সুপারহিরো পেরেজ ও নিখাদ ভালোবাসার আখ্যান

শাহরুখ খান অভিনীত ‘স্বদেশ (Swades)’ চলচ্চিত্রটির কথা মনে আছে! অর্থ-যশ-সাচ্ছ্ন্দ্য উপেক্ষা করে নিজের শেকড়ের প্রতি ভালোবাসার গল্পে মোড়া চলচ্চিত্রটি। তেমনই আরেক গল্পের বাস্তব রূপায়ন হলো এবার স্প্যানিশ ফুটবলে। আর সেই গল্পের নায়ক লুকাস পেরেজ। কাহিনীর আবহ বিবর্তিত ‘সুপার দেপোর’ খ্যাত স্প্যানিশ ক্লাব দেপোর্তিভো লা করুনাকে ঘিরে।

এবার লা লিগায় জিরোনা যে কাণ্ড করে দেখিয়েছে একটা সময় দেপোর্তিভো লা করুনা তার চাইতে অনেক বেশি করে দেখিয়েছে। এ পর্যন্ত লা লিগা শিরোপা জিতেছে স্পেনের মাত্র ৯টি ক্লাব। দেপোর্তিভো লা করুনা তার মধ্যে একটি। ১৯৯৯-২০০০ মৌসুমটি ছিল তাদের সেই খুশির ক্ষণ। ২০০১-০২ মৌসুমে জিতে নিয়েছিল কোপা দেল রে ট্রফি। লা লিগায় শিরোপা জেতার পরের দুই মৌসুম রানার্স আপও হয় তারা। এমনকি ইউরোপ শ্রেষ্ঠত্বের মঞ্চে ২০০০-০১ ও ২০০১-০২ মৌসুমে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলার পর ২০০৩-০৪ মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগ সেমিফাইনাল খেলে ক্লাবটি।

স্বর্ণালী সেই সময় পেছনে ফেলে ধুঁকতে ধুঁকতে ২০১৮ সালে দ্বিতীয় বিভাগের পর ২০২০ সালে স্পেন ফুটবলের তৃতীয় বিভাগে নেমে যায় দলটি। গত চার বছর ধরে তৃতীয় বিভাগ খেলতে থাকা দলটির দৈন্য দশা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন ছিল একজন সুপারহিরোর। একজন লুকাস পেরেজের।

কেন? স্পেনের যে শহরের ক্লাব এই দেপোর্তিভো, সেই আ করুনায় জন্ম পেরেসের। এই ক্লাবের হয়ে খেলার স্বপ্ন দেখতেন তিনি ছোটবেলা থেকেই। কিন্তু ফুটবলে ক্যারিয়ার গড়তে তাকে ছাড়তে হয় ঘর। যুব পর্যায়ে কয়েকটি ক্লাব ঘুরে তিনি যোগ দেন আতলেতিকো মাদ্রিদের ‘সি’ দলে। সেখান থেকে রায়ো ভায়োকানোর ‘বি’ দলে। পরে অভিষেক হয় ক্লাবটির মূল দলের হয়ে। সেখান থেকে ইউক্রেন ও গ্রিসের কিছু ক্লাবে খেলেন তিনি।

লুকাস পেরেজ

অবশেষে দেপোর্তিভোর হয়ে খেলার স্বপ্ন পূরণ হয় তার ২০১৪ সালে। গ্রিক দল পিএওকে থেকে ২০১৪-১৫ মৌসুমে ধারে নিজ শহরের ক্লাবে যোগ দেন তিনি। চোটের কারণে সেবার খুব বেশি ম্যাচ যদিও খেলতে পারেননি। তবে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ঠিকই হয়ে ওঠেন দলের ত্রাতা। লা লিগার শেষ রাউন্ডে ন্যু ক্যাম্পে বার্সেলোনার সঙ্গে দুই গোলে পিছিয়ে পড়েও ২-২ ড্র করে অবনমন এড়ায় দেপোর্তিভো। দলের প্রথম গোলটি করেছিলেন পেরেজ। পরের মৌসুমে পাকাপাকিভাবে দেপোর্তিভোয় এসে দেখান নৈপুণ্যের ঝলক। লা লিগায় ১৭ গোল করে হয়েছিলেন দলের সর্বোচ্চ স্কোরার।

পরের মৌসুমে আর্সেনালে যোগ দেন পেরেজ। এক মৌসুম পর ধারে বাড়ি ফিরলেও সেবারই দ্বিতীয় বিভাগে নেমে যায় দেপোর্তিভো। পেরেজও ফেরেন ইংলিশ লিগে, ওয়েস্টহামে। ২০১৯ সালে স্পেনে ফিরে আলাভেস ও এলচে হয়ে ২০২২ সালে পেরেজ যোগ দেন কাদিজে। ২০২২–২৩ মৌসুমে হন কাদিজের সর্বোচ্চ গোলদাতা। ঠিক ওই সময়ে পেরেজের মাথায় যে চিন্তা ভর করে তা যেকোনো পেশাদার ফুটবলারের ক্যারিয়ারের আত্মহননের সমান।

পেরেজ সিদ্ধান্দ নেন দেপোর্তিভোয় ফেরার। তৃতীয় স্তরের দলটির কাছে পেরেজের রিলিজ ক্লজের অর্থ সংস্থানের ব্যবস্থাও নেই। আরও এক কাঠি পাগলামিতে মাতেন পেরেজ। রিলিজ ক্লজের অর্ধেক টাকা নিজের পকেট থেকে দেন। টাকার অঙ্কে সেটি ৪ লাখ ৯৩ হাজার ইউরো। বাংলাদেশি মুদ্রায় সাড়ে ৫ কোটি ইউরোর বেশি।

সেই পেরেজের গোলে গত রবিবার বার্সেলোনা আতলেতিককে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে তারা নিশ্চিত করে দ্বিতীয় স্তরে ওঠা। ৩১ হাজার ৮৩৩ জন দর্শকের উপস্থিতিতে ঘরের মাঠে ৫৭তম মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে চমৎকার ফ্রি-কিকে বল জালে পাঠান ৩৫ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড। আগামী মৌসুমে তা দেপোর্তিভোকে আবার দেখা যাবে দ্বিতীয় বিভাগে।

চলতি মৌসুমে ৩০ ম্যাচে ১২ গোল ও ১৭টি গোল করানো এই ফরোয়ার্ড কেবল প্রথম ধাপটি পার হলেন। দেপোর্তিভোয় ফেরার আগে বলেছিলেন, ক্লাবটিকে শীর্ষ লিগে ফিরিয়ে নিতে চান। সে লক্ষ্যে এবার প্রথম ধাপটা পাড়ি দিলেন পেরেজ। সুপারহিরো পেরেজের ভালোবাসার গল্পে লেখা হোক আরও কয় পাতা। আগামী মৌসুমে আরেকবার খুশিতে উদ্বেল হয়ে উঠুক আ করুনার মানুষগুলো। পেরেজের পায়ে ভর করে শীর্ষ লিগে ফিরে যাক ক্লাবটি।