ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাসে প্রাকৃতিক দেয়াল হিসেবে কাজ করছে উপকূলীয় বনায়ন। সর্বশেষ ঘূর্ণিঝড় ‘রিমাল’ এর আঘাত থেকে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পুরো এলাকাকে রক্ষা করেছে সুন্দরবন। এছাড়া ২০০৯ সালের ‘আইলা’ কিংবা ২০০৭ সালের ‘সিডরের’ আঘাত থেকেও রক্ষা করেছে বিশ্বের বৃহত্তম এই ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট। ৭১০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলীয় এলাকায়ও প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে এই বন।
কিন্তু, কোন ধরনের গাছ আমাদের রক্ষা করছে? এসব গাছের প্রজাতির মধ্যে কি কোনো পরিবর্তন রয়েছে? কিংবা এসব গাছ কতদিন বাঁচে?— এসব নানা বিষয় নিয়ে কাজ করে বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট। এই ইনস্টিটিউটের একাধিক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানা যায়, দেশের উপকূলীয় বনায়নে পরিবর্তন এসেছে। একসময় শুধু কেওড়া, সুন্দরী, গোলপাতা, গরান কিংবা গেওয়া বৃক্ষসহ ২২ প্রজাতির গাছ লাগানো হয়েছিল দেশের উপকূলীয় এলাকায়। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে অনেক প্রজাতি হারিয়ে গেছে সেগুলো সমুদ্রের পানির লবণাক্ততার তারতম্যে আর বেড়ে উঠতে পারেনি। সেই ২২ প্রজাতি থেকে কমে ১৩ প্রজাতিতে নেমে এসেছে। আবার এই ১৩ প্রজাতির পাশাপাশি পানির দূরত্ব বিবেচনায় এখন ফলজ ও ওষধি গাছ লাগানো হচ্ছে।
এ বিষয়ে কথা হয় বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুল কুদ্দুস মিয়ার সাথে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১৯৬৫ সালে দেশের উপকূলীয় এলাকায় বনায়নের জন্য ২২ প্রজাতির গাছের চারা রোপণ করা হয়েছিল। কিন্তু ১৯৯০ সালের গবেষণা জরিপে এসব প্রজাতির মধ্যে ৯টি প্রজাতি হারিয়ে যায়। সুন্দরী, বাইন, পশুর, খলসি, কাকরা, গড়ান, কিরপা, ধুন্দল, হেতাল, গোলপাতা, গর্জন, গেওয়া ও কেওরার গাছগুলো টিকে থাকলেও ২০১৬ থেকে ২০২১ সালে পরিচালিত জরিপে পাওয়া যায় নতুন চিত্র।’
নতুন কি পাওয়া যায় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এসব গাছের মধ্যে সুন্দরী, গেওয়া ও হেতালের পুন:জন্মের হার খুব বেশি। প্রাকৃতিকভাবে মাটিতে পড়ে গজিয়ে ওঠা এসব চারা ১০ থেকে ১৫ বছরে গভীর অরণ্যে ভরে উঠে। বর্তমানে দেশের পটুয়াখালী, ভোলা, চর কুকরি-মুকরি, চর কাসেমসহ বিভিন্ন এলাকায় নতুন গজিয়ে উঠা ভূমিতে এসব গাছের গভীর বন গড়ে উঠেছে।’
তবে উপকূলীয় বনায়নে নতুন একটি ম্যাপ তৈরি করেছেন বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. পরমেশ নন্দী। দীর্ঘ ২৫ বছর বন গবেষণায় কাজ করা এই ড. পরমেষ নন্দী ১৯৯৮ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত বরিশাল অঞ্চলের উপকূলীয় বন বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি আমার ম্যাপে দেখিয়েছি সাগরের যে অংশে নতুন চর জেগে উঠে এবং যেখানে ১২ মাস পানি জমে সেখানে কেওরার গাছের বনায়ন করতে হবে। কেওড়ার বীজ নরম মাটিতে পড়লেই সেখান থেকে দ্রুত গাছ গজিয়ে উঠে। কেওরার পাশাপাশি পশুর ও খলসি গাছের চারা রোপণ করতে হবে এই এলাকায়। কারণ মাটি শক্ত হওয়ার সাথে সাথে এবং জোয়ারের পরিমাণ কমে আসার সাথে সাথে কেওড়া গাছ মরতে শুরু করবে। যখন বছরের মাত্র তিন মাস পানি উঠবে ওই এলাকায় তখন কেওড়া বৃক্ষ প্রায় থাকবেই না। এজন্য কেওড়ার পাশাপাশি পশুর ও খলসি গাছ লাগাতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, যেসব এলাকায় বছরের ৯ মাস পানি জমবে সেসব এলাকায় সুন্দরী, গেওয়া, ধুন্দল, কিরপা ও কাকড়া, ৬ মাস পানি জমা এলাকায় গড়ান ও হেতাল এবং ৩ মাস পানি জমা এলাকায় সিংড়া গাছ লাগাতে হবে।
একটি নতুন চর জেগে উঠার সময় ১২ মাসই পানি উঠে, পরবর্তীতে কেওড়া গাছ লাগানোর পর এখানে পলি জমে চরের উচ্চতা বাড়তে থাকে। যখনই চরের উচ্চতা বাড়তে থাকে তখন বছরের বেশিরভাগ সময় জোয়ারেও তা ডুবে না। এভাবে শুধুমাত্র বর্ষার তিন মাসে ডুববে এমন পর্যায়ে একটি ভূমি আসতে কতদিন সময় লেগে থাকে? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে ড. পরমেশ নন্দী বলেন,‘ এতে প্রায় ১৫ বছর সময় লাগে। আর ১৫ বছরের মধ্যে কেওড়ার বৃক্ষগুলো মারা গিয়ে এলাকাটি বনভূমি শূন্য হতে পারে। সেজন্যই কেওড়ার পাশাপাশি অন্যান্য গাছ লাগানোর কথা বলা হয়েছে। আমাদের গবেষণায়ও তা প্রমাণিত।’
পুরো উপকূলজুড়েই এসব গাছ লাগানো যাবে বলে জানান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ফরেস্ট্রি এন্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের অধ্যাপক জি এন তানজিনা হাসনাত। তিনি বলেন, ‘সুন্দরবন একটি প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট। কিন্তু সুন্দরবন ছাড়া দেশের বাকি উপকূলীয় এলাকায় এসব বৃক্ষের মাধ্যমে বনায়ন তৈরি করা যায়। আর এই কাজটি করে আসছে দেশের উপকূলীয় বন বিভাগ।’
উপকূলে জনপ্রিয় হচ্ছে তাল গাছ
একসময় দেশের স্থলভাগের এলাকায় তালগাছ প্রচুর ছিল। মূলত বজ্রপাত থেকে মানুষকে রক্ষা করতে এই তাল গাছের ভূমিকা ছিল অনন্য। এখন আবারো স্থলভাগের বিভিন্ন এলাকায় তালের চারা রোপণ কর্মসূচী নেওয়া হয়েছে। বজ্রপাত থেকে রক্ষার সেই তালগাছ এখন দেশের উপকূলীয় এলাকায় বেশি লাগানো হচ্ছে বলে জানান বাংলাদেশ বনে গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষকরা। এ বিষয়ে গবেষক আবদুল কুদ্দুস মিয়া বলেন, ‘তাল গাছের শিকড় মাটির অনেক গভীরে থাকে। তীব্র ঝড়েও গাছ উপড়ে পড়ে না। তাই বর্তমানে আমরা উপকূলীয় এলাকায় তালের চারা রোপণ করছি। এছাড়া নারিকেল, সুপারি ও খেজুর গাছও লাগানো হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ফলজ এসব গাছের পাশাপাশি ১৪ প্রজাতির ওষধিও গাছও লাগানো হচ্ছে উপকূলীয় এলাকায়। এসব গাছের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো অর্জুন, হরিতকী, বহেরা, ছাতিয়ান, রয়না, শিমুল, সোনালু, খয়ের, কালোজাম, পুনিয়াল, কাঠবাদামসহ বিভিন্ন জাতের ওষধি গাছ। এছাড়া উপকূল থেকে একটু স্থলভাগের দিকে বনায়ন হচ্ছে বাঁশ ও বেত গাছের।
এদিকে আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবস। এবারের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘করবো ভূমি পুনরুদ্ধার, রুখবো মরুময়তা, অর্জন করতে হবে মোদের খরা সহনশীলতা’। আর দেশে প্রতিবছর ২৫ কিলোমিটার এলাকা নতুন করে গজিয়ে উঠছে এবং ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে প্রায় অর্ধেক ভূমি রক্ষা করা হয় উপকূলীয় বনায়নের মাধ্যমে।