুটা নতমুখ। একটি প্রাণী যে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হতে পারে নভেরার কাজে সেই দিকটি উঠে এসেছে। এটা হচ্ছে সবকিছুকে তার প্রেক্ষিত অনুযায়ী দেখতে পারার চোখ।

৫ মে ২০১৪, প্যারিসের নিকটস্থ শন পামেল গ্রাম-ভাস্কর নভেরার বাড়ি, সুনসান নীরবতা। দীর্ঘদিনের সঙ্গী গ্রেগোয়া দ্য ব্রুনস নভেরার কফিনে তার ডান কাঁধে রাখলেন একটি হলুদ গোলাপ, বাম কাঁধে নভেরার প্রিয় একটি চড়ুই (সেও সেদিন ঘুমিয়ে পড়েছিল চিরনিদ্রায়) আর নভেরার এক্সিবিশনের ব্রশিয়ার। নভেরা হয়তো ঘুমিয়ে আছেন প্যারিসের এক গ্রামে কিন্তু তার ভাস্কর্য, কাজ, জীবন-দর্শন সব ছড়িয়ে আছে বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের ছয় দিকে, ছয় হাজার দিকে। একটি ছোট চড়ুইয়ের ডানায় চেপে নভেরার স্বয়ম্ভু অবয়ব ঘুরে বেড়াচ্ছে আমাদের মন ও মননে, ঘুণ্টি ঘরে।...