স্কোরকার্ড বলবে বাংলাদেশ ৫ রানে জয়ী। পাঁচ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজের প্রথম তিন ম্যাচ জিতে সিরিজ জিতে নেওয়া বাংলাদেশের আরেকটি জয় আসলে স্রেফ পরিসংখ্যান। আসল কথাটা হচ্ছে, এই ম্যাচে কেউ যেতেনি। তেতো সত্যি কথাটা হচ্ছে এত খারাপ ক্রিকেট খেলেছে দুই দল যে, তাদের যৌথভাবে পরাজিত বলাটাই শ্রেয়।
বিশ্বকাপের প্রস্তুতি মঞ্চ হিসেবেই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজটা কাজ করছে কষ্টিপাথরের মতো। একই সময়ে চলা আইপিএল, কিছুদিন আগেই শেষ হয়ে যাওয়া পিএসএল কিংবা পাকিস্তান-নিউজিল্যান্ড টি-টোয়েন্টি সিরিজে যে মানের ক্রিকেট খেলা দেখা গেছে বা যাচ্ছে, তার সঙ্গে বাংলাদেশের যোজন যোজন পার্থক্যটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল এই সিরিজ। ব্যাটসম্যানদের বড় রান করার, বলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রান করার সামর্থ্যরে ঘাটতির সঙ্গে বোলারদেরও চাপের মুখে রান আটকাতে না পারার অক্ষমতার সঙ্গে নিম্নমানের ফিল্ডিং- সবই ফুটে উঠছে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেই। অথচ এই জিম্বাবুয়ে দল টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও জায়গা করে নিতে পারেনি, উগান্ডার কাছে হেরে তারা ছিটকে গেছে আইসিসির এই বিশ্ব আসর থেকে।
বেশ কিছুদিন ধরেই সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে লিটন দাস, তার ব্যর্থতার ষোলকলা পূর্ণ করে কাল দর্শকের আসনে। লিটন বসলেন, সৌম্য সরকার এলেন। তানজিদ তামিমের সঙ্গে জুটি বেঁধে শতরান জুড়লেন প্রথম উইকেটে। সৌম্য খানিকটা ভুগেছেন, আবার দর্শনীয় কিছু শটও খেলেছেন। রিভার্স স্কুপে ছয়, ইনসাইড আউট কিংবা ডাউন দ্য উইকেটে এসে ছক্কা- এমন সব দর্শনীয় শট খেলেন বলেই তো শত ব্যর্থতায় তার ওপর আশাহত হন না কোচ। তানজিদ তামিম সুযোগের সদ্ব্যবহার করছেন ভালোই, জীবন পাওয়া ইনিংসটা টেনে নিয়েছেন ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় হাফসেঞ্চুরিতে। কিন্তু এই দুজনের শতরানের জুটির পর যেটা হলো সেটা রীতিমতো অবিশ্বাস্য। বিনা উইকেটে ১০১ রান থেকে ১৪৩ রানে অলআউট হয়ে যাওয়াটা কেবল বাংলাদেশের পক্ষেই সম্ভব, যে দলটা ৩ বলে ১ রান নিতে গিয়েও হারিয়েছিল ৩ উইকেট।
১৪৩ রানের ছোট পুঁজি বাঁচাতে বোলাররা যতটা ভালো বল করেছেন স্কোরকার্ড দেখাচ্ছে, আসলে করেছেন তার চেয়েও ভালো। ৩ খানা ক্যাচ পড়েছে। তাওহীদ হৃদয়, জাকের আলি অনিক, তানজিদ হাসান তামিম- তিনজন ক্যাচ ফেলেছেন। সাকিব আল হাসানের একটা প্রচেষ্টা গেছে আঙুলের ডগা ছুঁয়ে, নাজমুল হোসেন শান্ত বাউন্ডারি লাইনে ছয় বাঁচালেও ক্যাচ ধরতে পারেননি।
বোর্ড পরীক্ষার আগে টেস্ট পরীক্ষায় কোনো শিক্ষার্থী খারাপ করলে স্কুল বা কলেজ কর্র্তৃপক্ষ সেই শিক্ষার্থীকে অংশ নিতেই দেয় না। বাংলাদেশের কাছে বিশ্বকাপটা বোর্ড পরীক্ষা হলে জিম্বাবুয়ে সিরিজ হচ্ছে তার আগের সেই মান যাচাই পরীক্ষা, যেখানে ক্রিকেট দলের রিপোর্ট কার্ডে টেনেটুনে পাসও লেখা যাচ্ছে না। শতরানের জুটির পর ১৪৩ রানে গুটিয়ে যাওয়া, ৪২ রানে ১০ উইকেটের পতন এবং অখ্যাত লেগস্পিনারের ওভারে দলের বর্তমান এবং সাবেক অধিনায়কের বিদায় জানান দিচ্ছে প্রস্তুতি শূন্যের কাছাকাছি। আগে ব্যাটিং করে ১৪৩ এবং ১৬৫ রানের ইনিংস বুঝিয়ে দিচ্ছে বড় দলের বিপক্ষে কোথায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি দল। ১২০ থেকে ১৩০-এর ঘরের রান তাড়াতেও বাংলাদেশের লেগে যাচ্ছে ১৬-১৭ ওভার। বিশ্ব ক্রিকেটে জিম্বাবুয়ের এবং বাংলাদেশের অবস্থান বিবেচনায় জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে জয়ের চেয়ে জয়ের ধরনটাই বিশ্বকাপের আগে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ। চারটা ম্যাচের জয়ের ধরনটা স্পষ্ট করেই বুঝিয়ে দিল, বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে এক মাসেরও কম সময়ের আগে বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়ে।
ব্যাটিংয়ে মনে রাখার মতো কিছু না হলেও বল হাতে ৪ উইকেট নিয়ে সাকিব বুঝিয়ে দিয়েছেন, কেন তিনি সত্যিকারের অলরাউন্ডার। দুর্দান্ত একটা ক্যাচও হতে হতে হলো না, ছুটে গেল আঙুল ছুঁয়ে। ৩৫ রানে ৪ উইকেট নিয়েছেন প্রায় নয় মাস পর জাতীয় দলের হয়ে টি-টোয়েন্টি খেলে। আইপিএল ফেরত মোস্তাফিজ ১৯ রানে ৩ উইকেট নিয়ে হয়েছেন ম্যাচসেরা। উইকেট শিকারের ধারাবাহিকতাটা ধরে রেখেছেন বোলিংয়ে। সেই সঙ্গে সৌম্যর ৪১ রানের ইনিংসটা প্রশংসা আর আক্ষেপের মিশেল। যে তিনজন শেষ দুই ম্যাচের জন্য দলে ঢুকেছেন, তাদের পারফরম্যান্সে ভর করেই জিতেছে বাংলাদেশ। তাদের পরখ করে দেখার জন্যই বোধহয় বাকিদের আত্মাহুতি দিতে বলেছে টিম ম্যানেজমেন্ট। তা না হলে ৪২ রানে ১০ উইকেট হারানোর আর তো কোনো ব্যাখ্যা হয় না!