ঢাকার সড়কে ব্যাটারিচালিত কোনো রিকশা চলাচল করতে পারবে না। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের এই ঘোষণার চার দিন পর আজ সোমবার তিনি আবার ঘোষণা করলেন, ঢাকা মহানগরীর সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক চলাচল করতে পারবে। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে মন্ত্রিসভার অনির্ধারিত আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা দেন বলে জানিয়েছেন সেতুমন্ত্রী। তিনি জানান, ‘ঢাকা সিটিতে ব্যাটারিচালিত তিন চাকার গাড়ি চলাচল নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু আজকে মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচলের অনুমতি দিতে বলেছেন। তবে ২২টি মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল বন্ধ থাকবে।
ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘দুর্মূল্যের বাজারে নিম্ন আয়ের, স্বল্প আয়ের মানুষের দুঃখ-কষ্টের বিষয় স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ নির্দেশনা দিয়েছেন। এই মুহূর্তে বর্তমানে বিশ্ব পরিস্থিতি যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা-পাল্টা নিষেধাজ্ঞার প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশের দ্রব্যমূল্যের ওপর, জ্বালানির ওপর, ডলারের ওপর বিভিন্নভাবে পড়েছে... এসব কথা বিবেচনা করে নেত্রী সিটি এলাকায় ব্যাটারিচালিত গাড়ি বন্ধের যে নির্দেশ সেটা পরিবর্তন করে চালু রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।’
অথচ গত বুধবার সড়কে ব্যাটারিচালিত কোনো রিকশা চলাচল করতে পারবে না বলে মত ছিল ওবায়দুল কাদেরের। তিনি বলেছিলেন, ঢাকায় চলাচল করা লক্কড়ঝক্কড় ও ফিটনেসবিহীন গাড়ি ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্তও নিয়েছে সরকার। কারণ হিসেবে তিনি বলেছিলেন, ইজিবাইকে ৮-১০ জন থাকে, বড় গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা লাগলে ইজিবাইকের সবাই শেষ। তখন ক্যাজুয়ালটি বেড়ে যায়। একই অনুষ্ঠানে উপস্থিত উত্তর সিটির মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, ব্যাটারিচালিত যান সড়কের জন্য ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সিদ্ধান্তে আসা দরকার যে ঢাকায় ইজি বা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলবে না। আর দক্ষিণ সিটির মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, ভয়াবহ ব্যাপার যখন রিকশাচালকরা দুই পা ওপরে উঠিয়ে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালায়। অনেক প্রতিবন্ধী আছে, যারা চোখে কিছুটা কম দেখে, তারাও এই রিকশা নিয়ে নেমে পড়ে।
সেতুমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকরা গত রবিবার সকাল থেকে রাজধানীর মিরপুরের কয়েকটি সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে। এদিন পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, যানবাহন ভাঙচুর ও পুলিশ বক্সে আগুনের ঘটনাও ঘটেছে। আজ সকাল সাড়ে ৯টার দিকেও রামপুরা এলাকা অবরোধ করেন ব্যাটারিচালিত অটো রিকশাচালকরা।
এদিকে গত ৮ ফেব্রুয়ারি দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে ‘বাংলার টেসলা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। জাতীয় সংসদে এক সম্পূরক প্রশ্নের উত্তরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ব্যাটারিচালিত এই যানবাহন সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব। রাষ্ট্রীয়ভাবে এই তিন চাকার যানকে উৎসাহিত করা হবে।
সংসদে শামীম ওসমান সম্পূরক প্রশ্নে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বন্ধের দাবি জানালে মন্ত্রী এগুলোকে উৎসাহিত করার কথা বলেন। সম্পূরক প্রশ্নে শামীম ওসমান বলেছিলেন, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলছে। রিকশার সঙ্গেও ব্যাটারি লাগানো হচ্ছে। এগুলো খুবই বিপজ্জনক। ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ চুরি করে অটোরিকশাগুলো চার্জ করা হয়। এতে ৭০০-৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে। এগুলো বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হবে কি না।
জবাবে নসরুল হামিদ বলেন, ‘সারা বিশ্বে এখন বৈদ্যুতিক গাড়ির বিপ্লব চলছে। তেলচালিত গাড়ির ইঞ্জিনের দক্ষতার মাত্রা হলো ২০ শতাংশ। অন্যদিকে ইলেকট্রিক যন্ত্রের দক্ষতা ৮০ শতাংশ। বাজারে যত দ্রুত সম্ভব ইলেকট্রিক গাড়ি আনতে আমরা উৎসাহ দিচ্ছি।’ তিনি জানান, তেলচালিত বাহনে কোনো দূরত্ব যেতে যদি ১০০ টাকা লাগে, বিদ্যুৎচালিত যানে সেই দূরত্ব যেতে লাগবে ২০ টাকা।
বাংলাদেশে ৪০ লাখের ওপর যানবাহন আছে, যেগুলো লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি ব্যবহার করে। এগুলো চার্জ করতে সাত-আট ঘণ্টা সময় লাগে। এগুলো যদি লিথিয়াম ব্যাটারির হয়, তাহলে লাগবে মাত্র আধা ঘণ্টা। প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ বিভাগ ইলেকট্রিক গাড়ি চার্জিং স্টেশন বসানোর নীতিমালা করেছে। এই নীতিমালা মেনে যে কেউ চাইলে চার্জিং স্টেশন করতে পারবেন।
নসরুল হামিদ বলেন, ‘এই ৪০ লাখ থ্রি হুইলারকে আমি বলি “বাংলার টেসলা”। উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে তারা নিজ হাতে এই যানবাহন তৈরি করছেন। আমরা তাদের কোনো বাধা দিচ্ছি না। যান্ত্রিকভাবে এতে ত্রুটি থাকতে পারে। কিন্তু বিদ্যুৎ যেটা ব্যবহার করছে তার রিটার্ন কিন্তু অনেক বেশি। এই ৪০ লাখ রিকশাচালক যারা বিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন তারা অবশ্যই আয় করছেন। লেড ব্যাটারি থেকে তারা যেন লিথিয়াম ব্যাটারিতে চলে আছে, সেটা নিয়ে আমরা একটা প্রকল্প করছি। লেড ব্যাটারি নিয়ে তাদের লিথিয়াম ব্যাটারি দেওয়া হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি বাংলাদেশে যত পাবলিক পরিবহন (বাস) আছে। সেগুলো দ্রুততার সঙ্গে বৈদ্যুতিক করা উচিত। এগুলো পরিবেশবান্ধব এবং খরচও কম। বাংলাদেশের পরিবহন খাত ১৮ শতাংশ কার্বন নিঃসরণ করে। তবে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার উদ্বেগের। আমরা এটা নিয়ে চিন্তিত। বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর নজর রাখছে। বেশিরভাগই এখন অবৈধভাবে বিদ্যুৎ না নিয়ে মিটারের মাধ্যমে নিচ্ছে।’
বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর এ ব্যাখ্যার পরও সেতুমন্ত্রী কেন হঠাৎ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছিলেন সেটাই প্রশ্ন। দুদিনের আন্দোলনের মুখে তা আবার চালু করার নির্দেশ দিতে হলো প্রধানমন্ত্রীকে।
কয়েক বছর ধরে রাজধানীসহ সারা দেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলছে। সরকারি হিসাবে এর সংখ্যা ৪০ লাখ হলেও হিসাবে আরও বেশি। সাধারণত রাজধানীর অলিগলিতে প্যাডেল রিকশার জায়গা নিয়েছে এই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। প্রধান সড়কে এগুলোর চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও রাত ১০টার পর রাজধানীর প্রধান সড়কে এসব পরিবহনের চলাচল চোখে পড়ে। এতে বেড়ে যায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি। এত দিন এসব অটোরিকশা চলেছে স্থানীয় রাজনীতিক ও প্রভাবশালীদের দখলে থেকে। দৈনিক হারে বেঁধে দেওয়া চাঁদায় চলাচল করছে। এর একটি অংশ যেত নগরীর থানাগুলোতে। বলা চলে চাঁদা দিয়ে থানা-পুলিশকে ম্যানেজ করেই চলছে এই অবৈধ যান। তাদের বেপরোয়া চলাচলে সড়কে সৃষ্টি হয়ে যানজট। কিন্তু দ্রুত চলাচল ও কম খরচে নিকট-দূরের চলাচলের জন্য এই অটোরিকশার জুরি নেই। এ কারণে নগরবাসীর কাছে অনেক পছন্দের বাহন হয়ে উঠেছে ব্যাটারি অটোরিকশা।
দুদিনে বিক্ষোভ থেকে বোঝা যায়, এই অটোরিকশা চলাচলে শুধু চালকরা না মালিকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, যদি এই যানটি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন তারাও যারা দৈনিক বা মাসিক ভিত্তিতে চাঁদা নিয়ে থাকেন। এই ক্ষতির পরিমাণ কম না, দৈনিক লাখ লাখ টাকা। ফলে এই অটোরিকশা চালু রাখার স্বার্থ শুধু চালকদের না, রাজনৈতিক নেতা বা স্থানীয় প্রভাবশালী ও থানা-পুলিশের। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালুর অনুমতি দিয়েছেন। এখন চাঁদাবাজি বন্ধ হবে তো?