দেশের সড়ক-মহাসড়কে যানবাহন চলাচলে সম্প্রতি সর্বোচ্চ গতিসীমা বেঁধে দিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। নতুন এই ‘মোটরযান গতিসীমা নির্দেশিকা, ২০২৪’ নিয়ে যানবাহনের চালক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। বিআরটিএ থেকে বলা হয়েছে, দুর্ঘটনা কমাতে যানবাহনভেদে গতি কমানো হয়েছে। তবে একই সড়কে ভিন্ন গতির যান চলায় দুর্ঘটনা কমার বদলে উল্টো বাড়ার শঙ্কার কথা জানিয়েছেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা।
নতুন গতিসীমা নির্দেশিকায় এক্সপ্রেসওয়ে এবং জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে থ্রি-হুইলার (তিন চাকার) যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই নির্দেশিকায় ১০ ধরনের যানবাহনের জন্য সড়কের ৬টি ক্যাটাগরিতে গতিসীমা নির্ধারণ করা হয়। সড়কভেদে ব্যক্তিগত গাড়ি ও বাসের সর্বোচ্চ গতি নির্ধারণ করা হয় ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার। আর মোটরসাইকেলের সর্বোচ্চ গতি হবে ৬০ কিলোমিটার। তবে শহরের রাস্তায় ৩০ কিলোমিটার গতিতে চলবে মোটরসাইকেল ও থ্রি-হুইলার।
নতুন এই গতিসীমার সমালোচনা করে মো. রজ্জব আলী নামে এক মোটরসাইকেল চালক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ব্যবসার কাজে আমাকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় যাওয়া-আসা করতে হয়। নগরীতে মোটরসাইকেলের যে ৩০ কিলোমিটার গতি নির্ধারণ করা হয়েছে তা অযৌক্তিক। কারণ আমাদের দেশের রাস্তায় ট্রাফিক ব্যবস্থা, যানবাহন ও পথচারী চলাচল এসব কোনোকিছুই ঢেলে সাজানো হয়নি। একই রাস্তায় রিকশা, ভ্যান, গাড়ি, অটোরিকশা, ট্রাক, প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল চলাচল করে। ফলে লেন নির্দিষ্ট না করে মোটরসাইকেলের গতি কমিয়ে সড়কে শৃঙ্খলা আনা সম্ভব হবে না।’
একই ধরনের মত দেন রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী নাজমুল ইসলাম হৃদয়। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার দুর্ঘটনা কমানোর জন্য নতুন নির্দেশিকা দিয়েছে। কিন্তু মহাসড়কে বড় গাড়িগুলো যদি ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার গতিতে চলাচল করে, আর সেখানে যদি মোটরসাইকেলের গতি ৬০ থাকে তাহলে বড় গাড়ির সঙ্গে আমার তাল মেলানো সম্ভব হবে না। সেক্ষেত্রে বড় গাড়ি ওভারটেক করতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। এভাবে মোটরসাইকেলের জন্য আলাদা লেন না করে গতি কমানোর সিদ্ধান্ত সঠিক হয়নি।’
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরীও মনে করেন যানবাহনভেদে লেন না করে গতিসীমা নির্ধারণ উল্টো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সড়কে নির্দিষ্ট যানের জন্য নির্দিষ্ট লেন করার প্রয়োজন ছিল। সেগুলো না করে আমলাদের চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত চালকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। গতিসীমার বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে সেটি টেকনিক্যাল (কারিগরি) কোনো সিদ্ধান্ত নয়। নতুন নির্দেশিকার বাস্তবায়ন হলে দুর্ঘটনা বাড়ার শঙ্কা রয়েছে।’
অবশ্য নতুন গতিসীমার বিষয়ে যাত্রী কল্যাণ সমিতির বিপরীত মত দিয়েছে দেশের সড়কের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা ৯টি সংগঠনের প্ল্যাটফর্ম ‘রোড সেফটি কোয়ালিশন বাংলাদেশ’। কয়েক দিন আগে জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কোয়ালিশনের নেতারা বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা ঠেকাতে মোটরযান গতিসীমা সংক্রান্ত নির্দেশিকা সড়কে অকাল মৃত্যু কমাবে। ওই সংবাদ সম্মেলনে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘মোটরযানের গতিসীমা নির্দেশিকা রোডক্র্যাশ ও প্রতিরোধযোগ্য অকাল মৃত্যু ঠেকাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একইসঙ্গে এই নির্দেশিকার যথাযথ বাস্তবায়ন ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ও সেকেন্ড ডিকেইড অব অ্যাকশন ফর রোড সেফটি অনুযায়ী সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতের সংখ্যা অর্ধেকে কমিয়ে আনতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে।’
তবে এই মোটরযান গতিসীমা নির্দেশিকা বিজ্ঞানসম্মত হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. হাদিউজ্জামান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটি (গতিসীমা নির্দেশিকা) যারা তৈরি করেছে তাদের প্রকৃতপক্ষে প্রকৌশলগত সুস্পষ্ট ধারণা নেই। যেখানে আমাদের দেশে লেনভিত্তিক গাড়ি চলে না, সেখানে যানবাহনের গতিসীমার সিদ্ধান্ত অনেকটা কাল্পনিক। এই গতিসীমা যদি এনফোর্সমেন্ট (প্রয়োগ) করা হয় তাহলে দুর্ঘটনা তো কমবেই না বরং দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বহুগুণে বেড়ে যাবে। এই গতিসীমার ফলে ধীরগতির যানের সঙ্গে ওভারটেকিং (পাশ কাটিয়ে আগে যাওয়া) বেড়ে যাবে। তখন মুখোমুখি দুর্ঘটনা বাড়বে।’
এই যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘আমাদের মহাসড়কে লেন নির্দিষ্ট করে যানবাহনের গতিসীমা নির্ধারণ করা যেতে পারে। সেই সঙ্গে মহাসড়কে দুর্ঘটনা কমানোর জন্য বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিকে কাজে লাগাতে হবে। তাহলে দুর্ঘটনা কমবে সড়কে।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিআরটিএর পরিচালক (রোড সেফটি) শেখ মোহাম্মদ মাহবুব-ই রাব্বানী বলেন, ‘সড়কে দুর্ঘটনা কমানোর জন্য গতি কমানো হয়েছে। গতি কম থাকলে দুর্ঘটনা কমবে। তাই নতুন এই নির্দেশিকা করা হয়েছে।’