ইউজিসিকে বেরোবির বৃদ্ধাঙ্গুল!

রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) নীতিমালা লঙ্ঘন করে গোপনীয়তার মাধ্যমে কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেয়ার লক্ষ্যে বাছাই বোর্ডের আয়োজন করা হয়েছে। শুক্রবার (৩১ মে) বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে  অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার (৪র্থ গ্রেড) ও সমপর্যায়ের পদে পদোন্নতি দিতে এ বাছাই বোর্ডের আয়োজন করেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. হাসিবুর রশীদ।

বিষয়টি ইউজিসি'র নজরে আসলে গতকাল বৃহস্পতিবার বোর্ড বন্ধ করতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ইউজিসির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট বিভাগের উপ পরিচালক মোহাম্মদ গোলাম দস্তগীর স্বাক্ষরিত চিঠি প্রেরণ করা হয়। তবে ইউজিসির নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে আজ শুক্রবার বেলা ৩টায় উক্ত বাছাই বোর্ড অনুষ্ঠিত হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এর আগেও কয়েকবার বাছাই বোর্ডের আয়োজন করে বিশ্ববিদ্যালয়। তবে ইউজিসির নিষেধাজ্ঞায় তা সফল হয় নি। তবে এবার নতুন পন্থা অবলম্বন করে পদোন্নতি দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন উপাচার্য। ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করে প্রার্থীদের মোবাইলে কল করে বোর্ডে উপস্থিত হওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। চিঠি না পাঠিয়ে ফোনে কল করে ডাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পদোন্নতি আগ্রহী প্রার্থীরাই।

আরো জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার ও সমমর্যাদার চতুর্থ গ্রেড এর পদসমূহে কর্মকর্তাদের নিয়োগের ক্ষেত্রে ইউজিসির বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী উম্মুক্ত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দিতে হবে। এ বিষয়ে ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি নির্দেশনা প্রদান করে ইউজিসি। যাতে বলা হয়েছে, প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ে রেজিস্ট্রার, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, অর্থ ও হিসাব এবং লাইব্রেরি এই চার দপ্তরে ৪র্থ গ্রেডভুক্ত অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার বা সমমানের পদ থাকবে। এই পদসমূহে ইউজিসি’র অনুমোদন সাপেক্ষে উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সরাসরি নিয়োগ দিতে হবে, পদোন্নতি/আপগ্রেডেশন/পর্যায়োন্নয়ন দেয়া যাবে না। 

ইউজিসির এই নির্দেশনা অমান্য করে বেরোবির উপাচার্য অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার/সমমানের পদে পদোন্নতির জন্য গত ২০২২ সালের ১৯ ডিসেম্বর প্রথমবার কর্মকর্তাদের ৪র্থ গ্রেডে পদোন্নতি দেয়ার জন্য বাছাই বোর্ড এর তারিখ নির্ধারণ করেছিলেন। বিষয়টি ইউজিসি’র নজরে আসলে ২০২২ সালের ১১ ডিসেম্বর পদোন্নতি বা আপগ্রেডেশন কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ প্রদান করে এবং দুই কার্যদিবসের মধ্যে ব্যাখ্যা তলব করেছিল।

এরপর ২০২৩ সালের ১১ ডিসেম্বর পুনরায় একই পদে আপগ্রেডেশনের জন্য বাছাই বোর্ডের সভা আহ্বান করা হলে কমিশন আবারও ২০২৩ সালেরর ১০ ডিসেম্বর পুনরায় এ সংক্রান্ত সকল কার্যক্রম বন্ধ করে দুই কার্যদিবসের মধ্যে কমিশনকে লিখিতভাবে জানাতে বলে। ফলে দ্বিতীয় দফায় বোর্ডের কার্যক্রম ভেস্তে যায়।

ইউজিসির আপত্তির পরেও তাদের নির্দেশনা অমান্য করে নতুনভাবে নানা কৌশলে গোপনীয়তার মধ্যে চলতি মাসের ৩১ মে (শুক্রবার) বিকেল ৩টায় ৪র্থ গ্রেডে পদোন্নতি দেয়ার জন্য বাছাইবোর্ডের আয়োজন করা হয়। একইসঙ্গে এই নিয়োগ দ্রুত অনুমোদনের জন্য আগামীকাল ১ জুন শনিবার দুপুর ১২টায় সিন্ডিকেট সভা আহ্বান করা হয়েছে।

এর আগের উদ্যোগগুলো ভেস্তে যাওয়ায় এবার যাতে নিয়োগ কার্যক্রমের খবর  ইউজিসি জানতে না পারে সেজন্য এই গোপনীয়তা রক্ষা করছেন বলে জানান সংশ্লিষ্ট সূত্র। সূত্র আরো জানায়, বাছাই বোর্ডের জন্য প্রার্থীদের কোন কার্ড ইস্যু করা হয়নি, দেওয়া হয়নি এসএমএস। সংস্থাপন শাখার অফিসিয়াল মোবাইল নম্বর থেকে  বুধবার বিকেল ৫টার পর থেকে ২৫ জন প্রার্থীকে মোবাইলে কল করে আজ শুক্রবার বিকেল ৩টায় প্রশাসনিক ভবনে উপস্থিত হতে বলা হয়। এরপরে এটি ইউজিসির নজরে আসলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয় তারা।

কর্মকর্তারা জানায়, শিক্ষকের স্ত্রী, জুনিয়র এক কর্মকর্তাসহ আরও উপাচার্যের কয়েকজন ঘনিষ্ট কর্মকর্তাকে ৪র্থ গ্রেডে প্রমোশন দিতেই মূলত এ আয়োজন করেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এরকম অন্যায়ভাবে আপগ্রেডেশন দেয়া হলে অনেক সিনিয়র কর্মকর্তা বঞ্চিত হবেন এবং তারা চাকরির সিনিয়রিটি হারাবেন। 

জানা যায়, উক্ত বাছাইবোর্ডে উপাচার্যের সভাপতিত্বে ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মো. মজিব উদ্দিন আহমেদ এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব এ বি এম ইফতেখারুল ইসলাম খন্দকার উপস্থিত থাকবেন। 

ইউজিসির নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে বারবার এভাবে বাছাইবোর্ড আয়োজনের বিষয়ে উপাচার্য প্রফেসর হাসিবুর রশীদের সাথে যোগাযোগ করতে গেলে বোর্ডে থাকার জন্য তিনি কথা বলতে পারবেন না বলে জানান তার পিএ খায়রুল ইসলাম এবং জনসংযোগ কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করতে বলেন তিনি। 

এ বিষয়ে জনসংযোগ ও প্রকাশনা দপ্তরের উপ পরিচালক মোহাম্মদ আলী বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় নীতিমালায় অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার, পরিচালক পদে পদন্নোতির মাধ্যমে নেয়ার উল্লেখ আছে এবং এর আগেও বিশ্ববিদ্যালয়ে চারজনকে অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার পদমর্যাদা দেয়া হয়। তাহলে এখন কেন হবে না? যা হচ্ছে সবই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী হচ্ছে।

এ বিষয়ে  ইউজিসিরি সচিব ড. ফেরদৌস জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিষয়টি বিভিন্ন মাধ্যমে গতকাল জানতে পেরে বিশ্ববিদ্যালয়কে চিঠি দিয়েছি। এখন আমরা তো আর পুলিশ না যে এখান থেকে কিছু করতে পারব। আমরা চিঠি দিয়েছি, তারা যদি এখন করে তাহলে আমরা পরবর্তী পদক্ষেপ যা নিয়ম অনুযায়ী সেটা আমরা নিব। অবৈধভাবে গ্রেড-৪ এ আপগ্রেডেশন দেয়ার কোনো সুযোগ নেই সেটাই আমরা জানিয়ে দিয়েছি। এর বাইরে আমার আর কিছু বলার নেই।

উল্লেখ্য, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের নিয়োগ উন্মুক্ত নিয়োগের কথা থাকলেও  ইউজিসি'র নির্দেশ উপেক্ষা করে এর আগে গত বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. নিতাই কুমারকে দেয়া হয়। যা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তাদের মাঝেও নানা সমালোচনা হয়।