খুলনায় ১২ গ্রাম প্লাবিত, ৭৬ হাজার ঘর ক্ষতিগ্রস্ত

ঘূর্ণিঝড় রেমালের আঘাত ও ভারী বৃষ্টিপাতে খুলনায় জনজীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। উপকূলীয় তিন উপজেলায় অন্তত ছয়টি স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙে গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া অর্ধশত পয়েন্ট দিয়ে বাঁধ উপচে পানি লোকালয়ে প্রবেশ করেছে। প্লাবিত হয়েছে অন্তত ১০ থেকে ১২টি গ্রাম। পানিতে ভেসে গেছে ফসলের মাঠ ও মৎস্য ঘের। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কাঁচা-আধাপাকা বাড়িঘর। উপড়ে পড়েছে শত শত গাছপালা। গাছ পড়ে বটিয়াঘাটা একজনের মৃত্যুও হয়েছে।

অন্যদিকে ভারী বৃষ্টিতে মহানগরী খুলনার অধিকাংশ সড়ক ও নিম্নাঞ্চল পানিতে ডুবে যায়। অনেক বাড়ির নিচতলা ও দোকানঘরও পানিতে নিমজ্জিত হয়। ঘূর্ণিঝড়ের কারণে জেলা সদরসহ উপকূলীয়  এলাকায় বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

খুলনা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আব্দুল করিম জানান, খুলনার নয় উপজেলায় প্রায় ৪ লাখ ৫২ হাজার ২০০ জন মানুষের নানাভাবে ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কমবেশি ৭৬ হাজার ৯০৪ টি বাড়িঘর। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মধ্যে সাহায্য সহযোগিতা পৌঁছানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শুকনো খাবারের সাথে সাথে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটসহ আনুষঙ্গিক সুবিধা প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, বটিয়াঘাটা উপজেলার গাওঘরা ইউনিয়নে রবিবার রাতে গাছ পড়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। মৃত ওই ব্যক্তির নাম লাল চাঁদ মোড়ল (৩৬)। ঝড়ের রাতে সে ঘরে একা শুয়ে ছিল। রাত দেড়টার দিকে গাছ পড়ে তার মৃত্যু হয়।

পুলিশ সূত্র জানায়, লালচাঁদ  ভাত খেয়ে বাড়ির একটি ঘরে ঘুমাতে যায়। গভীর রাতে ঘূর্ণিঝড় রিমালের দমকা বাতাসে জামগাছ ভেঙে তার ঘরের ওপর পড়ে। এতে  ঘরের টিনের চাল ভেঙে সে চাপা পড়ে। আজ সোমবার সকালে প্রতিবেশীরা ঘরের চাল কেটে তার লাশ উদ্ধার করে।

এদিকে রবিবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে দাকোপ উপজেলার শিবসা ও ঢাকী নদীর বাঁধ ভেঙে তিলডাঙ্গা ইউনিয়নের কামিনীবাসিয়া গ্রামের ৪ ও ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কিছু এলাকা তলিয়ে যায়। তিলডাঙ্গা ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ক্ষিতীশ গোলদার  বলেন, পাঁচটি পয়েন্ট ভেঙে জোয়ারের লোনা পানি ঢুকেছে।

কয়রা উপজেলায় জোয়ারের তীব্র চাপে মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের সিংহের কোণা, মহারাজপুর ইউনিয়নের দশহালিয়া ও দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বেলাল গাজীর বাড়ির সামনের বাঁধ ভেঙে গেছে।

স্থানীয়রা জানান, বাঁধের দুর্বল অংশে ৩টি স্থানে প্রায় ১৫০ মিটার ভেঙে নদীর নোনা পানিতে প্লাবিত হয়েছে গ্রাম।

এ ছাড়া বাঁধের নিচু কয়েকটি জায়গা ছাপিয়ে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করেছে। জায়গা গুলো এলাকার মানুষ রাতভর মেরামত কাজ চালিয়েও শেষ রক্ষা করতে পারেনি।

মহারাজপুরের ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ জানান, রবিবার রাতের জোয়ারের চাপে ইউনিয়নের দশহালিয়া এলাকায় প্রায় ৫০ মিটার বাঁধ ভেঙে কপোতাক্ষ নদের পানি ঢুকে পড়েছে। এতে অন্তত দুটি গ্রাম ও  চিংড়ির ঘের তলিয়ে গেছে।

পাইকগাছার বাসিন্দা মো. এনামুল হক বলেন, পাইকগাছার দেলুটি গ্রামে বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করেছে। স্থানীয়রা চেষ্টা করেছিলো পানি আটকানোর কিন্তু শেষ রক্ষায় হয়নি।

খুলনা-৬ আসনের সংসদ সদস্য রশীদুজ্জামান মোড়ল বলেন, ঘূর্ণিঝড় রেমালে পাইকগাছা ও কয়রা উপজেলার বেশ কয়েকটি জায়গার বাঁধভেঙ্গে গিয়ে গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বহু গাছপালা ভেঙে গেছে।                                      

পানি উন্নয়ন বোর্ড খুলনা-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল আলম বলেন, খুলনার তিন উপজেলার ছয়টি পয়েন্ট ভেঙে পানি ঢুকেছে লোকালয়ে। ভেঙে যাওয়া স্থানগুলো হচ্ছে দাকোপের খলিশা, বটবুনিয়া ও কামিনীবাসিয়া, কয়রা উপজলোর দশহালিয়া এবং পাইকগাছা উপজেলার দেলুটি।

তিনি বলেন, নদীতে পানির অস্বাভাবিক উচ্চতা বাড়ে। ফলে বেড়িবাঁধ উপচে অর্ধশত পয়েন্ট দিয়ে পানি ঢুকেছে। বৃষ্টির যে মাত্রা তাতে পানির চাপ বেড়িবাঁধ কতটুকু সামাল দিতে পারবে তাই নিয়ে শঙ্কায় রয়েছি।