চট্টগ্রামের সন্তান বাবর আলী। পেশায় চিকিৎসক এই পর্বত আরোহী ষষ্ঠ বাংলাদেশি হিসেবে পৃথিবীর সর্বোচ্চ চূড়া হিমালয়ের মাউন্ট এভারেস্ট জয় করেন। এছাড়া তিনি পৃথিবীর চতুর্থ সর্বোচ্চ চূড়া লোৎসে জয় করা প্রথম বাংলাদেশি। উভয় চূড়ায় নিজের পদচিহ্ন রেখে গতকাল মঙ্গলবার রাতে তিনি চট্টগ্রামে এসে পৌঁছান। এদিন সন্ধ্যায় এভারেস্ট জয়ের কাহিনী জানান দেশ রূপান্তরকে। এভারেস্টের ভাঁজে ভাঁজে মরণফাঁদ ও অ্যাডভেঞ্চারের গল্প তুলে ধরছেন দেশ রূপান্তর চট্টগ্রামের ডেপুটি ব্যুরো প্রধান ভূঁইয়া নজরুল
দেশ রূপান্তর : এভারেস্টে উঠার পর প্রথম অনুভূতি কেমন ছিল?
বাবর আলী : পৃথিবীর সর্বোচ্চ চূড়ায় (২৯ হাজার ৩১ ফুট) ওঠা আমার একটা স্বপ্ন ছিল। সেই স্বপ্নের বাস্তবায়নটা আমি খুব ধীরে ধীরে সময় নিয়ে করেছি। আমার আগে যারা ছিল তারা নেমে আসার পর আমি শেষে চূড়ায় উঠেছি এবং ফলে দীর্ঘসময় চূড়াতে থাকার সুযোগ পেয়েছি। এতে ভাল ছবি যেমন তোলা গেছে তেমনিভাবে ভিডিও করা গেছে। আমি এক ঘণ্টা ১০ মিনিট পৃথিবীর সর্বোচ্চ চূড়ায় ছিলাম। তখন আমার দেশের কথা বারবার মনে পড়েছে। পরিবারের কথা মনে পড়েছে। ওখান থেকে পৃথিবীর সৌন্দর্য উপভোগ করেছি। এটার অনুভূতি অন্যরকম। তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।
দেশ রূপান্তর : ২৯,০৩১ ফুট উপর থেকে পৃথিবী দেখতে কেমন লেগেছে?
বাবর আলী : হিমালয়ের এভারেস্টের চূড়ায় উঠতে ১৫টি রুট রয়েছে। এসব রুটের মধ্যে নেপাল ও তিব্বতের দুটো রুট সবচেয়ে জনপ্রিয়। তাই চূড়ায় ওঠার পর নেপালের অংশে গ্রামের দৃশ্যগুলো দেখা যায় এবং তিব্বতের অংশ সবচেয়ে সুন্দর দেখায়। ঢেউ ঢেউ খেলানো। এক অপরূপ দৃশ্য।
দেশ রূপান্তর : এভারেস্টের উপরিভাগ কেমন? পর্বতশৃঙ্গ কি সমতল নাকি চূড়া (শৃঙ্গ) রয়েছে?
বাবর আলী : এভারেস্টের উপরিভাগ সমতল নয়। উঁচু নিচু রয়েছে। ধাপে ধাপে তা উপরে উঠেছে। আমি ছবিও তুলেছি চূড়ার ঢালে বসেই। ওখানে কোনো শৃঙ্গ নেই। আমি যেখানে উঠেছি সেটাই শৃঙ্গ।
দেশ রূপান্তর : আপনারা যারা চূড়ায় উঠেন এর প্রমাণ কিভাবে নিশ্চিতকরণ হয়ে থাকে? ওখানে কি কোনো বিচারক প্যানেল থাকে?
বাবর আলী : এভারেস্টের চূড়ায় কোনো বিচারক বা প্রত্যক্ষদর্শী থাকে না। আমরা নিজেরা সর্বোচ্চ চূড়ায় উঠে জাতীয় পতাকা নিয়ে ছবি তুলি ও ভিডিও করি। আর বেসক্যাম্প-৪ (২৬ হাজার ফুট উচ্চতায়) এ নেমে এসে রেডিও কন্ট্রোলের মাধ্যমে নিচে অবহিত করি। বেসক্যাম্প-৪ এর পর থেকে ৩০৩১ ফুট উচ্চতাকে বলা হয় ডেথ জোন। এই জোনটি পার হয়ে সর্বোচ্চ চূড়ায় উঠতে হয়। জোনটি পার হতে প্রায় দেড় দিন সময় লাগে। আর পাহাড় চূড়ায় ওঠাটা সম্পূর্ণ নিজের সততার উপর নির্ভর করে। আর যে চূড়ায় উঠার উদ্দেশে যাবে সে কখনো না উঠে আসবে না। আমাদের টিমে আমরা তিনজন ছিলাম, অপর দুই জনের একজন ছিলেন ভারতীয় ও অপরজন চিলির। আমরা সকলেই হিমালয়ের চূড়ায় উঠতে পেরেছি।
দেশ রূপান্তর : আচ্ছা হিমালয়ের চূড়ায় কিভাবে উঠেন? পাহাড়ের ঢাল বেয়ে? নাকি খাড়াভাবে উপরের দিকে?
বাবর আলী : পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে মূলত তিনটি পথ ব্যবহার করা হয়। কুলোওয়া (পাহাড়ের চিকন পথ ধরে), সরাসরি খাড়া উপরের দিকে ক্লাইম্বিং করা এবং গিরিসিয়া (উভয় পাশে নিচু ঢালের মাঝখান সিরা বরাবর সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া) পথে যাওয়া যায়। বেসক্যাম্প-৪ থেকে চূড়ায় উঠতে আমি মূলত গিরিসিয়া পথ ধরে এগিয়ে গিয়েছি। আমি সবচেয়ে উপরের বিন্দু থাকায় চারপাশ থেকে আসা তুষার ঝড় আমার গায়ে লাগছিল। শক্তভাবে ধরে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হয়েছে। আর এখান থেকে কেউ পা পিছলে পড়ে গেলে সরাসরি অনেক নিচের বেস ক্যাম্প-২ তে গিয়ে পড়ত। তবে লোৎসের ক্ষেত্রে কুলোওয়া পথ ব্যবহার করেছি। সেখানে ভাগ্য ভালো তুষার ঝড় কিংবা উপর থেকে পাথরের খণ্ড এসে নিচে পড়েনি।
দেশ রূপান্তর : হিমালয়ের উপরের বরফের স্তর কেমন?
বাবর আলী : হিমালয়ের উপরে হিমবাহের (বরফ) স্তরগুলো একসময় খুব মোটা ও পুরুত্ব ছিল। এখন এগুলো পাতলা হয়ে গেছে। এতে উপরিভাগে তুষারের পরিমাণ কমে গেছে। তুষারের পরিমাণ কমে যাওয়ায় পর্বতারোহীদের পা চলতে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তবে সবচেয়ে এলার্মিং বিষয় হলো হিমালয়ের উপরে বরফ গলে অসংখ্য লেকের তৈরি হচ্ছে। এতেই বুঝা যাচ্ছে পৃথিবীর উষ্ণায়নের প্রভাব যে হিমালয়ের উপরে গিয়ে পড়ছে।
দেশ রূপান্তর : হিমালয়ের বরফের স্তর কমে যাওয়ায় তো এর উচ্চতা দিন দিন কমে যাওয়ার কথা। বাস্তবে কি কমছে?
বাবর আলী : না, হিমালয়ের পর্বত চূড়ার উচ্চতা কমছে না। কারণ প্লেট টেকটোনিকের কারণে উভয় অংশের চাপে উপরের দিকে উঠছে এভারেস্ট। ফলে বরফ গলে গেলেও উচ্চতা না কমে বরং বাড়ছে।
দেশ রূপান্তর : এভারেস্টের চূড়ায় উঠা ও নামা কোনটি বেশি ঝুঁকিপূর্ণ?
বাবর আলী : এভারেস্টের চূড়ায় উঠা ও নামা উভয়ই ঝুঁকিপূর্ণ। তবে উঠার সময় উপরের দিকে উঠতে হয় বলে ভারসাম্য রাখা তুলনামূলকভাবে সহজ হয়। কিন্তু নামার সময়টি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এসময় তুষার ঝড়ে অনেক সময় পর্বতারোহীরা মারা পড়েন। আমিও নামার সময় দেড় ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে পর্বতারোহীদের জটলার কারণে। তাই আমি উপরে উঠার পর নামার বিষয় নিয়ে শঙ্কিত ছিলাম। নিচে নামার সময় আমরা অনেকের মরদেহ দেখতে পেয়েছিলাম।
দেশ রূপান্তর : এসব মরদেহ কখনকার?
বাবর আলী : এসব মরদেহ সম্ভবত ২০১৪ বা ২০১৫ সালে হিমালয়ের দুর্ঘটনার সময়কার। এতদিন বরফ চাপা পড়ে থাকায় সেগুলো দেখা যায়নি। এখন বরফ গলে যাওয়ায় হয়তো লাশগুলো ভেসে উঠেছে।
দেশ রূপান্তর : এভারেস্টে উঠতে গিয়ে পর্বত আরোহীরা কোন ধরনের রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে?
বাবর আলী : এভারেস্টের চূড়ায় উঠতে গিয়ে পর্বতারোহীদের মধ্যে তিন ধরনের রোগ দেখা দেয়। এরমধ্যে অন্যতম হলো ফুসফুসে পানি চলে আসা, মাথার কোষগুলো ফুলে যাওয়া এবং মাথাব্যথা ও জ্বর হওয়া। তবে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকে ফুসফুসে পানি আসা রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে।
দেশ রূপান্তর : পাহাড় চূড়ায় কোন ধরনের খাবার খেয়েছেন?
বাবর আলী : যেসব খাবার গরম পানিতে মিশিয়ে খাওয়া যায় সেসব খাবার। নুডলসসহ অন্যান্য খাবার যা দ্রুত গরম করে খাওয়া যায়।
দেশ রূপান্তর : এভারেস্টের চূড়ায় উঠতে আপনার কতদিন সময় লেগেছে?
বাবর আলী : আমি ১ এপ্রিল নেপালে গিয়ে পৌঁছানোর পর ৪ এপ্রিল লুকলায় গিয়ে পৌঁছাই। সেখান থেকে ১০ এপ্রিল বেজক্যাম্পে পৌঁছাই এবং বেজক্যাম্পে থেকে সকল কার্যক্রম শেষ করে এভারেস্টের উদ্দেশ্যে ১৪ মে যাত্রা শুরু করে ১৫ মে বেজক্যাস্প-২ তে পৌঁছাই। সেখানে দুই দিন অবস্থানের পর ১৮ মে ক্যাম্প ক্যাম্প-৪ এ পৌঁছাই। ১৮ মে মাঝরাত থেকে আবারো যাত্রা শুরু করে ১৯ মে সকাল সাড়ে ৮টায় এভারেস্টের চূড়ায় উঠি।
দেশ রূপান্তর : এভারেস্ট আর লোৎসে জয় করলেন। কোনটি বেশি চ্যালেঞ্জিং ছিল?
বাবর আলী : উভয় চূড়ার বৈশিষ্ট্য ভিন্ন। এভারেস্টে যাওয়ার সময় লোৎসে পর্বতের গা বেয়েই যেতে হয়। গা বেয়েই আমরা ক্যাম্প-৪ এ পৌঁছাই। তবে লোৎসে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং মনে হয়েছে। এভারেস্ট থেকে ক্যাম্প-৪ এ নেমে আসার পর লোৎসের চূড়ায় যেতে হয়েছে। এটার চূড়া খুব খাড়া। চূড়ার শৃঙ্গে দাঁড়ানোরও জায়গা নেই।
দেশ রূপান্তর : পর্বতারোহীদের সাথে গাইড হিসেবে কারা থাকে?
বাবর আলী : পর্বতারোহীদের সাথে গাইড হিসেবে শেরপা, তামাং, বিশ্বকর্মা ও রাই গোত্রের মানুষজন রয়েছে। সাগরমাতা ন্যাশনাল পার্ক এলাকায় এসব পাড়ার অবস্থান। বছরের এপ্রিল ও মে পর্বতারোহীদের জন্য সবচেয়ে মোক্ষম সময়। এসময়টায় তারা গাইড হিসেবে কাজ করে। এছাড়া বছরের অন্যান্য সময়ে তারা কৃষিকাজসহ অন্যান্য কাজও করে থাকে।
দেশ রূপান্তর : এভারেস্টের অভিযানে কি পরিমাণ খরচ হয়ে থাকে ?
বাবর আলী : এভারেস্ট অভিযানের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা হলো স্পন্সর। আমার প্রায় ৪৫ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এতো টাকা খরচ করে আমাদের মতো পর্বতারোহীদের পক্ষে অভিযানে যাওয়া এভারেস্ট জয়ের মতোই কষ্টকর। এরমধ্যে নেপাল সরকার ফি বাবদ নিয়ে যায় ১১ হাজার মার্কিন ডলার, ইনস্যুরেন্স খাতে আরও ১৮০০ মার্কিন ডলার। সব মিলিয়ে অনেক টাকা খরচ হয়।
দেশ রূপান্তর : এতক্ষণ সময় দেয়ার জন্য দেশ রূপান্তরের পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ।
বাবর আলী : দেশ রূপান্তরকেও অসংখ্য ধন্যবাদ।