রাত যত গভীর হয়, প্রভাত ততই নিকটে আসে। এই প্রবাদটাই বাংলাদেশের ক্রিকেটে এখন একমাত্র আশার আলো। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের টি-টোয়েন্টি পারফরম্যান্স হতাশার গাঢ় অন্ধকারে ঢেকে আছে। এমন নয় যে খুব ভালো দল থেকে হঠাৎ করে এই হাল; বরং বলা যায় ধারাবাহিক অনিয়ম আর স্বেচ্ছাচারিতার ফসল এই দৈন্যদশা। যা দেখে বিশ্বের অন্য দেশের সাবেকরা টিপ্পনী কাটেন, ছোট দলগুলোও ভয় ধরায়। র্যাংকিংয়ের হিসাব বাদ দিন, এই বিশ^কাপে অংশ নেওয়া ২০ দলের ভেতর খুব সম্ভবত কুৎসিততম ক্রিকেটটা খেলতে পারে বাংলাদেশ। এরপর ভারতের বিপক্ষে নিউ ইয়র্কের প্রস্তুতি ম্যাচে আজব ব্যাটিং বুঝিয়ে দিয়েছে, বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা টি-টোয়েন্টির ছন্দটাই বোঝেন না। গিটার আর ড্রামসের সংগতে যেমন উচ্চাঙ্গসংগীত হয় না, তেমনি বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের এমন সাবধানি মনোভাবে টি-টোয়েন্টির ব্যাটিং হবে না।
দেশ রূপান্তর কথা বলেছে রাজিন সালেহ, তারেক আজিজ খান এবং সোহেল ইসলামের সঙ্গে। তিনজনই টি-টোয়েন্টির একমাত্র ঘরোয়া আসর বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে কোচিংয়ের সঙ্গে যুক্ত। সাবেক অধিনায়ক রাজিন সিলেট স্ট্রাইকার্সের প্রধান কোচ, সোহেল রংপুর রাইডার্সের। তারেক রংপুরেই পেস বোলিং কোচ। এ ছাড়া ক্লাব ক্রিকেটে রাজিন আবাহনীতে, সোহেল এবং তারেক শেখ জামালে। তিনজনের সঙ্গে আলাপে উঠে আসে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যান এবং বোলারদের বেশ কিছু মৌলিক সমস্যার কথা। রাজিন যেমন বলছিলেন, ‘লিটন দাস আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভুগছেন। তার সঙ্গে কোচের কথা বলাটা জরুরি। কোচকে তাকে আস্থার জায়গায় আনতে হবে। সৌম্য সরকার সব সময় একই ছন্দে খেলতে পছন্দ করে। খেলার পরিস্থিতি ভেদে তার খেলার ছন্দেও পরিবর্তন আনতে হবে। তামজিদ তামিম ৩০-৩৫ রান করার পর যখনই প্রতিপক্ষ একটু কঠিন করে ফেলে রান নেওয়া, ফিল্ডিংয়ে রান আটকে দেয়, তখন সে ছটফট করে উইকেট বিলিয়ে দিয়ে আসে। আমার দলের বিপক্ষে তাকে এ রকম করতেই দেখেছি। শান্ত খুব ভালো ব্যাটসম্যান, পরিশ্রমী ক্রিকেটার। কিন্তু সে ১২০-১৩০ এই স্ট্রাইক রেটের ব্যাটসম্যান। তার পক্ষে ১৮০ স্ট্রাইক রেটে ব্যাট করে ইনিংস বড় করা সম্ভব না। তাওহীদ হৃদয়ের হাতে শট আছে, লেগ সাইডে খুবই শক্তিশালী। কিন্তু ওদিকেই আউট হয় বেশি। কারণ বোলাররা পরিকল্পনা করে সেভাবেই ফিল্ডার রাখে। জাকের আলি অনিকের মধ্যে তাড়াহুড়োটা বেশি, অফসাইডে শট খেলতে পারে না।’ রাজিন বাংলাদেশ দলে খন্ডকালীন কাজ করেছেন ফিল্ডিং কোচ হিসেবে, সিলেট স্ট্রাইকার্সে দুই মৌসুম কাজ করলেন প্রধান কোচ হিসেবে আর আবাহনীতে আছেন ব্যাটিং কোচ হিসেবে। সাবেক এই অধিনায়ক যদি এই সমস্যাগুলো ধরতে পারেন, তাহলে চন্ডিকা হাথুরুসিংহে, নিক পোথাস কিংবা ডেভিড হেম্প কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার বিনিময়ে কী করছেন, সেই প্রশ্নও ওঠে।
তারেক আজিজ পেসারদের মধ্যে সবচেয়ে বড় যে সমস্যাটা চিহ্নিত করেছেন, সেটা হচ্ছে অহেতুক শর্ট বল করার প্রবণতা। ‘তানজিম হাসান সাকিব এবং শরিফুল ইসলাম, দুজনরই শর্ট বল করার প্রবণতা বেশি। মোস্তাফিজ ইদানীং একটু খরুচে হয়ে যাচ্ছে আর তাসকিনের লেন্থের গোলমাল কাটেনি’, দেশ রূপান্তরকে বলেছেন জাতীয় দলের সাবেক এই পেসার। একটা সময় স্পিন বোলিং বিভাগটা ছিল ভরসার। এবারে লেগ স্পিনার রিশাদ হোসেন যোগ হওয়ায় বৈচিত্র্য এলেও অভিজ্ঞতায় পিছিয়ে। মাত্র ২ ম্যাচ খেলে বিশ্বকাপের টিকিট পেয়েছেন তানভীর, বড় আসরের চাপ সামলাতে কতটা পারবেন তারা?
প্রস্তুতি পর্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সিরিজ হার চিড় ধরিয়েছে মনোবলে। প্রস্তুতি, সামর্থ্য, সবেতেই পিছিয়ে বাংলাদেশ। প্রথম দল হিসেবে ১০০ টি-টোয়েন্টি ম্যাচ হারার লজ্জাকে যদি অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখতে চান, তাহলে কোনো দলই চাইবে না এখানে বাংলাদেশকে পেছনে ফেলতে। একটা সময়ে দুঃসময়ে দর্শকদের পাশে পেত বাংলাদেশ, তারাও এখন দুয়ো দিচ্ছে। সব মিলিয়ে এর চেয়ে নিচে আর নামা সম্ভব নয় বাংলাদেশের ক্রিকেটের। বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য তাই ‘অনলি ওয়ে ইজ আপ’।
যুক্তরাষ্ট্রের উইকেটগুলো আইপিএলের মতো রান উৎসবের মঞ্চ হবে না; বরং নিচু গতির এবং বাউন্সের হবে, সেটা আন্দাজ করা যায়নি। এখন পর্যন্ত হয়ে যাওয়া ম্যাচগুলোতে সেই প্রবণতাই দেখা যাচ্ছে, খুব বেশি চার-ছক্কা হচ্ছে না। আউটফিল্ডও দ্রুতগতির নয়, চোখের পলকেই বল সীমানায় ছোটে না। স্পিনাররা সহায়তা পাচ্ছে। আগের ম্যাচে প্রোটিয়াদের কাছে গুঁড়িয়ে গিয়ে শ্রীলঙ্কাও আছে ব্যাকফুটে। মার খেতে খেতে ভূত হয়ে যাওয়া বাংলাদেশের জন্য পালটা মার বসিয়ে নকআউট পাঞ্চে ম্যাচটা জিতে নেওয়ার এটাই সেরা সুযোগ। শ্রীলঙ্কার সঙ্গে জিতলেই বাড়বে মনোবল, জাগবে দ্বিতীয় রাউন্ডে যাওয়ার সমীকরণ। এমনই এক ভোরেরই প্রতীক্ষায় গোটা দেশ।