‘দালালরা আমারে পথের ভিখারি বানাই দিল’

তখন বিকেল চারটা। কাকরাইলের জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর করিডরো বিষণ্ণ মনে বসে আছেন নুরুন নবী (৫০)। তার চোখে-মুখে অনিশ্চয়তার ছাপ। হঠাৎ তার পাশে এসে দাঁড়ালেন এক যুবক। নুরুন নবীর মতই ওই যুবকের শরীরে ক্লান্তির ছাপ। জানা গেল, সম্পর্কে তারা বাবা-ছেলে। ফেনী থেকে বিএমইটিতে এসেছেন দালালচক্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিতে। বিদেশ পাঠানোর নামে  দালালচক্র তাদের সাড়ে চার লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।  
 
ভুক্তভোগী নুরুন নবী দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত ৯মে ছেলের সৌদি আরবে যাওয়ার কথা। কিন্তু সৌদি তো দূরের কথা এখন অভিযোগ নিয়ে ঢাকায় ঘুরতে হচ্ছে। স্বপ্ন ছিল ছেলে বিদেশে গিয়ে ভালো কিছু করবে। তাই বাড়ির দলিল বন্দক ও ব্রাক ব্যাংক থেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছি। সেই টাকা ফেনীর স্থানীয় দালাল সাহাবুদ্দিনকে দেই। পরে সাহাবুদ্দিন আমাদের আরেক দালাল ফেনীর সাঈদ ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করান। সাঈদ মূলত সৌদি আরবেই থাকে। তার সঙ্গে জড়িত আছেন ফজলি কাজী।

এই তিনজন আমার কাছ থেকে প্রথমত তিন লাখ টাকা নেন। তারপর উত্তরবঙ্গ এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করান। মূলত উত্তরবঙ্গ এজেন্সি ভিসা, বিএমইটি কার্ড ও স্বাস্থ্য সনদ করে দেন। দালালের মাধ্যমে পরে ওই এজেন্সি ফের দেড় লাখ টাকা নেয়। বিনিময়ে সৌদি আরবে পাঠানোর আশ্বাস দেন। কিন্তু শেষে বিদেশের বদলে আমাদের পথে পথে ঘুরতে হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, প্রতি সপ্তাহে ৩০ হাজার টাকা কিস্তি দিতে হয়। এখন এই টাকা কীভাবে দিবো জানিনা। এখন ভিক্ষা করা ছাড়া কোন উপায় নেই। দালালরা আমারে পথের ভিখারি বানাই দিল।’ 

তার ছেলে রায়হান দেশ রূপান্তকে বলেন, গত ৯ মে আমার সৌদি আরব যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভিক্টোরিয়া ওভারসেস এজেন্সি তিন লাখ ৫০ হাজার টাকা নিলেও আমাকে সৌদি আরবে পাঠাতে পারেনি। তাই গত শনিবার রাত ২টায় বাবাসহ ঢাকায় রওনা হই। রবিবার সকালে বাবাকে নিয়ে যাই ঢাকার পল্টনের ভিক্টোরিয়া ওভারসেস এজেন্সিতে। সেখানে এজেন্সি মালিকের কাছে টাকা ফেরত চাই। কিন্তু এজেন্সি মালিক টাকা নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।

সেখানে দুপুর ২টা পর্যন্ত থাকার পরেও সমস্যা সমাধান হয়নি। পরে পল্টন থেকে হেঁটেই রওনা হই কাকরাইলের জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোতে। বিকেল তিনটার বিএমইটিতে পৌঁছান তারা। সেখানে গিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন। কীভাবে অভিযোগ লিখতে হয়, জমা দিতে হয় তার কিছুই জানেন না।

তিনি আরও বলেন, বিএমইটিতে অভিযোগ দিতে গিয়েও বিপাকে পড়তে হয়েছে। অভিযোগ লিখে জমা দিতে গিয়ে জানানো হয় অভিযোগ নিজ জেলায় জমা দিতে। কিন্তু আমরা চাই ঢাকা অফিসে জমা দিতে। কিন্তু কোনোমতেই তারা অভিযোগ নিচ্ছিলেন না। প্রায় দুই ঘণ্টা বসে থাকার পর তারা অভিযোগ নিতে রাজি হন। পরে বিকেল পাঁচটার দিকে আমরা অভিযোগ জমা দিয়েছি।’ 

তাদের মতই নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলার রাকিব হোসেন বিএমইটিতে এসেছেন অভিযোগ করতে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা দুই ভাই ছোট বোনের স্বর্ণ বন্দক রেখে টাকা নিয়েছি। তার বিয়ে হয়েছে মাস তিনেক হচ্ছে। এছাড়াও বাড়ির জমির দলিল বন্দক রেখেছি। সেই বন্দকের টাকা এখন কীভাবে দিবো। টাকা দিতে না পারলে আমাদের বাড়িঘর থাকবে না। এমনকি বোনের সংসার টিকবে কিনা তাও জানিনা।’

তিনি আরও বলেন, উত্তরবঙ্গ এজেন্সি আমাদের কাছ থেকে ৭ লাখ টাকা নিয়েছে। এই এজেন্সির কাছে কয়েকবার গেলেও সমস্যা সমাধান করতে পারেনি। উল্টো তারা আমাদের ভয়ভীতি দেখিয়েছে। আমরা আমাদের পাওনা টাকা ফেরত চাই, নয়তো বিদেশে যেতে চাই।’ তাদের মতো আরও ১৬ জন ভুক্তভোগী অভিযোগ নিয়ে বিএমইটিতে আসেন। তাদের গল্পটাও ঠিক এরকম। 


অভিযোগের বিষয়ে উত্তরবঙ্গ ওভারসিজ লিমিটেডের মালিক হাসিবুল ইসলাম বাবু দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমি টাকা আত্মসাৎ করিনি। আমার প্রতিষ্ঠানে মোট ১১ জন কাজ করে। তার মধ্যে সাহাবুদ্দিন নামে একজন এই কাজটি করেছে।  তার সঙ্গে কাজ করতো আবু সাইদ। ফজলু কাজীর সঙ্গে আবু সাঈদের পরিচয় হয়। সেই সূত্রে ফজলু আবু সাঈদকে লোকজন ম্যানেজ করতে বলেন। তাদের টাকা আবু সাঈদ আত্মসাৎ করেছে। 

তিনি আরও বলেন, আমি তাদের ১০ জানের কাছ থেকে ৬ লাখ ৮০ টাকা পেয়েছি। সাতজনের মেডিকেল করা বাবদ ২০ হাজার করে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা নিয়েছি। এছাড়া আর কোনো বাড়তি টাকা নেওয়া হয়নি। ফ্লাইটের দিন তারা আসছে সকালে। আমি তাদের বলেছিলাম টাকা দিলে ফ্লাইট হবে, না দিলে হবে না। যে টাকাগুলো মারছে তার নাম আবু সাঈদ।