প্রকাশনাশিল্পে মুরগার উৎপত্তি ও বিকাশ

বাংলাদেশের প্রকাশনাশিল্পে দুই প্রজাতির মুরগা আছে। প্রথম প্রজাতি হলো বিষয়, ব্যক্তি বা পদবি-মুরগা; এবং দ্বিতীয় প্রজাতি হলো লেখক-মুরগা। দ্বিতীয় প্রজাতির মুরগা নিয়ে আমরা বেশ আলোচনা-সমালোচনা শুনতে পাই, কিন্তু প্রথম প্রজাতি নিয়ে বলতে গেলে তেমন কিছুই শোনা যায় না। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পে মুরগার আবির্ভাব এর দ্বিতীয় প্রজাতি দিয়ে নয়, প্রথম প্রজাতি দিয়ে। এবং এই প্রথম প্রজাতির আবির্ভাব এবং ধারাবাহিক বিকাশই দ্বিতীয় প্রজাতির মুরগার আগমনকে ক্রমে সম্ভব করেছে। এ বিষয়ে আলোচনায় যাওয়ার আগে আমাদের ধরে নিতে হবে যে, মুরগা বিষয়টা এই শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টজনরা মোটামুটিভাবে জানেন। যেটা জানা যায়, নোয়াখালী বা ওই অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষায় মুরগিকে মুরগা বলা হয়। আর প্রকাশনা শিল্পে বিনিয়োগে নোয়াখালী অঞ্চলের মানুষ ঐতিহাসিকভাবেই এগিয়ে। যা হোক, পুষ্টিকর ও সুস্বাদু খাবার হিসেবে তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটাতে গ্রাম-দেশে যেমন মুরগা ধরা হয়, তেমনি প্রকাশনা শিল্পেও তাৎক্ষণিকতার বিবেচনায় মুরগা ধরা হয়। দুর্ভাগ্যজনক হলো, আমাদের অনেক কুসংস্কৃতির মতো এই সংস্কৃতিটিও চালু হয় যখন আমরা স্বৈরাচারের যুগ পার করে গণতন্ত্রের যুগে প্রবেশ করেছি, অর্থাৎ ১৯৯০ সালের পর।  এখানে একটা বিষয় স্পষ্ট করা দরকার যে, কেউ টাকা দিয়ে বই প্রকাশ করছেন মানেই তিনি মুরগা-লেখক নন। পৃথিবীর বহু বিখ্যাত জার্নালে টাকা দিয়ে প্রবন্ধ ছাপতে হয়, অনেক বিখ্যাত ইউনিভার্সিটি প্রেস বা একাডেমিক প্রেসেও অনেক সময় টাকা দিয়ে বই প্রকাশ করতে হয়। আর মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পে প্রথম প্রজাতির মুরগা টাকা-না-দেওয়া মুরগা এবং দ্বিতীয় প্রজাতির মুরগা টাকা- দেওয়া মুরগা। কিন্তু প্রকাশনা শিল্পে আর্থিক মূল্য সংযোজনের ক্ষেত্রে প্রথম প্রজাতির মুরগার তুলনায় দ্বিতীয় প্রজাতির মুরগা কিছু নয়।

বাংলাদেশের প্রকাশনা-শিল্পে কীভাবে এই মুরগা-সংস্কৃতি চালু হলো? সাধারণ পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, বাংলাদেশে গত শতাব্দীর আশির দশক পর্যন্ত প্রকাশনা শিল্প, বলতে গেলে, সম্পূর্ণ ছিল পাঠকনির্ভর। বই প্রকাশ করা হতো পাঠক কিনবে বলে ও পড়বে বলে। পাঠকের বাইরে আর কে কিনবে সে বিষয়টা প্রকাশকদের কাছে তখনো পর্যন্ত ততটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। সে জন্য প্রকাশকদের তখন সারা দেশের বইয়ের দোকানগুলোর সঙ্গে অনেকখানি যোগাযোগ ও সম্পর্ক রাখতে হতো। পাশাপাশি রাষ্ট্রের বিভিন্ন পদ ও প্রতিষ্ঠানে পদায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে জ্ঞানগত যোগ্যতার বিচার করার চেষ্টা একটু হলেও করা হতো এবং একই সঙ্গে শিক্ষা ক্ষেত্রে ন্যূনতম মানরক্ষার ভাবনা তখনো পর্যন্ত ভাবতে হতো বা এখনকার মতো এতখানি নৈরাজ্য চালাতে রাষ্ট্র তখন সক্ষম ছিল না। তখন রাষ্ট্রীয় এবং নন-রাষ্ট্রীয় বা এনজিও-গতভাবে কেনাকাটার তেমন কোনো বড় চলও শুরু হয়নি। যেটুকু ছিল সেখানে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও, বইয়ের মানই ছিল কেনাকাটায় প্রধান বিবেচ্য। তাই যারা ভালো মানের বই করত, তাদের বই-ই প্রধানত সরকারের লাইব্রেরি বা মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা-সংস্কৃতিসংক্রান্ত কেনাকাটায় গ্রহণ করা হতো। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা এনজিও মহলও কমবেশি এমনটাই অনুসরণের চেষ্টা করত। অর্থাৎ মান না থাকলে অনেক বই প্রকাশ করেও সেগুলো কেনাকাটার তালিকায় ঢুকিয়ে দেওয়ার সুযোগ ও সংস্কৃতি তখনো তেমনটা ছিল না। তাই তখন সারা বছর বইপুস্তক প্রকাশও কম হতো।  কিন্তু নব্বইয়ের পরে অর্থনীতির উদারীকরণ ও যেনতেন শিক্ষা-বিস্তারের পাল-তোলা যুগে এসে এর বড় ধরনের পরিবর্তন শুরু হলো। কথা উঠল, কেনাকাটার তালিকায় কয়েকটি প্রকাশনীর বই যদি এত বেশি করে অন্তর্ভুক্ত হয়, তবে অপর প্রকাশকরা টিকবে কীভাবে, ব্যবসা করবে কীভাবে, নতুন লেখক তৈরি হবে কীভাবে? সুতরাং প্রস্তাব উঠল একটা সিলিং করে দেওয়া হোক যে, কোনো প্রকাশনীর সর্বোচ্চ অত-সংখ্যক বই কেনাকাটার তালিকায় থাকতে পারবে। তখন কিছু প্রকাশক এটা নিয়ে দ্বিমত করেছিলেন যে, সবার সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে গিয়ে পাঠককে ভালো বই থেকে বঞ্চিত করা উচিত নয়। কিন্তু গণতান্ত্রিকতার জোয়ার এবং ভরে বাকিরা এগিয়ে থাকায় একপর্যায়ে সেটাই সিদ্ধান্ত হিসেবে গ্রহণ করা হয় এবং রাষ্ট্রও এমনটাই চাইছিল হয়তো।

সেই ‘গণতান্ত্রিক’ সিদ্ধান্তটিই ছিল প্রকাশনা শিল্পে মুরগার আবির্ভাবের অন্যতম প্রধান কারণ। কারণ, উদারীকরণের হাওয়ায় প্রকাশনা খাতে যেসব নবীন প্রকাশক প্রতিনিয়ত যোগ হচ্ছিলেন তাদের সঙ্গে হুট করে ভালো লেখকদের সম্পর্ক হওয়া যেমন সম্ভব ছিল না, তেমনি নতুন লেখকের ভালো পা-ুলিপি পাওয়া বা তা বোঝার সক্ষমতার জায়গাতেও তারা তুলনামূলকভাবে পিছিয়েই থাকছিলেন। উপরন্তু তখন থেকেই বইয়ের কেনাকাটায় নবীন প্রকাশকের ভালো বই বা নবীন লেখকের ভালো বই, এমনকি প্রবীণ প্রকাশকের ভালো বইও উপেক্ষিত হতে শুরু করে। এই সংকটটা কাটিয়ে প্রকাশনা শিল্পের ‘গণতান্ত্রিক বিকাশ’ নিশ্চিত করতেই প্রথম প্রজাতির মুরগার আবির্ভাব ঘটে। অপেক্ষাকৃত নবীন প্রকাশক বা পুরনো প্রকাশক হলেও যারা ভালো বই করায় পিছিয়ে ছিলেন, তারা তখন ক্ষমতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পদপদবি এবং প্রভাবশালী রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক ব্যক্তি বা ঘটনাকে, এমনকি ধর্ম ও ক্ল্যাসিক বিষয় বা সাহিত্যকে যেনতেনভাবে আশ্রয় করতে শুরু করেন। তারা আরও যেটা করতে থাকেন তা হলো, কেনাকাটায় সর্বোচ্চ সিলিংয়ের সর্বোচ্চ সুবিধা নিতে বিনিয়োগকে একটি প্রতিষ্ঠানে না রেখে সেটা ভেঙে ভিন্ন নামের অনেক প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাতে থাকেন, যাতে করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে তারই প্রকাশিত বই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। স্বাভাবিকভাবেই বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ ধরনের প্রকাশকরা তখন তাদের পদবিভারী লেখকদেরও ব্যবহার করতে থাকেন এবং লেখকরাও সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে নিজের গরজ হিসেবে বুঝতে থাকেন। এভাবে দু-পক্ষের জন্যই বেশ একটা লাভালাভ পরিস্থিতি তৈরি হয়। ফলে এই ধারা রাষ্ট্রের নানা দপ্তর, প্রতিষ্ঠান ও এনজিওগুলোতে সংক্রমিত হতে থাকে এবং তারা প্রকাশকদের এক ধরনের আগাম নিশ্চয়তা দিতে থাকেন যে, তার বইটা কেনাকাটায় যাবে, বা যাওয়ার মতো বিষয়েই তিনি লিখবেন বা যাওয়ানোর পথ-পদ্ধতি তিনি তাদের দেখিয়ে দিতে পারবেন। একই সঙ্গে ক্ষমতাবান রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক ব্যক্তি বা ঘটনা বা বিষয়-সম্পৃক্ত বইগুলোও রাজনৈতিক প্রভাব বলয় নির্মাণের জন্য কেনাকাটায় অধিক তালিকাভুক্তির রেওয়াজ বাড়তে থাকে। এভাবেই দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় প্রথম প্রজাতির মুরগা বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের বিকাশে অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। বর্তমানে খেয়াল করলেই দেখা যাবে, এসব মুরগার এতটাই পুষ্টিগুণ যে, এবং সেগুলো এতটাই সুস্বাদু যে, যে যেভাবে পারছেন এবং যতভাবে পারছেন জবাই করছেন। আরও যেটা উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, সে সময় থেকেই একুশের বইমেলায় স্টল পাওয়া বা স্টলের অবস্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রেও প্রথম প্রজাতির মুরগার আধিপত্য বিস্তার ও নানামুখী নৈরাজ্য শুরু হয়।

প্রথম প্রজাতির মুরগার ধারাবাহিক বিকাশের এমন অভূতপূর্ব উল্লম্ফনের মধ্য দিয়েই ক্রমে দ্বিতীয় প্রজাতির মুরগার আবির্ভাব ঘটতে থাকে। অফসেট মুদ্রণব্যবস্থা এবং কম্পিউটার প্রযুক্তির সুবিধায় বইয়ের মানের তুলনায় সংখ্যা বাড়িয়ে অভিন্ন মালিকের ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশনা-প্রতিষ্ঠানের নামে নানা পর্যায়ের কেনাকাটায় সেগুলো ঢুকিয়ে দেওয়ার সুযোগ নিতে সবাই ঝুঁকি গ্রহণে এগিয়ে আসতে থাকেন। লেখকরা হিসাব-চুক্তি বিহীন টাকা প্রদান এবং বিক্রয়ের অঙ্গীকারে আবদ্ধ হতে থাকেন, এবং অপেক্ষাকৃত নবীন কিংবা নামসর্বস্ব প্রকাশকরা এটা গ্রহণ করতে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে থাকেন। তার উঠতি ব্যবসায়ে একটু পুঁজির যোগান ও ঝুঁকি ন্যূনায়ন বা মিনিমাইজেশনের তাৎক্ষণিক সুবিধা হাজিরের মাধ্যমে লেখকরা কখন তাদের কাছে মুরগা হয়ে ওঠেন! এভাবেই বিগত দুই দশকে প্রকাশনা শিল্পে দ্বিতীয় প্রজাতির মুরগারও ব্যাপক বিস্তার ঘটে। সেখানে প্রকাশক কী ছাপছেন, কত কপি ছাপছেন, কত কপি বিক্রি করছেন, কত কপি লেখকের ঘাড়ে দিচ্ছেন, কিংবা আদৌ কিছু করছেন কি না সবকিছুই অন্ধকার!

দুজন লেখক-মুরগা ও তাদের প্রকাশকের কথা এ সূত্রে উল্লেখ করা যেতে পারে। একজন ২০১০ সালে পা-ুলিপি সম্পাদনার প্রথম কর্মশালায় এসেছিলেন। তাকে মনে হয়েছিল তেমন কিছুই বুঝতে পারছেন না। কিন্তু কর্মশালার পরও তিনি যোগাযোগ রাখতেন। একদিন বললাম, কর্মশালা করে আপনার বোধহয় কোনো লাভ হয়নি। তিনি বললেন, আমার কিন্তু অনেকগুলো বই আছে! শুনে চমকে গিয়ে বললাম, কখনো বলেননি তো! কোথায় পাওয়া যায় ওগুলো? বললেন, কোথাও পাওয়া যায় না, প্রকাশকও চিনবেন না, আর ওটা আপনাকে দিতে পারব না। তারপর বললেন, এবারের বইমেলায়ও আমি একটা বই বের করার টাকাপয়সা জোগাড় করেছিলাম। কিন্তু আপনার কর্মশালাটা করার পর সিদ্ধান্ত নিয়েছি ওটা আর করব না। দ্বিতীয়জন একদিন তার কয়েকটা প্রকাশিত বই নিয়ে এলেন। বললেন, তিনিই প্রকাশককে সব খরচ দিয়েছেন, আবার তিনিই এগুলো কিনে কিনে মানুষকে দেন, কেউ পড়ে কিনা তাও বুঝতে পারেন না, প্রকাশক বলেন কিছুই বিক্রি হয় না। তাকে পরবর্তী সময় মুরগা হওয়া থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়েছিল এবং তিনি এখন বেশ পরিচিত লেখক।

প্রকাশনাশিল্পে এই যে নিরীহ দ্বিতীয় প্রজাতির মুরগা, শিল্পে সামষ্টিকভাবে তাদের আর্থিক অংশগ্রহণ প্রথম প্রজাতির তুলনায় খুব নগণ্য হলেও তারা সংখ্যার হিসাবে অনেক বড় এবং তারা ডাকাডাকিও করেন বেশি। সে কারণে তাদেরই আমরা বেশি করে দেখি এবং তাদের নিয়েই বেশি কথা বলি। বর্তমান সময়ের উদাহরণ দিলে প্রকাশনা শিল্পে মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনা যত বড় মুরগা এবং এ-সংশ্লিষ্ট মুরগায় প্রকাশকদের আর্থিক বিনিয়োগ ও বার্ষিক আয়ের পরিমাণ যত বৃহৎ, তার তুলনায় বইমেলায় লেখক হতে ইচ্ছুক দেশের বা বিদেশের কিছু বাঙালির প্রকাশকের দপ্তরে স্বেচ্ছা-মুরগা হওয়ার যে আর্থিক মূল্যমান, তা কিছুই নয়।

কারণ এখানে সারা মাস ধরে সারা দেশের সব পত্রপত্রিকা, টেলিভিশন ও অনলাইনে ঢোল পিটিয়ে এবং পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করেও হাজারখানেক প্রকাশক মিলিয়ে প্রতি বছর অমর একুশে বইমেলায় পঞ্চাশ কোটি টাকার বইও বিক্রি হয় না, অর্থাৎ গড় হিসাব করলে প্রকাশক-প্রতি পাঁচ লাখ টাকাও নয়। এই ‘বিশাল’ পঞ্চাশ কোটি টাকার মধ্যে মুরগা লেখকের অংশগ্রহণ কত হবে? আনুমানিক পঞ্চাশ লাখ বা এক কোটি টাকা। এবং এই টাকা লেখক নিজের পকেট থেকে প্রকাশনা খাতে দিচ্ছেন। কিন্তু প্রথম প্রজাতির যে মুরগা ও তার ডিম্ব, তা বইমেলার বাইরে সারা বছর ধরে আমাদের ট্যাক্সের টাকায় কেনা হচ্ছে; আমাদেরই সীমিত লাইব্রেরি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংগ্রহশালাগুলোতে ভরে দেওয়া হচ্ছে এবং আমাদের পাঠক ও শিক্ষার্থীদের জ্ঞানগত প্রয়োজন ও বৈচিত্র্যময় পাঠের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।

মনে রাখা প্রয়োজন, মুরগার প্রবৃদ্ধির সঙ্গে পাঠকের কাছে প্রকাশকদের বই বিক্রির আগ্রহের সম্পর্ক বিপরীত বা উল্টা। অর্থাৎ যত মুরগা, পাঠক থেকে প্রকাশকের মনোযোগ তত দূরে। তাই প্রকাশনা শিল্পের স্বার্থে দু-প্রজাতির মুরগারই বিকাশ থামানো প্রয়োজন। কিন্তু কীভাবে?

যেভাবে মুরগার প্রথম প্রজাতির উৎপত্তি হয়েছে, যে কারণে এর উৎপত্তি হয়েছে, আগে সেখানে আঘাত করতে হবে। ঐতিহাসিক ব্যক্তি, ঘটনা, বা সম্মানিত পদ অবশ্যই প্রকাশনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে, কিন্তু তাকে মুরগা করে তোলা হচ্ছে যেই প্রক্রিয়ায় সেখান থেকে রাষ্ট্রকে আগে সরতে হবে। দ্বিতীয়ত রাষ্ট্রের সব ধরনের পদ ও প্রতিষ্ঠানে পদায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে জ্ঞানগত যোগ্যতা ও উৎকর্ষকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তৃতীয়ত সৃজন-মনন সংক্রান্ত ডকুমেন্ট সংগ্রহ, ক্রয় ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও লাইব্রেরিসহ রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানে যে নৈরাজ্য চলছে, অবনমনের প্রতিযোগিতা চলছে তা থামাতে হবে। এবং চতুর্থত নিচ থেকে ওপর পর্যন্ত শিক্ষার মানের যে ধারাবাহিক অবনমন ঘটানো হয়েছে, পাঠবিমুখ শিক্ষাব্যবস্থা সাজানো হয়েছে, সেখান থেকে রাষ্ট্রকে সরে আসতে হবে। এটা সম্ভব হলেই তার ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় প্রজাতির মুরগাও ক্রমে বিলুপ্তায়নের দিকে যাবে, কিন্তু উল্টোটা কখনো নয়।

মনে রাখতে হবে, প্রকাশনা খাতের সুষ্ঠু বিকাশের স্বার্থেই শুধু নয়, বাংলাদেশকে একটা সফল রাষ্ট্র হিসেবে দাঁড়াতে হলেও এর প্রকাশনা শিল্প থেকে মুরগা-সংস্কৃতির অপসারণ প্রয়োজন।