পরিবাগ ক্রসিংয়ের ফুটওভার ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে আমি সিগারেট টানছি। এ দেশে মেয়েদের ধূমপান গর্হিত অন্যায় বলে মনে করা হয়, কাজেই প্রকাশ্য দিবালোকে একটি মেয়ে ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে সিগারেট টেনে ধোঁয়া ছাড়ছে, এ কথা ভাবাই যায় না। সময়টা অবশ্য ঠিক দিবালোক নয়, একটু আগেই সন্ধ্যা নেমেছে। ফুটওভার ব্রিজে একটা আলো-আঁধারি ভাব, লোক চলাচলও বেশ কম। ব্রিজের নিচে দিয়ে নানা ধরনের যানবাহনের স্রোত বয়ে যাচ্ছে। আলো জ¦ালিয়ে ছুটে আসা গাড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি, সিগারেট শেষ হলেই আমি ব্রিজের ওপর থেকে নিচে ঝাঁপ দিয়ে পড়ব।
আমি প্রায় কখনোই সিগারেট খাই না আর নিয়মিত ধূমপানের তো প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু কয়েক দিন থেকেই মনে হচ্ছিল উল্টাপাল্টা কিছু একটা করা দরকার। এ ব্যাপারে আমার কোনো পরিকল্পনা বা পূর্ব প্রস্তুতি নেই। হতে পারে কোনো কারণ ছাড়াই অফিসে বসকে রাগিয়ে দেওয়ার মতো কিছু একটা বলা। একটা কথা মনে মনে ঠিকও করে রেখেছিলাম। ‘আপনি কি নিজেকে সমাজ সংস্কারক রাজা রামমোহন রায় মনে করেন? আসলে সমাজের তো দূরের কথা, আপনার দ্বারা এই মহল্লারও কোনো উন্নতি হবে না!’
কথাটা কীভাবে বলা যায় কয়েকবার তার মহড়াও দিয়েছি। কিন্তু আমি পাগল হলেও বসকে রাগিয়ে দিয়ে চাকরি খোয়াবার মতো পাগল নই। বিকল্প হিসেবে ভেবেছিলাম ঘরে বসে আকণ্ঠ মদ গিলে মাতলামি করব। দু-একটা পেয়ালা পিরিচ ভাঙব আর দৃশ্যমান অথবা অদৃশ্য কাউকে অশ্লীল ভাষায় গালাগাল দেব। কিন্তু সেখানেও তিনটি সমস্যা। প্রথমত, ঢাকা শহরে একটি ভদ্রজনোচিত বোতল জোগাড় করা একজন সাধারণ কর্মজীবী নারীর পক্ষে অসম্ভব। দ্বিতীয়ত, অশ্লীল বাক্য প্রয়োগ তো দূরের কথা, যথাসময়ে আমার মুখে যুৎসই কোনো কথাই জোগায় না। তৃতীয় এবং সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, আমি বর্তমানে যার সঙ্গে থাকছি অর্থাৎ বলা যায় লিভ টুগেদার করছি, তিনি আমার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেন না, তবে আমাকে মাতাল হতে দেখলে বেচারা নিঃসন্দেহে হার্ট অ্যাটাকে মারা যাবেন। অতএব পরিকল্পনাটি বাদ দিয়েছি।
উমর আলী ভীষণভাবে বিশ্বাসী মানুষ, ধর্মীয় আচার-আচরণে নিষ্ঠার অভাব নেই। প্রথম দিকে আমাকে ধর্মোপদেশ দিলেও বর্তমানে ক্ষ্যান্ত দিয়েছেন। এখন শুধু আমার সঙ্গে থাকতে পেলেই খুশি। কয়েক বছর আগে আমি পূর্বপরিচিত একজনের সঙ্গে একটা যৌথ ব্যবসা শুরু করেছিলাম। বিনিয়োগের ক্ষমতা সীমিত বলে এই ব্যবসায় যোগ দিয়েছিলাম ওয়ার্কিং পার্টনার হিসেবে। কাজে যোগ দেওয়ার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বুঝতে পেরেছিলাম প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অর্ডার সংগ্রহের ব্যাপারে আমার যৎ সামান্য রূপ যৌবনকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসা বাড়াতে চান। প্রতিষ্ঠানের পুরনো কর্মচারী উমর আলীই এ ব্যাপারে আমার চোখ খুলে দিয়েছিলেন। অল্প কিছুদিন পরে উমর আলী নতুন চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর আমিও ব্যবসার কপালে ঝাড়ু মেরে চাকরি খুঁজতে শুরু করেছিলাম এবং তারপর থেকেই আমরা একসঙ্গে থাকতে শুরু করেছি।
শেষ পর্যন্ত কিছুই না করতে পেরে আমার মস্তিষ্কের ভেতরে যখন একটা তোলপাড় চলছিল, তখন সমাধান হিসেবে ভেবেছি, তুলনামূলকভাবে নির্দোষ এবং অফিসের বস বা গৃহের বন্ধু কাউকেই ক্ষুব্ধ না করে রাস্তায় দাঁড়িয়ে সিগারেট টানা যেতে পারে। তবে দোকান থেকে সিগারেট কেনা এবং তাতে দেশলাই বা লাইটার দিয়ে অগ্নিসংযোগ করে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ধূমপান করাটাও আমার জন্য সহজসাধ্য নয়। অফিস থেকে বেরিয়ে কিছু দূর হেঁটে রাস্তার মোড়ে চা সিগারেটের যে দোকান সেখান থেকে সিগারেট কিনতে গেলে দোকানি নিশ্চয়ই একটু বাঁকা চোখে তাকাবে। তারচেয়ে বড় সমস্যা দোকানে চায়ের গ্লাস হাতে বসে থাকা গোটাকতক অকর্মা ছেলে ছোকরা অনিবার্যভাবেই দু-একটা মন্তব্য ছুড়ে দেবে।
এমন পরিস্থিতিতে আমার নিঃশ্বাস যখন প্রায় বন্ধ হয়ে আসছিল, ঠিক তখনই মুশকিল আসানের মতো ফারহান কবির এসে হাজির। লোকটি বয়সে আমার চেয়ে অনেক বড়। আচার-আচরণে একটু বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী টাইপের, খাঁটি বাংলায় বললে ব্যাক্কল কিসিমের বলে মনে হয়। বছর পাঁচেক আগে পরিচয়ের প্রথম দিকে আমার মনে হয়েছিল তিনি আমার প্রেমে পড়েছেন, কিন্তু দেখা গেল আমার ধারণা ভুল। এরপর উল্টো আমি তাকে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করেছিলাম, তাতেও তিনি সানন্দে সাড়া দিচ্ছেন বলে মনে হয়নি। বছর দুই আগে আমার অসুস্থতার সময় আমি তার ওপর ভীষণভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলাম। সে সময় বোধহয় জ¦রের ঘোরে কিংবা কোনো অসতর্ক মুহূর্তে ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে প্রেমপত্রের মতো কয়েক ছত্র লিখে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। তাতেও তার কোনো ভাবান্তর ঘটেছিল বলে মনে হয় না। আসলে তার সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক তা তিনি যেমন জানেন না, আমিও জানি না।
আমাদের অফিসের সঙ্গে ফারহান কবিরের কাজের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে মাঝে মধ্যে আমার বসদের কারও সঙ্গে আড্ডা দিতে আসেন। আজও ছুটির ঘণ্টাখানেক আগে তিনি আমাদের অফিসে এসেছিলেন। বের হওয়ার সময় আমরা একসঙ্গে বেরিয়েছিলাম এবং কিছুদূর পর্যন্ত একসঙ্গে ফুটপাত ধরে হাঁটার সময় আমার সিগারেট খাবার প্রবল ইচ্ছের কথা তাকে বলেই ফেললাম। তিনি প্রথমে একটু বিস্মিত হলেন, তবে আমি যেমনটা জানতাম ঠিক তেমনি, আমার ইচ্ছের বিরোধিতা করে কিছুই বললেন না। জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি নিয়মিত ধূমপান শুরু করেছ নাকি শখ করে খেতে চাইছ?’
বললাম, ‘নিয়মিত সিগারেট খাবার তো প্রশ্নই ওঠে না, তবে শখ করে খেতে চাওয়ার কথাটাও ঠিক নয়।’
‘তাহলে?’
‘ভীষণ ইচ্ছে করছে। আজ একটা সিগারেট খেতে না পারলে আমার দম বন্ধ হয়ে যাবে।’
তিনি প্রসঙ্গ পাল্টে বললেন, ‘তোমার কি কোনো নিজস্ব ব্র্যান্ড আছে?’
বললাম, ‘যেহেতু নিয়মিত খাই না, কাজেই আমার নিজের কোনো পছন্দ নেই। বেনসন লাইট চলতে পারে।’
‘নাম যখন জানো তখন অভ্যাস করে ফেলেছো মনে হয়। তবে একদিন খেলে লাইট কেন, কড়া কিছু একটা খেতে পারো।’
কথা বলতে বলতেই আমরা ফুটওভার ব্রিজের কাছাকাছি চলে এসেছিলাম। ফারহান কবির বাড়তি কোনো কথা না বলে ফুটপাত ঘেঁষে বসে থাকা চা সিগারেট সাজানো ছোট্ট দোকান থেকে দুটি বেনসন লাইট সিগারেট নিয়ে দাম মিটিয়ে দিলেন। একটা নিজের দুই ঠোঁটের ফাঁকে গুঁজে দিয়ে হাত বাড়াতেই দোকানি একটা দেশলাই তার হাতে তুলে দেয়। একবারের চেষ্টায় দেশলাইয়ের কাঠি ঠুকে সিগারেট ধরিয়ে ছোট্ট একটা টান দিয়েই ফারহান সিগারেটটা আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন। তার নিজের যদিও ধূপপানের অভ্যাস নেই তারপরও আমি ভেবেছিলাম একটা সিগারেট নিজে ধরিয়ে অন্যটা তিনি আমাকে দেবেন। কিন্তু তার জ্বলন্ত সিগারেট আমাকে হস্তান্তরের পরে আমি সেটি বাঁ হাতের দুই আঙুলের মধ্যে রেখে অন্য হাতে রেলিং ধরে ফুটওভার ব্রিজে উঠতে থাকি। খানিকটা ওঠার পরেই বুঝতে পারি ফারহান আমাকে অনুসরণ করে ওপরে উঠে আসছেন। আমি ব্রিজের ওপরে উঠে রেলিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে দুই ঠোঁটের ভেতরে সিগারেটটা চেপে ধরতেই একটা অন্যরকম ভালো লাগার অনুভূতি শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। সেটা কি আমার কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাবার আনন্দ থেকে নাকি ফারহানের ঠোঁটের স্পর্শ একটি সিগারেটের ভেতর দিয়ে আমার ঠোঁটে সঞ্চারিত হওয়ার কারণে তা আমি ঠিক বুঝতে পারি না।
বাংলামোটরের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে বাঁ হাতের অনামিকা এবং মধ্যমার মাঝে সরু শলাকাটা ধরে আমি আলতো করে সিগারেটে টান দিচ্ছিলাম। ফার্মগেটের দিক থেকে ছুটে আসা গাড়িগুলোর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকেই নিচে লাফিয়ে পড়ার কথা প্রথমবারের মতো আমার মনের ভেতরে উঁকি দিয়ে যায়। তবে এই পথে যান বাহনের চলাচল যথেষ্ট কম বলে ঝাঁপ দেওয়ার মুহূর্তে সঠিক সময়ে আমি একটা যুৎসই বাহন নাও পেতে পারি। সেই কারণে জায়গা বদল করে একটু সামনে এগিয়ে শাহবাগের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়েছি। পেছন ফিরে দেখলাম আমার কাছে থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়িয়ে থাকা ফারহান কবিরও এক পা দুপা করে এগিয়ে আমার কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছেন। আমি যদি সিগারেটটা শেষ করার পরে রেলিং বেয়ে ওপরে উঠে পড়ি, ফারহান কি আমাকে বাধা দিতে এগিয়ে আসবেন! নাকি আমি ঝাঁপ দিয়ে পড়ার পরে নিজেকে বাঁচাতে ফুটওভার ব্রিজ থেকে সবার অলক্ষ্যে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নেমে পালিয়ে যাবেন! আসলে তিনি আমার কাছে কী চান তা আমি যেমন জানি না, মনে হয় তিনিও জানেন না।
নিজের জীবন নিয়ে আমার কোনো সুদূরপ্রসারী বা দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা নেই। আসলে শৈশব থেকে পরজীবী পরগাছার মতো দূরের এবং কাছের আত্মীয়স্বজনদের বাড়িতে অনাদরে অবহেলায় মানুষ হয়েছি। প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও পড়াশোনার শেষ পর্যায় শেষ করতে পারিনি। ভাসমান কচুরিপানার মতো স্রোতের অনুকূলে ভাসতে ভাসতে কোথাও পরিত্যক্ত ডালপালায় আটকে গেছি, কোথাও পায়ের তলায় সামান্য মাটির স্পর্শ পেয়ে শেকড় ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। হয়তো কোথাও ঘন সবুজ কচুরিপানার শরীর জুড়ে ফুটে উঠেছে বেগুনি রঙের ফুল। কিন্তু ওই পর্যন্তই! আবার আকস্মিক বন্যায়, স্রোতের টানে ভেসে চলেছি লক্ষ্যহীন, গন্তব্যহীন অজানার উদ্দেশ্যে। তাই যে কোনো মুহূর্তে কোনো একটা সিদ্ধান্ত নিতে অথবা সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত করতে আমার ভেতরে কোনো দ্বিধা কাজ করবে বলে মনে হয় না। হাতের সিগারেট শেষ হলেই আমি পরিবাগ ক্রসিংয়ের ফুটওভার ব্রিজ থেকে নিচে ঝাঁপ দিয়ে পড়ব।
অনেকটা সময় পার হওয়ার পরে হঠাৎ মনে হয় আমার দুই আঙুলের ফাঁকে ধরে রাখা সিগারেটটা দীর্ঘক্ষণ ধরে জ¦লেও শেষ হচ্ছে না। আরও একবার দুই ঠোঁটের মাঝখানে চেপে আমি জোরে একটা টান দিই। মুখ ভরে ধোঁয়া টেনে নিয়ে আস্তে করে হাওয়ায় উড়িয়ে দিই। এতক্ষণে আমার আঙুলে আগুনের ছোঁয়া লাগার কথা। কিন্তু চোখের সামনে মেলে ধরলে আধো আলোয় দেখতে পাই এখনো অর্ধেকটাই শেষ হয়নি। সিগারেট শেষ হলেই আমি রেলিংয়ের ওপরে উঠে লাফিয়ে পড়ব। কিন্তু এ কেমন সিগারেট, যা আমার স্বেচ্ছামৃত্যুর পথেও বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ সময় হঠাৎ করেই আমার মাথায় বিদ্যুৎ চমকাবার মতো একটা প্রশ্ন ঝিলিক দিয়ে যায়, ফারহান এই সিগারেটের মধ্যে কোনো কারসাজি করে রাখেনি তো!
আমি বিষয়টা আবার আগাগোড়া ভেবে দেখতে চেষ্টা করি। অফিস থেকে বেরোবার পরে আমরা একসঙ্গে ফুটপাত ধরে হেঁটে আসছিলাম, সেই সময় আমি তার কাছে সিগারেট খাবার প্রবল ইচ্ছার কথাটা প্রকাশ করে ফেলি। তিনি আমার সামনেই ফুটপাতের পাশে বাক্সের মতো দোকান থেকে দুটি সিগারেট কিনে একটিতে আগুন লাগিয়ে আমার হাতে দিয়ে দেন। এর মধ্যে কোনো কারচুপি করার সুযোগ নেই। আমি বাঁ দিকে তাকিয়ে দেখি ফারহান ধীরে ধীরে আমার দিকে এগিয়ে আসছেন। হাতে বেশি সময় নেই। যা কিছু করার তাড়াতাড়ি করতে হবে। আমি সিগারেটে জোরে টান দিয়ে একরাশ ধোঁয়া আকাশে উড়িয়ে দিই। ধোঁয়ায় আমার দৃষ্টি আচ্ছন্ন হয়ে যায় আর সেই ধোঁয়ার মধ্যেই দেখতে পাই ফারহান আমার কাছাকাছি, খুব কাছে এসে দাঁড়িয়েছেন। আমি সিগারেটটা ঠোঁটে চেপে প্রাণপণে টানতে থাকি।