পুঁজিবাজারে সরকারি প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্তির নির্দেশ

আবারও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ বিষয়ে অর্থ বিভাগকে কাজ করার নির্দেশও দেন তিনি। গতকাল বৃহস্পতিবার শেরেবাংলা নগরে পরিকল্পনা কমিশনে জাতীয় অর্থনৈতিক কমিটির নির্বাহী সভায় (একনেক) তিনি এ নির্দেশ দেন।

অবশ্য গত ১৫ বছরে প্রধানমন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ও আ হ ম মুস্তফা কামাল বেশ কয়েকবার উদ্যোগ নিয়েও আমলাদের বিরোধিতায় নতুন করে সরকারি কোনো কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করতে পারেননি।

গতকাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় ৫ হাজার ৫৬৩ কোটি টাকার ১০টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা সাংবাদিকদের জানান পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সচিব সত্যজিৎ কর্মকার। এ সময় উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী আব্দুস সালাম, প্রতিমন্ত্রী শহীদুজ্জামান সরকার ও পরিকল্পনা কমিশনের সদস্যরা।

সত্যজিৎ কর্মকার প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা তুলে ধরে বলেন, প্রধানমন্ত্রী অনুশাসন দিয়েছেন, আমাদের যে সরকারি কোম্পানিগুলো আছে, সেগুলো যাতে পুঁজিবাজারে অন্তর্ভুক্ত হয়। অর্থ বিভাগকে এ বিষয়ে কাজ করার জন্য অনুশাসন দিয়েছেন।

কী ধরনের সরকারি প্রতিষ্ঠানকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির মধ্যে আনা হবে এমন প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, তিনি সব প্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্তির কথা বলেননি। তিনি অর্থ বিভাগকে বলেছেন, পুঁজিবাজারে উপযুক্ত হওয়ার বিষয়ে যাতে অর্থ বিভাগ কার্যকর উদ্যোগ নেয়। অর্থ সচিব যাচাই-বাছাই করবেন কারা কারা আসতে পারে, কোন কোন প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, সেটি বিবেচনা করে যাতে অর্থ বিভাগ প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রস্তাব পাঠায়।

প্রসঙ্গত, ২০০৬ সাল থেকে পুঁজিবাজারে রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার ছাড়ার উদ্যোগ নেয় সরকার। এর আগের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও সরকারি কোম্পানিগুলোকে শেয়ার অফলোডে বিভিন্ন সময়ে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন। এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সরকারি কোম্পানির শেয়ার ছাড়তে উদ্যোগ নিয়েছিলেন। শেয়ার না ছাড়লে সংশ্লিষ্ট সরকারি কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালককে অপসারণের হুমকিও দিয়েছিলেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী মুহিত। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তা কখনোই আলোর মুখ দেখেনি। মূলত সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের অনীহা পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির পথে বাধা তৈরি করেছে। ২০১৬ সালে এসেনসিয়াল ড্রাগস পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির জন্য অনুমোদন পেয়েও শেয়ার ছাড়েনি।

সর্বশেষ ২০২০ সালে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল পুঁজিবাজারে সরকারি লাভজনক কোম্পানির শেয়ার ছাড়ার উদ্যোগ নেন। পুঁজিবাজারে আসার অংশ হিসেবে সরকারি কোম্পানিগুলোকে সম্পদ পুনর্মূল্যায়নের নির্দেশ দেন এবং এজন্য দুই মাসের সময় বেঁধে দেন। তবে সেই দুই মাস চার বছরেও শেষ হয়নি। মুস্তফা কামাল শুরুতে জ¦ালানি খাতের পাঁচ কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির ঘোষণা দিয়েছিলেন। কোম্পানিগুলো হচ্ছে নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি, ইলেকট্রিসিটি জেনারেশন কোম্পানি অব বাংলাদেশ লিমিটেড (ইজিসিবি), আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেড, বি-আর পাওয়ারজেন লিমিটেড (বিআরপিএল) ও গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল)।

এসব কোম্পানির বাইরে অন্তত এক ডজন সরকারি কোম্পানি রয়েছে, যেগুলোকে গত ১৫ বছরে বিভিন্ন সময়ে পুঁজিবাজারে আসার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে আওয়ামী লীগের সবচেয়ে সফল অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ব্যর্থ হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে মুস্তফা কামালের নিষ্ক্রিয়তায় সরকারি কোম্পানিগুলোর পুঁজিবাজারে আসার প্রক্রিয়াও বন্ধ হয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আনার প্রক্রিয়া শুরু করতে প্রধানমন্ত্রী আবারও উদ্যোগ নিলেন।

এদিকে গতকালের একনেকে ৫ হাজার ৫৬৩ কোটি টাকার ১০টি প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ৫ হাজার ২০৩ কোটি টাকা আর উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন বিশেষ করে কইকা, বিশ^ব্যাংক ও চীনের অর্থায়ন ৩৬০ কোটি টাকা।

একনেক সভা শেষে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সচিব সত্যজিৎ কর্মকার বলেন, প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন সমাপ্তযোগ্য প্রকল্প আমরা যেন অল্প কিছু টাকা দিয়ে হলেও শেষ করি। ৩৩৯টি সমাপ্তযোগ্য প্রকল্পের মধ্যে এবার পাঁচটি প্রকল্প মালামাল জুনের মধ্যে ইনস্টল করা যাবে না। এ কারণে পাঁচটি প্রকল্প বাদে বাকি ৩৩৪টি প্রকল্প ৩০ জুনের মধ্যে শেষ হবে।

প্রধানমন্ত্রীকে না জানিয়ে খুলনা মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয়ে তার নাম ব্যবহার করায় তিনি বিরক্তি প্রকাশ করেছেন জানিয়ে সচিব বলেন, প্রধানমন্ত্রী খুলনায় শেখ হাসিনা মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয় অনুমোদন করেছেন। এ প্রকল্পে তার দুটি অবজারভেশন আছে। প্রথমত শেখ হাসিনা নামটি বাদ দিতে হবে; দ্বিতীয়ত প্রকল্পে ম্যুরাল যেটি আছে সেটি বাদ দিতে হবে। তবে মন্ত্রীরা প্রধানমন্ত্রীকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন এ নাম পরিবর্তন করতে হলে এখন আইন পরিবর্তন করতে হবে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী উষ্মা প্রকাশ করে বলেছেন, ভবিষ্যতে তিনি প্রকল্পে তার নাম ব্যবহারের অনুমতি দেবেন না। এটি প্রধানমন্ত্রীর বদান্যতা।

পরিকল্পনা সচিব বলেন, আরেকটি অনুশাসন তিনি দিয়েছেন, নদীতে যেসব ব্রিজ নির্মাণ করা হয় তা যাতে যথাযথ উচ্চতা মেনে নির্মাণ করা হয়। নদীর মূল স্রোতকে বাধাগ্রস্ত করবে এমন কোনো জায়গায় ব্রিজ নির্মাণ করা যাবে না।