ফুটবলে কেন ব্যর্থ আবাহনী

ইতিহাস গড়ে টানা পঞ্চমবারের মতো প্রিমিয়ার লিগ জিতেছে বসুন্ধরা কিংস। করপোরেট ক্লাবটির আগ্রাসনে মসনদ হারিয়ে এখন রিক্ত আবাহনী। বসুন্ধরা-পূর্ব আমলে তারাই ছিল সেরা। জিতেছিল ছয়টি লিগ শিরোপা। অথচ সেই সুদিন হারিয়ে আবাহনী এখন ধুঁকছে। ভুলে গেছে লিগ শিরোপার স্বাদ। চলতি মৌসুম শেষ করতে হচ্ছে একেবারের শূন্য হাতে। গত মৌসুমের মতো এবারও মিলছে না কোনো শিরোপা। এর পরও গত বছর জুটেছিল লিগ টেবিলে দ্বিতীয় স্থান। এবার সেটা পাওয়া নিয়েও শঙ্কা। রানার্সআপের লড়াইয়ে এগিয়ে চিরশত্রু মোহামেডান। 

অথচ গেল একটি মৌসুমে অনেক কিছুতেই বদল আনার চেষ্টা করেছে আবাহনী। কোচ বদলেছে, ম্যানেজমেন্টেও এসেছে বদল। দীর্ঘদিনের ম্যানেজার সত্যজিৎ দাস রুপুকে সরানো গেছে। নীতিনির্ধারকদের চিন্তাধারায়ও এসেছে পরিবর্তন। তবে ভাগ্য বদলায়নি ফুটবল দলের। ঐতিহ্যবাহী ক্লাবটি এবার ক্রিকেট ও হকির শীর্ষ লিগে সেরা হয়েছে। তবে ফুটবলে ঠিক উল্টোরথে যাত্রা।

২০০৭ সালে পেশাদার লিগের যাত্রা শুরু। হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর কিছুটা বিরতি দিয়ে নিয়মিতই লিগ শিরোপা গেছে আবাহনীর ঘরে। সর্বশেষটা ২০১৭-১৮ মৌসুমে। এরপরই বসুন্ধরার আগমন। আর আবাহনীর পিছু হটার শুরু। অভিষেক রাঙাতে আকাশি শিরিবে হানা দেয় বসুন্ধরা। সে সময়ের তারকাদের ছিনিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি উঁচুমানের বিদেশি এনে শিরোপার জয় শুরু বসুন্ধরার।  ফি মৌসুমেই আবাহনীর সেরাদের ছিনিয়ে এনে দলীয় শক্তি বাড়িয়েছে বসুন্ধরা। চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আবাহনীর কর্তারা কিছুই করেননি।

চলতি বছর চারবারের দেখায় বসুন্ধরার কাছে বাজেভাবেই হেরেছে আবাহনী। এতটা বিবর্ণরূপে আর কখনো দেখা যায়নি আবাহনীকে। তাদের ব্যর্থতার সুলুক সন্ধানে কথা হয় দল সংশ্লিষ্ট সাবেক-বর্তমান অনেকের সঙ্গে। একটা সময় আবাহনীর জার্সিতে মাঠ মাতানো, তবে বর্তমানে অন্য ক্লাবে খেলা ফুটবলারদের কাছে প্রশ্ন ছিল। তাদের কথায় স্পষ্ট, আবাহনী কোথায় পিছিয়ে। আবাহনীর একসময়ের তারকা ও সাবেক পরিচালক আশরাফউদ্দিন আহমেদ চুন্নু বলেন, ‘আমি নিজেকে সব সময় আবাহনীর চুন্নু হিসেবে পরিচয় দিই। এতে আমি গর্ববোধ করব। সেই দলটাকে যখন মাঠে বারবার হোঁচট খেতে দেখি, হৃদয় ভেঙে যায়। দায়িত্বে অবহেলা ও আন্তরিকতার অভাবের কারণে একটি করপোরেট ক্লাবের কাছে বারবার ধরাশায়ী হতে হচ্ছে আমাদের।’

অতীতে আবাহনীতে খেললেও বর্তমানে বসুন্ধরায় খেলা এক ফুটবলার ধরে ধরে দুই ক্লাবের পার্থক্যটা বুঝিয়ে দিলেন, ‘প্রথমত, বসুন্ধরায় আমরা আর্থিক দিক থেকে নিশ্চিন্ত হয়ে খেলতে পারি, যেটা আবাহনীতে পারতাম না। কমিটমেন্টের টাকাটা পেতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হতো। যেটা এখানে হয় না। দ্বিতীয়ত, চুক্তি ছাড়াও এখানে আমরা সর্বোচ্চ পর্যায়ের সুযোগ-সুবিধা পাই। কোনো খেলোয়াড় চোট পেলে চিকিৎসার সব দায়িত্ব নেয় বসুন্ধরা। শতভাগ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত পুনর্বাসনের সব ব্যবস্থাই মিলে যায়। যখন আবাহনীতে খেলতাম, সেটার ভীষণ অভাব দেখেছি। তৃতীয়ত, বসুন্ধরার বিশ^মানের একটা প্র্যাকটিস গ্রাউন্ড আছে, নিজস্ব গেম ভেন্যু আছে। এটা আমাদের অনেক বেশি স্বস্তি দেয়। যেটা অন্য কোনো ক্লাবের ফুটবলাররা পায় না। এসব কারণেই আমরা বসুন্ধরায় খেলে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।’

আরেক ফুটবলার যোগ করলেন, ‘দেখুন, বসুন্ধরায় খেললে আমি জানি আমার ক্যারিয়ার কমপক্ষে দুই বছর লম্বা হবে। যেটা আবাহনী কিংবা অন্য দলে খেললে সম্ভব না। ভীষণ পেশাদারি দেখেছি এখানে। তা ছাড়া কমিটমেন্ট একটা বড় বিষয়। আমরা এখানে আর্থিক নিরাপত্তা পাই। তবে আবাহনীতে পেমেন্টের জন্য মৌসুম শেষ হওয়ার পরও অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে। কর্তাদের পেছন পেছন ঘুরতে হয়েছে। তা ছাড়া থাকা-খাওয়ার দিক থেকেও বসুন্ধরা অনেক এগিয়ে। আমরা নিউট্রেশনের জন্য বসুন্ধরায় অনেক সাপ্লিমেন্ট পাই প্রতিনিয়ত। যেগুলো ৯০ মিনিট মাঠে একতালে খেলতে সহায়তা করে। আবাহনীতে যখন খেলতাম, এতটা দেখিনি। কিংসের আবাসনব্যবস্থা আবাহনীর চেয়ে ভালো; বিশেষ করে আবাহনীতে আমাদের কমন বাথরুম ব্যবহার করতে হতো। যেটা খুবই অস্বস্তিকর। এখানে তেমনটা হয় না।’

গত মৌসুমে আবাহনীর দায়িত্বে ছিলেন পর্তুগিজ কোচ মারিও লেমস। বর্তমানে নিজ দেশে কোচিং এডুকেশন নিয়ে কাজ করা লেমস দুই দলের পার্থক্যটা খোঁজার চেষ্টা করলেন এভাবে, ‘দল গঠন, খেলোয়াড় নির্বাচনে বসুন্ধরা সব সময় এগিয়ে থাকে। সেটা দেশি হোক কিংবা বিদেশি। তারা আবাহনীর চেয়ে খেলোয়াড়দের পেছনে বেশি লগ্নি করে। আমি যে কটি মৌসুম কাজ করেছি, দেখেছি প্রতিবারই বসুন্ধরা আবাহনীর ডেরা থেকে ভালো পারফরমারদের নিয়ে গেছে। তারা সেরাদের নিয়ে নিজেদের শক্তিশালী করার পাশাপাশি প্রতিপক্ষদের দুর্বল করতে।’

রুপুর জায়গায় ম্যানেজারের হট সিটে বসে কাজী নজরুল ইসলাম নিরূপায় হয়ে যেন দায়টা স্বীকার করে নিলেন। ফেডারেশন কাপে বসুন্ধরার কাছে হারার পর এক সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘কী করব বলুন। আমাদের শক্তি এতটুকুই। এর চেয়ে আমরা বেশি ভালো খেলতে পারি না! বড় ম্যাচে বিদেশি খেলোয়াড়রা জ¦লে উঠতে পারছে না। ওদের (বসুন্ধরার) বিদেশিরা কেমন খেলছে, আর আমাদেরগুলো দেখুন। পার্থক্য তো মাঠেই পরিষ্কার।’

অসফল হওয়ার আসল কারণটা খুঁজে হয়রান আবাহনীর নীতিনির্ধারকরাও। ক্লাবটির প্রধান নির্বাহী হিসেবে এক বছর ধরে কাজ করছেন মেজর জেনারেল (অব.) হুমায়ুন। এই কর্তা দাবি করলেন ক্লাবের নীতিনির্ধারকদের আন্তরিকতার কোনো কমতি নেই, ‘দেখুন, আগে কী হয়েছে, সেটা বলতে পারব না। এক বছরে আমরা চেষ্টা করছি। এই মৌসুমে একটা ফুটবলারও চুক্তি কিংবা দেনা-পাওনা নিয়ে কোনো অভিযোগ তুলতে পারবে না। দল যখন খারাপ করে, তখন ক্লাবের শীর্ষ কর্তারা আশাহত হয়। এ কারণেই আমরা এই মৌসুমে কিছু পরিবর্তন এনেছিলাম।’

আগামী মৌসুমে আরও ভালো মানের দল গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এই কর্মকর্তা, ‘আমাদের ফুটবল কমিটি সাফল্য পেতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাজেট আমাদের জন্য কোনো সমস্যা নয়। প্রথমত, আমরা সেরা স্থানীয়দের নিয়ে একটা দল গড়তে চাই। পরে পজিশন বুঝে আরও ভালো মানের বিদেশি আনতে চাই। একটা জিনিস বুঝি, আবাহনীকে ঘুরে দাঁড়াতেই হবে। এটা দেশের ফুটবলের জন্যই প্রয়োজন।’

লিগে এখন পর্যন্ত একবারও বসুন্ধরাকে হারাতে পারেনি আবাহনী। স্বাধীনতা কাপ, ফেডারেশন কাপে এক-আধবার জিতলেও বেশিরভাগ সময়ই ধরাশায়ী হতে হয়েছে। শেষ হতে যাওয়া মৌসুমে তো বসুন্ধরার ধারেকাছেই ছিল না আবাহনী। আকাশির পাঁড় সমর্থকদের জন্য এ ভীষণ অপমানের। এত বড় আঘাতের পর যদি হুঁশ হয় আবাহনীর কর্তাদের।