সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীর আহমেদ ও তার স্ত্রী-সন্তানের আরও ১১৯টি স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। একইসঙ্গে বিভিন্ন কোম্পানিতে তাদের নামে থাকা শেয়ার অবরুদ্ধ করারও আদেশ দিয়েছেন আদালত।
আজ রবিবার (২৬ মে) ঢাকা মহানগর আদালতের সিনিয়র স্পেশাল জজ মোহাম্মদ আসসামছ জগলুল হোসেন এই আদেশ দেন। দেশ রূপান্তরকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর মাহমুদ হোসেন জাহাঙ্গীর।
তিনি বলেন, গত বৃহস্পতিবার সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের ৮৩টি দলিলের সম্পদ ক্রোকের আদেশ দিয়েছিলেন আদালত। পরে তার আরও সম্পদের খোঁজ পাওয়া যায়। সেই সব সম্পদ ক্রোকের আদেশ চেয়ে দুদক আজ রবিবার আদালতে আবেদন করে। শুনানি নিয়ে আদালত বেনজীর আহমেদের সম্পদ ক্রোকের আদেশ দিয়েছেন।
গত বৃহস্পতিবার বেনজীর আহমেদ, তার স্ত্রী ও সন্তানদের নামে থাকা ৩৪৫ বিঘা (১১৪ একর) জমি জব্দ (ক্রোক) এবং বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকে তাদের নামে থাকা ৩৩টি ব্যাংক হিসাব (অ্যাকাউন্ট) অবরুদ্ধ (ফ্রিজ) করার আদেশ দেওয়া হয়।
দুদক আইনজীবী খুরশিদ আলম খান আজ জানিয়েছিলেন, বেনজীর আহমেদের সম্পত্তি ক্রোক এবং ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ (অবরুদ্ধ) করার বিষয়ে আদালত যে আদেশ দিয়েছিলে, তা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে।
তিনি আরও বলেন, গত বৃহস্পতিবার ঢাকা মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ মোহাম্মদ আসসামছ জগলুল হোসেন সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, তার স্ত্রী, মেয়ে ও কয়েকজন স্বজনের সম্পত্তি ক্রোক এবং ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার আদেশ দেন। সেই আদেশ দেয়ার পর থেকেই বেনজীর আহমেদের ২৭টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টসহ আর্থিক লেনদেনকারী মোট ৩৩টি অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছে। এর ফলে তিনি ব্যাংক থেকে আর কোনো লেনদেন করতে পারবেন না। সেই সঙ্গে তার সব ক্রোককৃত সম্পত্তি জব্দ হিসেবেই থাকবে।
মাদারীপুরে আরও ২৭২ বিঘা সম্পদ ক্রোক
দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তা উপপরিচালক মো. হাফিজুল ইসলাম আদালতের কাছে লিখিতভাবে বেনজীর আহমেদ, তার স্ত্রী ও তিন মেয়ের নামে থাকা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের হিসাব তুলে ধরেন। তাতে দেখা যায়, মাদারীপুরে বেনজীর আহমেদের স্ত্রী জীশান মীর্জার নামে ২৭২ বিঘা জমি রয়েছে। সেসব জমি জব্দ (ক্রোক) করার আদেশ দিয়েছেন আদালত। আদালতে জমা দেওয়া দুদকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাদারীপুরের সাতপাড় ডুমুরিয়া মৌজায় বেনজীর আহমেদের স্ত্রী জীশান মীর্জার নামে ১১৩টি দলিলে মোট ৯ হাজার ৩ (অন্তত ২৭২ বিঘা) শতক জমি কেনা হয়েছে। ২০২১ সালের ২৪ জানুয়ারি থেকে ২০২২ সালের ১৬ আগস্টের মধ্যে এসব জমি কেনা হয়েছে। এ ছাড়া মাদারীপুরের শিবচর উপজেলায় আরও পাঁচ কাঠা জমি কেনা হয়েছে বেনজীর আহমেদের পরিবারের সদস্যদের নামে।
বেনজীর আহমেদ, তাঁর স্ত্রী ও তিন মেয়ের কোন কোন কোম্পানিতে অংশীদারত্ব রয়েছে, সেই তালিকাও আদালতের কাছে তুলে ধরেছে দুদক। দুদক আদালতকে জানিয়েছে, সোনালী ব্যাংকে ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র রয়েছে এই পরিবারের। শান্তা সিকিউরিটিজ লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠানে বেনজীর আহমেদের স্ত্রী জীশান মির্জা ও মেজ মেয়ে তাহসীন রাইসা বিনতে বেনজীরের অংশীদারত্ব রয়েছে। লংকা সিকিউরিটিজ লিমিটেডেও বেনজীর আহমেদের অংশীদারত্ব রয়েছে। যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরে নিবন্ধিত সাভান্না ন্যাচারাল পার্ক প্রাইভেট লিমিটেড, সাভান্না অ্যাগ্রো লিমিটেড, সাভান্না ইকো রিসোর্ট এবং একটি শিশির বিন্দু লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠানগুলোর শতভাগ মালিকানা এই পরিবারের সদস্যদের। এসব কোম্পানির শেয়ার অবরুদ্ধের আদেশ দিয়েছেন আদালত।
এ ছাড়া নর্থ চিকস রংপুর লিমিটেড, নর্দান বিজনেস অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড, সেন্ট পিটারস স্কুল অব লন্ডন লিমিটেড, স্টিলথ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, বাংলা টি ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, ডেল্টা আর্টিসান্স লিমিটেড, ইস্ট ভ্যালি ডেইরি লিমিটেড, গ্রিন মাল্টিমিডিয়া লিমিটেডসহ ১৫টি প্রতিষ্ঠানে বেনজীর আহমেদ, তাঁর স্ত্রী ও তিন মেয়ের আংশিক অংশীদারত্ব রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে বেনজীরের পরিবারের শেয়ারগুলো অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
বৃহস্পতিবার যেসব জমি জব্দ করার আদেশ দেন আদালত, সেগুলো ছিল ৮৩টি দলিলের অধীনে। নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, ওই ৮৩টি দলিলে মোট জমি রয়েছে প্রায় ১১৪ একর (৩৩ শতাংশে ১ বিঘা ধরে ৩৪৫ বিঘা)। এর মধ্যে বেনজীরের স্ত্রী জীশান মীর্জার নামে অন্তত ৮১ একর বা ২৪৫ বিঘা জমি রয়েছে। বেনজীরের নিজের নামে জমি কম, ৭ দশমিক ৬০ একর (২৩ বিঘা)। বাকি প্রায় ২৬ একর (প্রায় ৭৯ বিঘা) জমি রয়েছে তাঁর তিন মেয়ে ও কয়েকজন স্বজনের নামে।
সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিপুল সম্পদের কথা তুলে ধরা হয়। এতে দাবি করা হয় বেনজীর ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে রাজধানীর অভিজাত এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট, পাঁচ তারকা হোটেলের শেয়ার, গাজীপুর, কক্সবাজার, গোপালগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে শত শত বিঘা জমির মালিকানা রয়েছে।
এ খবর প্রকাশিত হওয়ার পর সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীরের বিপুল অবৈধ সম্পদের অভিযোগ অনুসন্ধান করতে দুদকের কাছে আবেদন করেন সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন। এর পরপরই বেনজীর আহমেদের বিপুল অবৈধ সম্পত্তির অভিযোগের অনুসন্ধান চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন আইনজীবী সালাউদ্দিন রিগ্যান।
এই দুই ঘটনার পর গত ১৮ এপ্রিল দুদকের সভায় সাবেক এই পুলিশ প্রধানের অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আর এরজন্য একটি তিন সদস্যের তদন্ত কমিটিও গঠন করে দুদক।
কমিটির সদস্যরা হলেন, দুদক উপপরিচালক হাফিজুল ইসলাম, সহকারী পরিচালক নিয়ামুল হাসান গাজী ও জয়নাল আবেদীন। এরই মধ্যে বেনজীর ও তার পরিবারের জাতীয় পরিচয়পত্র, আয়কর নথি ও কোম্পানীর কাগজপত্র সংগ্রহ করেছে দুদক।
তবে নিজের ও পরিবারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে সাবেক আইজিপি বেনজীর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক ভিডিওবার্তায় দাবি করেন, পরিবার ও তার বিরুদ্ধে মানহানিকর সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে। তিলকে তাল বানিয়ে মিথ্যা সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে।