প্রাকৃতিক পরিবেশে উদ্ভিদ, প্রাণী ও আণুবীক্ষণিক জীবসমূহের পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে যে বাস্তুতন্ত্র গড়ে ওঠে, সেই বাস্তুতন্ত্রে নানা ধরনের জীবজন্তুর সমাহার বা সমাবেশকে জীববৈচিত্র্য বলে। গত ২২ মে ছিল আন্তর্জাতিক প্রাণবৈচিত্র্য দিবস। জলবায়ু সংকটের এই দিনে সারা বিশ্বের প্রাণবৈচিত্র্য বিরূপ আচরণ করছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষ প্রাণ হারানোর পাশাপাশি বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। এমনকি পৃথিবীর অনেক প্রাণ, গাছপালা বিলুপ্তির পথে। মানুষই এই বিপর্যয় ডেকে আনছে পরিবেশ ও প্রাণপ্রকৃতির ক্ষতি করে। আসুন দেখে নিই ইসলাম এই বিষয়ে কী বলে।
পৃথিবীর তিন ভাগ পানি দ্বারা বেষ্টিত। পৃথিবীতে সমুদ্রের মোট আয়তন ৩৬১ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার। এটি পৃথিবীর জীবনচক্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ গ্রহে প্রতি বছর গাছপালার মাধ্যমে যে পরিমাণ বিশুদ্ধ অক্সিজেন বায়ুতে মিশে তার সত্তর শতাংশই আসে সামুদ্রিক উদ্ভিদ থেকে। সমুদ্রই মানুষের জন্য জলজ সম্পদের ভাণ্ডার। সমুদ্রের পানি বায়ুতে ভেসে আল্লাহর করুণার মেঘ হয়ে এসে বৃষ্টিরূপে পতিত হয়। পৃথিবীর প্রতিটি বালুকণা সিক্ত হয়ে নবজীবন লাভ করে। প্রকৃতির প্রতিটি গাছপালা ফুলে-ফলে ভরে ওঠে। সবুজ-শ্যামল হয়ে ওঠে ফসলের মাঠ। পানির অপর নাম জীবন।
পানির উৎস ভাণ্ডার সমুদ্র নানাভাবে দূষণের শিকার। এক জরিপে দেখা গেছে, প্রতি বছর প্রায় ২০ বিলিয়ন টন বর্জ্য ও বিভিন্ন প্রকার আবর্জনা সাগরে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। এসব বর্জ্য সমুদ্রে প্রতিনিয়ত নিক্ষেপের ফলে সামুদ্রিক পরিবেশ বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। এতে সামুদ্রিক বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ, প্রাণী ও মৎস্যকুলের অস্তিত্ব বিপর্যস্ত হতে চলেছে। পরিবেশ দূষণ, সামুদ্রিক দূষণ কোনোভাবেই কাম্য নয়।
সামুদ্রিক মাছে রয়েছে বহু উপকারিতা, আছে মান্ুেষর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা উপকরণ। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, মাছের মধ্যে থাকা উপাদানগুলো মানুষের হৃদযন্ত্র কার্যকর ও সুরক্ষিত রাখার জন্য কাজ করে। সারা বিশ্বে পরিচালিত ৩০টি বড় ধরনের গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, যারা প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার বা দুইবার মাছ খান তাদের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি গড়ে ৩৬ শতাংশ কমে যায়। আল্লাহতায়ালা বলেন, আর তিনিই সে সত্তা, যিনি সমুদ্রকে নিয়োজিত করেছেন, যাতে তোমরা তা থেকে তাজা (মাছের) গোশত খেতে পারো এবং তা থেকে বের করতে পারো অলংকারাদি, যা তোমরা পরিধান করো। আর তুমি তাতে নৌযান দেখবে, তা পানি চিরে চলছে এবং যাতে তোমরা তার অনুগ্রহ অন্বেষণ করতে পারো এবং যাতে তোমরা শুকরিয়া আদায় করো।’ (সুরা নাহল ১৪)
জীবজন্তু মানুষের অবলা প্রতিবেশী। তাদের মুখে ভাষা নেই বলে তারা তাদের দুঃখ-কষ্টের কথা মানুষকে বলতে পারে না। তবে মানুষের জ্ঞান ও বিবেক দিয়ে তাদের কষ্টের কথা অনুধাবন করতে হবে। সহিহ বুখারির এক বর্ণনায় এসেছে, ‘একবার এক পথিক খুব পিপাসার্ত হয়ে একটি কূপের কাছে পৌঁছে নিচে নেমে পানি পান করেন। এরপর উঠে দেখেন, একটি কুকুর তৃষ্ণায় হাঁপাচ্ছে। কুকুরটির তৃষ্ণাজ্বালা অনুভব করে লোকটি পুনরায় কূপের ভেতরে নেমে জুতায় করে সামান্য পানি এনে তাকে পান করান। আল্লাহ তার এ কাজটি কবুল করে নেন এবং তাকে ক্ষমা করে দেন। এ কথা শুনে সাহাবিরা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! পশুদের প্রতি দয়া করলেও কি আমাদের পুরস্কার রয়েছে? রাসুল (সা.) বললেন, হ্যাঁ, প্রত্যেক প্রাণীর উপকার করলেই সওয়াব রয়েছে।’ সহিহ বুখারি ও মুসলিমের অপর এক বর্ণনায় এসেছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, এক মহিলা একটি বিড়ালের কারণে জাহান্নামি হয়েছে। বিড়ালটিকে সে আটকে রেখেছিল। কোনো খাবার না দেওয়ার কারণে বিড়ালটি মারা যায়।’
গৃহপালিত চতুষ্পদ প্রাণীকে আল্লাহ আমাদের উপকারের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তাদের থেকে সেবা নেওয়ার আগে ঠিকমতো খাদ্য ও পানীয় দিতে হবে। আমাদের প্রিয়নবী (সা.) অবলা প্রাণীর কষ্ট সহ্য করতে পারতেন না। একদিন তিনি নিরিবিলি পথ দিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। হঠাৎ একটি উটের দিকে তার নজর পড়ে যায়। উটটির পিঠে ভারী বোঝা চাপানো ছিল বলে সহজে পথ চলতে পারছিল না। চালক উটটির গতি বাড়ানোর জন্য বারবার চাবুক মারছিল আর উটটি অসহ্য যন্ত্রণায় কেবল ঘাড় নাড়ছিল। দৃশ্যটি দেখে রাসুল (সা.) দারুণভাবে ব্যথিত হন। চালককে তিনি উটটির প্রতি সদয় হতে বলেন। রাসুল (সা.) এভাবেই মানুষকে জীবজন্তুর অধিকার সম্পর্কে সচেতন করেছেন। পবিত্র কোরআনে বিক্ষিপ্তভাবে প্রায় ২০০টি আয়াতে প্রাণিজগতের প্রসঙ্গ এসেছে। এমনকি পৃথকভাবে বিভিন্ন প্রাণীর নামে ছয়টি সুরার নামকরণ করা হয়েছে। এসব নামকরণ থেকে প্রাণিজগতের প্রতি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি সুস্পষ্ট ফুটে ওঠে। ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি হলো, পশুপাখির প্রতি নম্রতা প্রদর্শন ইবাদতের পর্যায়ভুক্ত। পশুপাখিকে কষ্ট দেওয়া গুনাহের কাজ।
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘একবার এক পিপাসার্ত কুকুর কূপের পাশে ঘোরাঘুরি করছিল। পিপাসায় তার প্রাণ বের হওয়ার উপক্রম হয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ বনি ইসরাইলের এক ব্যভিচারী নারী তা দেখতে পায়। সে নিজের পায়ের মোজা খুলে কুকুরটিকে পানি পান করায়। এ কারণে তার অতীত পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।’ (সহিহ বুখারি)। পশুপাখির সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা যাবে না। আল্লাহর জমিনে তাদের অবাধ বিচরণের সুযোগ দেওয়া কাম্য। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি অহেতুক কোনো চড়–ই পাখি হত্যা করে, কিয়ামতের দিন পাখিটি আল্লাহর কাছে এই বলে নালিশ করবে যে, হে আল্লাহ, অমুক ব্যক্তি আমাকে অহেতুক হত্যা করেছে।’ (নাসায়ি)
যে প্রাণী প্রতিপালন করা হয় সেগুলোর সুস্থতা ও খাদ্যের ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা ওয়াজিব। আল্লাহ পৃথিবীতে অনেক জন্তু-জানোয়ার সৃষ্টি করেছেন। জীববৈচিত্র্য আল্লাহর অন্যতম নিদর্শন। পাহাড় ও বনাঞ্চলের হাতি, বাঘ, সিংহ, বানর প্রভৃতি হিংস্র-অহিংস্র সব প্রাণীই বিশেষ সৌন্দর্য বর্ধন করে। পরিবেশকে বাঁচানো এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সবার এগিয়ে আসা উচিত।
লেখক : চিকিৎসক ও ইসলামবিষয়ক লেখক
drmazed689@gmail.com