বিদ্যমান নব্য-উদারনৈতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটি ১৯৭০ এর দশকে শ্রীলঙ্কায় পরিচিতি পায়। ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টির নেতা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের নেতৃত্বে প্রচারিত বিশ্ব নব্য-উদারতাবাদী শিবিরের শ্রীলঙ্কান এজেন্ট জয়াবর্ধনে ১৯৭৮ সালের নির্বাচনের পর তা বাস্তবায়ন করেন। তবে তখন শ্রীলঙ্কায় চলা গৃহযুদ্ধ ও যুব সমাজের বিদ্রোহের কারণে নব্য উদারনৈতিক সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। ২০০৯ সালে গৃহযুদ্ধের অবসানের পর, মাহিন্দা রাজাপাকসের শাসনামল নব্য উদারনৈতিক সংস্কারকে ত্বরান্বিত করেছে। তারা পৌরাণিক ধারণার মতো ভেবেছিল যে, বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে পারলেই অর্থনৈতিক সংকটের সমাধান করা সম্ভব। তারা ভেবেছিল বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য দেশে প্রচুর অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সুবিধা গড়ে তুলতে হবে। এ চিন্তা থেকেই আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানাদি, সরকার এবং বিভিন্ন সার্বভৌম বন্ড থেকে প্রাপ্ত বিলিয়ন বিলিয়ন মূল্যের ঋণ ব্যবহার করে ব্যাপক রাস্তাঘাট নির্মাণসহ অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় ও অকার্যকর উন্নয়ন কর্মসূচি চালু করে। ২০২২ সালে মোট বিদেশি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি এবং শ্রীলঙ্কাকে ঋণের কিস্তি হিসেবে অতিরিক্ত ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পরিশোধের বাধ্যবাধকতা ছিল। ২০২৩ সালে এটি ৬.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়। শ্রীলঙ্কা তার বৈদেশিক ঋণের ৪৭% সার্বভৌম বন্ড বাজারের মাধ্যমে, ১৩% এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক থেকে, ৯% বিশ্বব্যাংক থেকে, ১০% চীন থেকে, ১০% জাপান থেকে এবং ২% পায় ভারত থেকে।
শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি এই বিশাল পরিমাণ ঋণের বোঝা বহন করতে পারছিল না। ২০২২ সালের মার্চ মাসে ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণের একটি কিস্তি প্রদান করেই দেশটির বৈদেশিক রিজার্ভ তলানিতে গিয়ে ঠেকে। অবশিষ্ট রিজার্ভ আমদানি ব্যয় মিটানোর জন্য ছিল অপর্যাপ্ত। ফলে জ্বালানি, ওষুধসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের মারাত্মক ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে, পেট্রোল পাম্পগুলোতে স্বাভাবিকভাবেই জ্বালানি ও গ্যাসের জন্য ভোক্তাদের দীর্ঘ লাইন দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, কাঁচামাল ও আমদানির ঘাটতির কারণে ধস নামে মাঝারি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়। এ পরিস্থিতিতে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে যে দেশটি ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে অক্ষম। এই অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব দুই অঙ্কের মুদ্রাস্ফীতিসহ বেকারত্ব এবং দারিদ্র্যের পথ প্রশস্ত করে। এর প্রতিক্রিয়ায় জনরোষ ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। হাজার হাজার মানুষ গল ফেস গ্রিন পার্ক দখলে নিয়ে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি গোতাবায়া রাজাপাকসের পদত্যাগ দাবি করে।
গল ফেস দখল ছিল বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল প্রতিবাদগুলোর মধ্যে একটি। যেখানে জনগণ মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বিশ্বের শক্তিশালী রাষ্ট্রপতিদের একজনকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছিল ও একটি রাজনৈতিক রাজবংশের পতন ঘটাতে সক্ষম হয়েছিল। গতানুগতিক ধারণা ছিল যে, নির্বাচনই একমাত্র ব্যবস্থা যার মাধ্যমে অগণতান্ত্রিক ও গণবিরোধী শাসন অপসারণ করা যায়। কিন্তু গল ফেস প্রতিবাদ প্রমাণ করেছে জনগণের শক্তি কীভাবে কোনো রক্তপাত ছাড়াই জবাবদিহিতাহীন শাসন ও শাসকদের অপসারণ করতে পারে।
গল ফেস সংগ্রামের গণজমায়েত ছত্রভঙ্গ করার জন্য সর্বাধিক পুলিশি ও সামরিক শক্তি প্রয়োগ করেছিল তৎকালীন সরকার। ৫০০০ এরও বেশি লোককে গ্রেপ্তার করা হয়, প্রাণ হারান ৯ জন বিক্ষোভকারী। কিন্তু গল ফেসের লাখ লাখ আন্দোলনকারী জনতা ৯ জুলাই অবিলম্বে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠলে সামরিক বাহিনীও সরকারের পক্ষ ত্যাগ করে।
বিক্ষোভকারীরা শ্রীলঙ্কার সংকটের প্রস্তাবিত সমাধানসহ একটি ঘোষণা উপস্থাপন করেছিল। এটি কেবল একটি নথি নয়, বরং ঘোষণাটি ছিল সিস্টেম পরিবর্তনের আহ্বান জানানোর পা-ুলিপি। এতে ব্যর্থ প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের বিকল্প হিসেবে অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র গড়ে তোলার প্রস্তাব করা হয়েছিল। অভূতপূর্ব এই সংগ্রাম সিংহলি ভাষায় ‘আরাগালায়া’ নামেই পরিচিতি পায়। যার অর্থ সংগ্রাম বা বিক্ষোভ। কিন্তু এই আরাগালায়-উত্তর যুগে আবারও শাসকরা স্থিতাবস্থা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে। তবে, আরাগালায়ার একটি অংশ অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের বিকল্প মডেল হিসেবে সারা দেশে গণপরিষদ প্রতিষ্ঠা করে জনগণের ক্ষমতার গতি বজায় রেখেছে।
শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক মন্দার পেছনের প্রধান কারণসমূহের মধ্যে রয়েছে বাণিজ্য ঘাটতি, ঋণ সংকট, পরিষেবা আয় বিলুপ্তি, আর্থিক ও ট্যাক্স কেলেঙ্কারি, দুর্নীতি। এছাড়া, অর্থনৈতিক বিষয়ে রাষ্ট্রের নিজেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া এবং মুদ্রা ছাপিয়ে সংকট মোকাবিলার প্রচেষ্টা। ২০২২ সালে নতুন উদার অর্থনৈতিক নীতির কারণে আট বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। রপ্তানি আয়ের বিপরীতে আমদানি ব্যয় ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। ঋণ সংকটের কথা বলতে গেলে, আমরা মূলত ঋণের জালে আটকা পড়েছিলাম। নব্য উদারতাবাদের প্রধান আদর্শগত ভুল দিকগুলোর মধ্যে একটি হলো যে, রাষ্ট্রকে আবশ্যিকভাবে অর্থনৈতিক বিষয়ে জড়িত হওয়া থেকে বিরত রাখার নীতি। এভাবে সরকারি প্রতিষ্ঠানের বেসরকারিকরণকে অনুমতি দেওয়ার মাধ্যমে যা কিছু করা হয়েছিল, সেসব কিছু নব্য উদারতাবাদের অন্যতম প্রধান নীতি মেনেই হয়েছিল। ফলে জনমুখী ও ন্যায়পরায়ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তে সমগ্র অর্থনীতি মুনাফামুখী বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছিল এবং উন্নত সেবা খাত গড়ে ওঠার পেছনেও একই কারণ ছিল। অর্থাৎ মুনাফা। অর্থনীতির এমন এক বুদবুদ তৈরি করা হয়েছিল, যেখানে অর্থনীতির সুবিধাসমূহ শ্রমিক শ্রেণির কাছে পৌঁছাচ্ছিল না। বরং পুঁজি সঞ্চয়ের হিসাবে অর্থনীতির ৬৫% চলে যায় মাত্র ৫% মানুষের হাতে। এর বাইরে আমদানি-রপ্তানি খাতে দুর্নীতি, জালিয়াতি ও কেলেঙ্কারি এবং ব্যবসায়ী অভিজাত ও অতি ধনীদের কর ফাঁকির পরিমাণ ছিল যথেষ্ট বেশি। গ্লোবাল ফিনান্স ইন্টিগ্রিটি রিপোর্ট অনুসারে আমদানি ও রপ্তানি জালিয়াতির কারণে আমরা প্রায় ৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার হারিয়েছি। অধিকন্তু, বড় কোম্পানিগুলো প্রায় ৯৫০ বিলিয়ন টাকার কর পরিশোধ না করে কর-খেলাপি হয়েছে। খেলাপি হওয়া এ ট্যাক্স পুনরুদ্ধার করার পরিবর্তে এবং মূলধন হিসেবে জমা হওয়া পাবলিক তহবিলের অপব্যবহারের দিকে নজর না দিয়ে সরকার দুই বছরের সংকটকালে আরও মুদ্রা ছাপানোর সিদ্ধান্ত নেয়। সিদ্ধান্ত মোতাবেক প্রায় তিন ট্রিলিয়ন টাকা মুদ্রণ করা হয়। এ সবের ফলে মূল্যস্ফীতির মাত্রা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়।
আরাগালায়ার প্রধান কৃতিত্ব ছিল যে এটি কেবল সংসদের বাইরে ক্ষমতার ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এবং দেখিয়েছে যে, জনগণের শক্তি যথার্থ রাজনৈতিক পাটাতনে দাঁড়াতে পারে এবং দায়বদ্ধ ঐতিহ্যগত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বকাজে বহাল রাখতে পারে। যেহেতু এ ধারণাটি জিইয়ে রাখার জন্য কার্যকর ও প্রতিষ্ঠিত কোনো ব্যবস্থা ছিল না, তাই ‘পিপলস কাউন্সিল’-এ আন্দোলনের জন্য আরাগালায়ার প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি এখন জনগণকে সংগঠিত করার প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়েই যাচ্ছে। পাশাপাশি সংসদের বাইরে ক্ষমতার ধারণা নিয়ে আলোচনা করছে সারা দেশে গণপরিষদ তৈরির মাধ্যমে।
এ কথা বলাই যায় যে, অবশ্যম্ভাবীভাবে আরও গণঅভ্যুত্থান ঘটবে। কারণ বিদ্যমান নব্য উদারনৈতিক ব্যবস্থায় জনগণের দগদগে সমস্যাগুলোর দৃঢ় কোনো সমাধান নেই। সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। তরুণ প্রজন্ম মরিয়া। বেকারত্বের হার মারাত্মকভাবে বেড়েছে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক লোক দেশান্তরিত হয়েছে, আত্মহত্যার হার বাড়ছে। বিপজ্জনক মাদকের বিস্তার, অপুষ্টি এবং দারিদ্র্যের মাত্রা সর্বকালের সর্বোচ্চে পৌঁছেছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সমাজ ও সামাজিক মূল্যবোধকে বিভ্রান্ত করছে। সবকিছুই ক্ষয়ে যাচ্ছে।
উল্লিখিত পরিস্থিতিতে নির্বাচনের সময় পর্যায়ক্রমে চেহারা পরিবর্তনের পরিবর্তে একটি বাস্তব ব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবি করছে শ্রীলঙ্কার সমাজ। এ পরিবর্তনের জন্য বিচ্ছিন্ন প্রতিবাদ অপর্যাপ্ত। সমাজের প্রতিটি অংশের অংশগ্রহণে আমাদের একটি গণআন্দোলন দরকার। একটি গণমুহূর্তের মধ্য দিয়ে জনগণকে রাজনীতি করার আহ্বান জানানো উচিত। সমাজের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সম্পৃক্ত হওয়া উচিত।
পুঁজিবাদী শাসন মূলত আইএমএফের শর্ত বাস্তবায়ন, নিপীড়নমূলক আইন প্রণয়ন, নির্বাচন স্থগিত করা এবং বিশ্ব পরাশক্তির ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এজেন্ডা মেনে চলার ওপর প্রতিষ্ঠিত। ভারত একটি উদীয়মান বৈশ্বিক পরাশক্তি। দেশটি শ্রীলঙ্কার জ¦ালানি সেক্টরের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের মধ্যে রয়েছে। পাশাপাশি কৌশলগতভাবে মূলধন প্রদানের মাধ্যমে ব্যবসায়িক উদ্যোগও গ্রহণ করছে। ভারত বিশ্বের দুই পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী প্রতিযোগিতার কেন্দ্র হিসেবে শ্রীলঙ্কাকে ব্যবহার করতে চাচ্ছে।
যারা আরাগালায়ার বিরোধিতা করেছিল, তারা সংগ্রামটিকে ‘আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিছু রাজনৈতিক দল এবং বর্তমান রাষ্ট্রপতি উক্ত সংগ্রামকে নৈরাজ্যবাদী বিদ্রোহ হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করেছে। তথাকথিত সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটরা একে অগণতান্ত্রিক এবং সহিংস বলে ব্যাখ্যা করেছেন। অন্যদিকে, আশাবাদী দলগুলো আরাগালায়াকে বিপ্লব হিসেবেই অভিহিত করে। যা হোক, ২০২২ সালের আরাগালায়াকে শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে চিত্রিত করা যায়। যা জনগণের শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ভিত্তি কাঁপিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল।
যদিও গল ফেস বিদ্রোহকে জনগণের একটি স্বতঃস্ফূর্ত অভ্যুত্থান হিসেবেই সংজ্ঞায়িত করা হয়েছিল। তথাপি সেখানে বেশ কয়েকটি ঘটনা এবং প্রতিঘটনার জন্ম হয়, যা অভ্যুত্থানটিকে সংগ্রামের দিকে নিয়ে যায় এবং এতে প্রাণহানির মতো ঘটনা ঘটে। শিক্ষা বেসরকারীকরণের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলন থেকে এর শুরু, যা একের পর এক বিক্ষোভের জন্ম দেয়। কৃষকরা অনর্থক সার নীতির বিরুদ্ধে লাগাতার প্রতিবাদ করে। সরকার কর্র্তৃক গৃহীত অগণতান্ত্রিক আইন ও পদক্ষেপের বিরুদ্ধে একাধিক জনবিক্ষোভ সংঘটিত হয়। যা হোক, কোনো সন্দেহ নেই যে গল ফেস পার্ক দখলের আন্দোলন ছিল উপরোক্ত উগ্রবাদী, নব্য উদারনীতি বিরোধী ধারার সংগ্রামের সংমিশ্রণ।
দ্য হ্যামার-এর ওয়েবসাইট থেকে ভাষান্তর : মোহাম্মদ ফজলে রাব্বি
লেখক: শ্রীলঙ্কার ফ্রন্টলাইন সোশ্যালিস্ট পার্টির নেতা