যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ উপেক্ষা করে গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় রাফায় বড় ধরনের স্থল অভিযান শুরু করেছে ইসরায়েল। গত শুক্রবার রাফার পূর্বাঞ্চল ঘিরে ফেলেছে ইসরায়েলি ট্যাংক। পূর্ব ও পশ্চিম রাফাকে পৃথককারী মাঝামাঝি সড়কেরও নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। স্থানীয় বাসিন্দারা শুক্রবার নগরীর পূর্ব এবং উত্তর-পূর্বে প্রায় অবিরাম বিস্ফোরণ ও গুলির শব্দের খবর জানিয়েছেন। নগরীর এ অংশে ইসরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস ও ইসলামিক জিহাদের যোদ্ধাদের তুমুল লড়াই চলছে। ইসরায়েল অভিযান চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় জানিয়েছে। তবে গত কয়েক দিনে গাজায় ইসরায়েলি অভিযান নিয়ে সুর পাল্টেছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশেষ করে রাফায় অভিযান না চালাতে বারবার ইসরায়েলকে নিষেধ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। স্থগিত করেছে অস্ত্রের চালানও। আর সবশেষ, গত শুক্রবার দেশটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, চলমান গাজা যুদ্ধে কোনো কোনো ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে পাওয়া অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে ইসরায়েল আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লঙ্ঘন করে থাকতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট বলছে, এটি মূল্যায়ন করা যুক্তিসঙ্গত যে, যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা অস্ত্র ব্যবহারে কিছু বাধ্যবাধকতা থাকলেও ইসরায়েল সেসব ‘অসংগতিপূর্ণ’ উপায়ে ব্যবহার করে থাকতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের হাতে এই সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্য নেই বলে জানিয়েছে স্টেট ডিপার্টমেন্ট। বিবিসি জানিয়েছে, এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন শুক্রবার কংগ্রেসে জমা দেওয়া হয়েছে।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছিলেন, গাজার দক্ষিণাঞ্চলের রাফাহ নগরীতে বড় ধরনের অভিযান চালিয়েও ইসরায়েল হামাসকে পরাস্ত করতে পারবে না। হোয়াইট হাউজে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের মুখপাত্র জন কারবি বলেন, তার (বাইডেন) মতে, রাফাহ ধ্বংস করে হামাসকে নির্মূলের লক্ষ্য সাধনে ইসরায়েল এগোতে পারবে না।
কারবি বলেন, ইসরায়েল হামাসকে অনেকটাই চাপে ফেলতে সক্ষম হয়েছে। নতুন করে রাফায় অভিযান কেবল বেসামরিক নাগরিকদের ঝুঁকিই বাড়াবে। তাছাড়া রাফায় অভিযান আদতে যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনার টেবিলে হামাসের হাতকেই আরও শক্তিশালী করবে, ইসরায়েলের নয়।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শুক্রবার ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েলি হামলায় আরও ৩৯ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। এতে করে ভূখণ্ডটিতে নিহতের সংখ্যা ৩৫ হাজারের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, গত বছরের অক্টোবর থেকে চলা এই হামলায় নিহত ফিলিস্তিনিদের সংখ্যা বেড়ে ৩৪ হাজার ৯৪৩ জনে পৌঁছেছে। আহত হয়েছে আরও ৭৮ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি।
রাফায় নতুন করে হামলার বিষয়ে গতকাল হামাস জানিয়েছে, তারা নগরীর পূর্ব দিকে একটি মসজিদের কাছে ইসরায়েলি ট্যাংকে চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়েছে। ইসরায়েলের ট্যাংক যে পূর্বাঞ্চল থেকে নগরীর উপকণ্ঠের কয়েক কিলোমিটার ভেতরে নির্মিত এলাকায় ঢুকে পড়েছে, এ তারই লক্ষণ।
ইসরায়েল রাফার পূর্বাঞ্চল থেকে বেসামরিক নাগরিকদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। হামলার আশঙ্কায় ইতিমধ্যে লাখো মানুষ নগরী ছেড়ে পালিয়েছে। এর আগে এই রাফাই ছিল গাজার অন্যান্য অংশ থেকে পালিয়ে আসা ১০ লাখেরও বেশি মানুষের আশ্রয়স্থল।
ইসরায়েল বলছে, হামাস যোদ্ধাদের নির্মূল করতে হলে রাফায় হামলা না চালিয়ে তারা জয়লাভ করতে পারবে না। কারণ, হামাস যোদ্ধারা রাফাতেই আশ্রয় নিয়ে আছে বলে তাদের বিশ্বাস। ওদিকে হামাস বলছে তারা রাফাকে সুরক্ষিত রাখার জন্য লড়বে।
রাফার পশ্চিমে তেল আল-সুলতানের বাসিন্দা আবু হাসান বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, এ নগরী নিরাপদ নয়। গোটা রাফাই নিরাপদ নয়। কারণ গতকাল থেকে সব জায়গাতেই ট্যাংকের গোলা এসে পড়ছে।
আমি চলে যাওয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু আমার পরিবারের জন্য একটি তাঁবু কিনতে আমি দুই হাজার শেকেল জোগাড় করতে পারছি না। ইসরায়েলের সেনারা কেবল রাফার পূর্বদিকেই নয়, গোটা রাফাকেই ট্যাংকের গোলা ও বিমান হামলার নিশানা করেছে।
গতকাল বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজা যুদ্ধে শুরু থেকেই ইসরায়েলকে সমর্থন দিয়ে আসছিল দেশটির সবচেয়ে বড় মিত্র যুক্তরাষ্ট্র। তবে গাজায় নিরীহ মানুষের প্রাণহানি বাড়তে থাকায় ধীরে ধীরে কঠোর অবস্থানে যেতে শুরু করে বাইডেন প্রশাসন। এরই ধারাবাহিকতায় ইসরায়েলসহ অন্য পক্ষগুলো কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা অস্ত্র ব্যবহার করছে, তা মূল্যায়নের নির্দেশ দিয়েছিল হোয়াইট হাউজ।
তবে স্টেট ডিপার্টমেন্টের প্রতিবেদনে গাজায় কিছু অভিযান নিয়ে ইসরায়েলের তিরস্কার করা হলেও দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনী সেখানে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে কি না, সে সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলা হয়নি। গাজায় ইসরায়েলকে যে ‘অভাবনীয় সামরিক চ্যালেঞ্জ’ মোকাবিলা করতে হয়েছে, সেটাও বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।
যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা অস্ত্র ব্যবহারে আইন মেনে চলতে ইসরায়েলের দেওয়া নিশ্চয়তা ‘বিশ্বাসযোগ্য এবং নির্ভরযোগ্য’ উল্লেখ করে অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখা যেতে পারে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
এতে আরও বলা হয়েছে, গাজা যুদ্ধে হামাস সামরিক উদ্দেশে বেসামরিক স্থাপনা ও নাগরিকদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। ফলে এমন একটি সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্রে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি অস্ত্রের ওপর নির্ভরশীল ইসরায়েল সম্ভবত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণভাবে সেসব অস্ত্র ব্যবহার করেছে, অথবা বেসামরিক নাগরিকদের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে।
এতে বলা হয়েছে, যেকোনো সামরিক অভিযানে বেসামরিক মানুষদের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে ইসরায়েলের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং সরঞ্জাম রয়েছে। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের যে চিত্র, যেখানে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির মাত্রা ব্যাপক, তখন প্রশ্ন উঠতে পারে, সেসব কার্যকরভাবে ব্যবহার করছে কি না।
জাতিসংঘ এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো গাজায় বেসামরিক ক্ষতি কমাতে ইসরায়েলের প্রচেষ্টাকে ‘অসংগত, অকার্যকর এবং অপর্যাপ্ত’ উল্লেখ করেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। সংঘাতের শুরুর দিকে গাজায় সর্বোচ্চ মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টায় ইসরায়েল পুরোপুরি সহযোগিতা না করলেও সেই পরিস্থিতি এখন বদলেছে বলে স্টেট ডিপার্টমেন্টের মূল্যায়নে উঠে এসেছে।
এই প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা দেওয়া তুরস্কে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ডেভিড স্যাটারফিল্ড বলেছেন, এ ধরনের প্রতিবেদন এটাই প্রথম এবং ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করার কাজটি চালিয়ে যাবে যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বে যত সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে, তার মধ্যে এটি (গাজা) কিছুটা অন্যরকম। এখানে যেসব ঘটনা উদ্ভূত হচ্ছে আমরা সবগুলোকেই খোলামেলা কিন্তু বিশ্বাসযোগ্যভাবে বিবেচনা করার চেষ্টা করছি।