‘মাটিতে বাস পাতালে বিনিয়োগ’

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনকালে নিজের মতের বিরুদ্ধে অনেক প্রকল্প অনুমোদন দিতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। ‘এমন প্রকল্প আমার হাত দিয়ে গেছে বা যাচ্ছে যেগুলোর সঙ্গে আমি মনেপ্রাণে একমত নই। আমরা বাস করি ভূতলে (মাটিতে), বিনিয়োগ করি পাতালে। এ ধরনের অনেক প্রকল্প বাংলাদেশে আছে।’

গতকাল বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত বাজেট সংলাপে অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন তিনি। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সিপিডির বোর্ড ট্রাস্টিজের কোষাধ্যক্ষ সৈয়দ মনজুর এলাহী।

সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ‘এটা আমার নিজের বক্তব্য। এ মুহূর্তে আমি সরকারের অংশ নই। রাজনৈতিকভাবে দলে ও সংসদে আছি। সাধারণ মানুষ ও গ্রামীণ এলাকার প্রতিনিধিত্ব করছি। আমরা গ্রামে বিদ্যুৎ পেয়েছি, কমিউনিটি ক্লিনিক পেয়েছি। প্রধানমন্ত্রী এসব দিয়েছেন।

কৃষিতে আমাদের বিশাল অর্জন হয়েছে।’

প্রকল্প বাস্তবায়নে ১০ বছরের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে এম এ মান্নান বলেন, ‘বাজেটে কোথায় ব্যয় করছি, সেখান থেকে আমরা কী পাচ্ছি এসব বিচার করা দরকার। আদৌ কোনো রিটার্ন পাচ্ছি কি না দেখা দরকার। আমরা বাস করি ভূতলে, বিনিয়োগ করি পাতালে। এই প্রবণতা নিয়ে চিন্তা করার প্রয়োজন আছে। অনেক জায়গায় আমরা সাপ্লাই কিল করি, ডিমান্ড কিল করি।’

তিনি বলেন, ‘প্রকল্প বাস্তবায়নে জড়িত ছিলাম প্রায় ১০ বছর। আমার অনেক ব্যক্তিগত আপত্তি আছে। যেহেতু আমি টিম ওয়ার্কার, ক্যাপ্টেন, আমার দল এ জন্য আমার মানা উচিত, না হলে আমি আছি কেন দলের সঙ্গে। রাজনৈতিকভাবে বৃহত্তর অর্থে আমি তার সঙ্গে আছি। কিন্তু এখানে ফাঁকফোকরে কোনো কোনো জায়গায় আমার ভিন্নমত অবশ্যই আছে। এমন প্রকল্প আমার হাত দিয়ে গেছে বা যাচ্ছে যেগুলোর সঙ্গে আমি মনেপ্রাণে একমত নই।’

এম এ মান্নান আরও বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি আমাদের কষ্ট দেয়। কিন্তু আমার কমন সেন্সে বলছি, আমাদের মূল্যস্ফীতি লতানো (ক্রিপিং), পায়ে পায়ে এগুচ্ছে। এটা যদি দ্রুতগতির হতো, বল্গাহীন হতো ছোবল কত বেশি হতো? ছোবল কত বেশি হতো তা অচিন্তনীয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার মনে হয় প্রবৃদ্ধির একটা বাইপ্রোডাক্ট এই মূল্যস্ফীতি। একটাকে ছেড়ে আরেকটা করা যাবে না। প্রবৃদ্ধি না করলে আমাদের জীবনযাত্রা নিচে নেমে আসবে। মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে যাবে, কিন্তু আমাদের সবকিছু নেমে আসবে। এই ঝুঁকি আমাদের নিতে হবে। বড় অর্থনীতির দেশগুলো এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেছে।’

অনুষ্ঠানে দেশের অন্যতম শিল্পোদ্যোক্তা এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী বলেন, দেশের অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানে ঘুরেফিরে সবাই সুশাসনের কথা বলছেন। দেশে সুশাসন ঠিক হলে ৯০ শতাংশ সমস্যা ঠিক হবে। তিনি বলেন, আমাদের অনেক জায়গায় লিকেজ (ত্রুটি) আছে। ব্যয়ের ক্ষেত্রে যেমন লিকেজ আছে, তেমনি আয়ের ক্ষেত্রেও লিকেজ আছে।

সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, আমার রাজনৈতিক জীবনে বর্তমান সময়ের মতো এতটা অর্থনীতিতে দুর্বলতর পজিশন কখনো দেখিনি। এখন আইএমএফ এসে বলছে। যদিও আমরা আরও কয়েক বছর আগে থেকে এসব সমস্যা সমাধানের কথা বলে এসেছি। এখন অনেক শক্ত থাকা দরকার ছিল। কারণ অনেক সমন্বয় করতে হবে। 

১৫ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ার সমালোচনা করে তিনি বলেন, চুরি-ডাকাতি-মার্ডার করে আয় করা টাকা অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে না। তারা কি চুরির টাকা দেশের উন্নয়নে আনবে? আমি যদি কর না দিয়ে পরের বছর ১৫ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ পাই, তাহলে আমি কেন কর দেব। এই বোকামি কেন করব? সত্যিকারের আয় কেন দেখাব। আনিসুল ইসলাম বলেন, আমরা শুনছি কানাডা, মালয়েশিয়াসহ অন্যান্য দেশে কারও কারও বাড়ি আছে, সেই লিস্ট করা হয়। তাদের চিহ্নিত করে ধরা হচ্ছে না কেন?

তিনি বলেন, ব্যাংক খাতে ২০১৮ সালে ছিল ৫৮ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ। আর সব হিসাব করলে সেটি সাড়ে চার লাখ কোটি টাকা। এই টাকা উদ্ধারে তেমন কিছুই করা হচ্ছে না। অথচ যারা পরিশোধ করছে, করার চেষ্টা করছে তাদেরই ধরা হচ্ছে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, এ দেশের পরিশ্রমী উদ্যোক্তারা সোনার ডিম পাড়া হাঁস। কিন্তু এসব হাঁস জবাই করে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। ব্যবসার পরিবেশ তাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু লাল ফিতার দৌরাত্ম্য এখনো প্রবলভাবে বিদ্যমান। তাই দেশের সম্ভাবনা এখন রাজনৈতিক অর্থনীতির লৌহ ত্রিভুজে আটকে আছে। এ ত্রিভুজ ভাঙতে গেলে বাজেটের আলোচনায় এসব সমস্যা তুলে ধরতে হবে।

এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘ত্রিভুজের অন্যতম উপাদান জবাবদিহির অভাব। এটা শুধু গণতান্ত্রিক সমস্যা নয়, অর্থনীতিকে বেগবান করার ক্ষেত্রেও এটা একটা প্রতিবন্ধকতা। দ্বিতীয়ত কৌশলগত চিন্তার অদক্ষতা। প্রবৃদ্ধির নতুন চালক তৈরির ক্ষেত্রে অদক্ষতা চরমভাবে বিদ্যমান। তৃতীয়ত, দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এখন বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।’

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, ‘মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো ও বৈদেশিক মুদ্রা অবনমন সেটা ধরে রাখার চেষ্টা, এই দুই ব্যাপারে বাজেটে তেমন একটা পদক্ষেপ দেখিনি। বাজেটে অর্থনৈতিক সূচকগুলোতে যেসব লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে, এসব লক্ষ্যমাত্রা বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বাস্তবায়নযোগ্য নয়।’