ফ্রিজ-এসির ৮০% বাজার দেশি কোম্পানির

জলবায়ু পরিবর্তনে তাপমাত্রা বাড়তে থাকায় একসময়ের বিলাসী পণ্য এয়ারকন্ডিশনার-ফ্রিজ এখন প্রয়োজনীয় পণ্যের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। দেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রমবিকাশে এসি-ফ্রিজের বাজার বাড়তে থাকায় স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো এ খাতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছে। মূল্যসাশ্রয়ী ও উন্নত পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে এখন দেশের এসি-ফ্রিজের বাজারের ৮০ শতাংশের বেশি দখলে নিয়েছে স্থানীয়ভাবে উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো, যা একসময়ে পুরোপুরি আমদানিনির্ভর ছিল।

এসি-ফ্রিজের বাজার দখলে স্থানীয় কোম্পানিগুলোর মধ্যে এগিয়ে রয়েছে ওয়ালটন, যমুনা, মিনিস্টার-মাইওয়ান, ভিশন, ট্রান্সটেক উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে এককভাবে ওয়ালটন সবচেয়ে বেশি এগিয়ে। বিদেশি এসির মধ্যে শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ড চীনা নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘গ্রি’। এই ব্র্যান্ডের এসি এখন বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে দেশীয় কোম্পানি ইলেকট্রোমার্ট উৎপাদন করে। এ ছাড়া এসি-ফ্রিজের উল্লেখযোগ্য ব্র্যান্ডের মধ্যে রয়েছে সিঙ্গার, জেনারেল, ভিশন, স্যামসাং, এলজি, ইকো প্লাস, বাটারফ্লাই, যমুনা, হিটাচি, শার্প, তোশিবা ও ওয়ার্লপুল ইত্যাদি। সম্প্রতি বিদেশি ব্র্যান্ড হাইসেন্স প্রবেশ করেছে দেশের বাজারে। এই বিদেশি ব্র্যান্ডের অনেকগুলো এখন বাংলাদেশের কারখানায় তৈরি হচ্ছে।

বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, দেশের কনজিউমার ইলেকট্রনিকসের বাজারে গত ১০ বছরে গড়ে ১৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০২৫ সালে এর আকার ৬ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াবে। মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান, মাথাপিছু আয় ও শহরে মানুষের বসবাসের প্রবণতা বাড়ার সঙ্গে কনজিউমার ইলেকট্রনিকসের বাজারের প্রবৃদ্ধি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের (বিসিজি) পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০১৫ সালে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণির সংখ্যা ছিল ১ কোটি ২০ লাখ, যা ২০২৫ সালে ৩ কোটি ৪০ লাখে দাঁড়াবে। প্রতিবছর এ শ্রেণিতে গড়ে ১০ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ যোগ হচ্ছে সক্ষমতার তালিকায়। মূলত এ সম্ভাবনার বিষয়টি বিবেচনা করেই স্থানীয় বড় ব্যবসায়িক গ্রুপগুলো ইলেকট্রনিকস খাতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছে। পাশাপাশি বাজার ধরে রাখতে বেশ কিছু বিদেীি ব্র্যান্ডও বাংলাদেশে তাদের কারখানা স্থাপন করেছে। বর্তমানে দেশে যেসব এসি কেনাবেচা হচ্ছে, সেগুলোর বেশিরভাগ দেশে উৎপাদিত। কোনো কোনো কোম্পানি যন্ত্রপাতি এনে বাংলাদেশে সংযোজন করে।

কভিডের অভিঘাতের কারণে দুই বছর কনজিউমার ডিউরেবলসের প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত, ডলার-সংকট, টাকার অবমূল্যায়ন ও ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতির কারণে ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার প্রভাব পড়েছে এ খাতের ব্যবসায়। এতে খাতটির প্রবৃদ্ধির প্রক্ষেপণ কিছুটা পিছিয়েছে। তবে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ালে কনজিউমার ইলেকট্রনিকসের বাজারেও প্রবৃদ্ধি বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাড়বে ফ্রিজ-এসির বাজারও।

খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের নীতি-সহায়তার কারণে চাহিদার বেশিরভাগ এসি দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে করছাড়সহ বিনিয়োগবান্ধব বিভিন্ন নীতি নিলে এসি হতে পারে সম্ভাবনাময় রপ্তানিপণ্য। বর্তমানে দেশে ব্যবহৃত এসির প্রায় ৯০ শতাংশ এখন স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হয়। বাকিটা আমদানি করা হয়। সরকার প্রয়োজনীয় সুবিধা দিলে আমদানির দরকার হবে না।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৩ সালে প্রকাশিত স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশের ১ দশমিক ৭৪ শতাংশ পরিবারে (খানা) এসির ব্যবহার ছিল। এক বছরের ব্যবধানে এর পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২৩ সালে এসির ব্যবহার বেড়ে দাঁড়ায় ২ দশমিক ২৮ শতাংশে। দেশে খানার সংখ্যা এখন প্রায় ৪ কোটি ১০ লাখ। এ খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্তমানে যে সাড়ে ৬ লাখ ইউনিট এসি বিক্রি হচ্ছে, এর বাজারমূল্য ছয় হাজার কোটি টাকার বেশি।

এ খাতের উদ্যোক্তারা জানান, দ্রুত চাহিদা বাড়ার কারণে গত বছরের এ সময়ের তুলনায় এবার এসির বিক্রি বেড়েছে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ। বিভিন্ন কোম্পানি এসি বিক্রির ক্ষেত্রে ইএমআই, সহজ কিস্তি, ফ্রি ইনস্টলেশনসহ বিভিন্ন সুবিধা দিচ্ছে। এ কারণে গ্রাহকদের এসি কেনায় আগ্রহ বাড়ছে। তবে ডলারের দাম বাড়ার কারণে এসির কাঁচামাল আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে। এতে বেড়েছে উৎপাদন ব্যয়। ফলে চলতি বছর ৫ থেকে ১০ শতাংশ বেড়েছে এসির দাম। যদিও কোনো কোনো কোম্পানির দাবি, তারা দাম বাড়ায়নি।

স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে উদ্যোক্তারা এখন রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণে কাজ করছে ওয়ালটন। বর্তমানে ওয়ালটনের এসি এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। এ ছাড়া ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়াসহ উন্নত দেশগুলোতে রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত আরও কয়েকটি কোম্পানিও এসি রপ্তানির প্রক্রিয়া শুরু করেছে।

এসির বাজার একটা সময় পুরোপুরি ছিল আমদানিনির্ভর। জাপান, কোরিয়া ও তাইওয়ান থেকে বিদেশি ব্র্যান্ডের এসি আমদানি করা হতো। প্রথমে চীন থেকে এসি আমদানি শুরু হয়। ২০০৪ সালে প্রথম দেশি প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইলেকট্রোমার্ট লিমিটেড চীনের হোম অ্যাপ্লায়েন্স প্রস্তুতকারক গ্রির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে আমদানি করা প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ দিয়ে এসি সংযোজন শুরু করে। সে সময় এসির সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ৩০ হাজার। ক্রমে দেশের অনেক আমদানিকারক চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে খুচরা যন্ত্রাংশ এনে দেশে সংযোজন করে এসি বাজারজাত করতে থাকে। এরই মধ্যে দেশীয় কয়েকটি কোম্পানি দেশে ইলেকট্রনিক পণ্যের কারখানা করে। কেউ কেউ শুরুটা করেছিল রেফ্রিজারেটর দিয়ে।

দেশ প্রায় শতভাগ বিদ্যুতের আওয়তায় আসায় এখন সংসারের অন্যতম অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে ফ্রিজ। শহর-গ্রাম, উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্ত, এমনকি নিম্ন আয়ের মানুষের ঘরেও স্থান করে নিয়েছে ফ্রিজ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে ফ্রিজের বাজার এখন ১১ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। বছরে এই বাজারের প্রবৃদ্ধি প্রায় ১৫ শতাংশ।

খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, ফ্রিজ এখন প্রাত্যহিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। দিন দিন এর ব্যবহার বাড়ছে। সরকার স্থানীয় শিল্পের বিকাশে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে শিল্পবান্ধব নীতি-সহায়তা দিচ্ছে। ফলে দেশে ফ্রিজের বাজারের ৮০ শতাংশেরও বেশি মার্কেট শেয়ার এখন স্থানীয় কোম্পানির দখলে। চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানিও হচ্ছে। এতে কোণঠাসা হয়ে পড়ছে বিদেশি ব্র্যান্ড। তবে এই শিল্পের দ্রুত বিকাশে আরও কয়েক বছর কর সুবিধা চান এ খাতের ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।

বিত্তশালীদের চাহিদা মেটাতে একসময় আমদানি হতো ফ্রিজ। দেশে উৎপাদনের প্রথম উদ্যোগ নেয়  ওয়ালটন। এরপর একে একে যমুনা গ্রুপ, প্রাণ-আরএফএল, মিনিস্টার, ট্রান্সকম ও ওরিয়ন ফ্রিজ উৎপাদন শুরু করে। এ ছাড়া বিদেশি ব্র্যান্ড স্যামসাং, সিঙ্গার, ওয়ার্লপুল ও কনকা কারখানা স্থাপন করে।

বর্তমানে দেশে বছরে যত রেফ্রিজারেটর বা ফ্রিজ বিক্রি হয়, তার বড় অংশ হয় গ্রামে। উপজেলা পর্যায়ে ও বড় ইউনিয়নে গড়ে উঠেছে ইলেকট্রনিকস পণ্যের দোকান। বিক্রেতারা বলছেন, বিদ্যুৎ সুবিধার পাশাপাশি পরিবারগুলো প্রবাসী আয় পাচ্ছে। কেউ কেউ ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে ফ্রিজ কিনছে। সচ্ছল গৃহস্থ পরিবার ফ্রিজ কিনছে তার কৃষি খাতের আয় দিয়ে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস প্রতিবেদন (২০২৩) অনুযায়ী, দেশের ৫৩ শতাংশের বেশি খানায় এখন ফ্রিজ রয়েছে, যা ২০২১ সালে ছিল ৪৫ শতাংশের মতো। উল্লেখ্য, খানা বলতে বোঝায় মূলত একটি পরিবারকে।

স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানির বাজারও প্রসারিত হচ্ছে রেফ্রিজারেটরের। ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, তুরস্ক, অস্ট্রিয়াসহ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, ইউরোপের বিভিন্ন দেশসহ ৪০টির বেশি দেশে ফ্রিজ ও ফ্রিজের যন্ত্রাংশ রপ্তানি হচ্ছে। ২০২৬ সালের মধ্যে তিন লাখ ইউনিট ফ্রিজ রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ওয়ালটনের। মিনিস্টার ব্র্যান্ডও রপ্তানির প্রস্তুতি নিচ্ছে।