সৌরবিদ্যুতের যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর। এই উদ্যোগকে গ্রিন পোর্ট হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরকে এগিয়ে নেওয়ার প্রাথমিক ধাপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। আর এর মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালনায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ও বন্দরের স্বাভাবিক রুটিন কাজের জন্য ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৮ দশমিক ৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। যদিও বন্দর কর্তৃপক্ষের বিদ্যুতের চাহিদা দিনে সর্বনিম্ন ৭ থেকে সর্বোচ্চ ১৩ মেগাওয়াট পর্যন্ত। আর এই চাহিদার মধ্যে কোনো ধরনের বিনিয়োগ ছাড়াই সোলার প্যানেলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ খাতে প্রতিষ্ঠানটির বছরে প্রায় ৫ কোটি টাকা সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
তবে এতে বন্দরের চেয়ে সাশ্রয় হবে দেশের মন্তব্য করে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড চট্টগ্রাম অঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য তেল বা গ্যাস আমদানি করতে হয়। এতে দেশের টাকা বাইরে চলে যায়। সৌরশক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা গেলে দেশের টাকা সাশ্রয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটিকেও আমাদের থেকে বিদ্যুৎ কিনতে হবে না। এতে তাদেরও আর্থিক সাশ্রয় হবে। আবার তারা যদি বেশি উৎপাদন করে তাহলে নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে পিডিবির কাছে বিক্রিও করতে পারবে।
এখন প্রশ্ন চট্টগ্রাম বন্দরের কোথায় কীভাবে এই সৌরবিদ্যুৎ প্ল্যান্ট স্থাপন করা হবে? এ প্রসঙ্গে বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ও সংস্থার মুখপাত্র সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, বন্দরের ইয়ার্ডের ভেতরে ও ইয়ার্ডের বাইরে বন্দরের বিভিন্ন স্থাপনার ওপর সোলার প্যানেল বসাবে গ্রিনার গার্মেন্টস ইনিশিয়েটিভ লিমিটেড (সিজিআই) নামে একটি প্রতিষ্ঠান। এজন্য বন্দর কর্তৃপক্ষকে কোনো বিনিয়োগ করতে হবে না জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি নিজের খরচেই সোলার প্যানেল বসাবে ও মেইনটেন্যান্স করবে। বন্দর কর্তৃপক্ষ এই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ প্রায় ১০ টাকা দরে কিনবে। যেখানে বর্তমানে পিডিবি থেকে কিনতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পড়ে প্রায় ১৩ টাকা। এতে সংস্থাটির প্রতি ইউনিটে সাশ্রয় হবে প্রায় ৩ টাকা।
এখন প্রশ্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটি নিজ অর্থে কেন বিনিয়োগ করছে? এতে প্রতিষ্ঠানটির কী লাভ? এই প্রসঙ্গে গ্রিনার গার্মেন্টস ইনিশিয়েটিভ লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ নূরে আলম বলেন, নিজেদের বিনিয়োগে সোলার প্যানেল স্থাপন করে উভয়পক্ষের সঙ্গে চুক্তির দর অনুযায়ী (ইউনিটপ্রতি) বিদ্যুৎ বিক্রি আমাদের প্রতিষ্ঠানের বৈশিষ্ট্য। বর্তমানে আমরা ২৮টি প্রকল্পের মাধ্যমে ২৫ মেগাওয়াট (প্রতি ঘণ্টায়) বিদ্যুৎ উৎপাদন করছি। পাইপলাইনে রয়েছে আরও ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।
তিনি বলেন, যেহেতু বিদ্যুৎ উৎপাদন করে বিক্রি করছি তাহলে তো বিজনেস ডিলই হচ্ছে। তবে বিনিয়োগের নিশ্চয়তা এবং তা থেকে লভ্যাংশ তুলে আনতে ২০ বছর প্রয়োজন। এজন্য এর কম সময়ে কারও সঙ্গে আমরা চুক্তি করিনি।
৮ লাখ বর্গফুট এলাকায় স্থাপন হবে সোলার প্যানেল: দিনে প্রতি ঘণ্টায় ৮ দশমিক ৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কত বর্গফুট এলাকায় সোলার প্যানেল বসানো হবে? এই প্রশ্নের উত্তরে গ্রিনার গার্মেন্টস ইনিশিয়েটিভ লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী বলেন, পুরো বন্দর এলাকার বিভিন্ন ভবনের ছাদ ও স্থাপনা দেখে ইতিমধ্যে ৮ লাখ বর্গফুট এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে। এই জায়গার মধ্যে সোলার প্যানেল বসিয়ে প্রতি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৮ দশমিক ৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
সূর্যের আলোর তীব্রতার ভিত্তিতে দিনে গড়ে ৩ ঘণ্টা ২০ মিনিট বা সর্বোচ্চ ৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, গড়ে ৪ ঘণ্টা উৎপাদন করা গেলে দিনে প্রায় ৩৩ দশমিক ৬৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব।
আগামী জুলাইয়ে উৎপাদনে আসছে সৌরবিদ্যুৎ : গত ১৯ অক্টোবর বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ২০ বছর মেয়াদি চুক্তি হলেও এখনই পুরোদমে উৎপাদনে আসতে পারবে না প্রতিষ্ঠানটি। পুরোদমে উৎপাদনে আসতে ৩ বছর সময় লেগে যাবে জানিয়ে সিজিআই কর্তৃপক্ষ জানায়, এ সময়ের মধ্যে পর্যায়ক্রমে সব স্থানে সোলার প্যানেল বসানোর কাজ করবে প্রতিষ্ঠানটি। তবে গ্রিনার গার্মেন্টস ইনিশিয়েটিভ লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ নূরে আলম বলেন, আগামী ফেব্রুয়ারিতেই সোলার প্যানেল স্থাপনের ইকুইপমেন্ট আমদানি এবং স্থাপনের কাজ হবে। তাতে করে আগামী জুলাইয়ে উৎপাদনে আসা সম্ভব জানিয়ে তিনি বলেন, এর পর পর্যায়ক্রমে উৎপাদন বাড়ানোর কাজ চলবে।
রাতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করা যাবে কি না এই প্রশ্নের উত্তরে বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, ব্যাটারি যুক্ত না করায় সৌর শক্তির মাধ্যমে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরাসরি লাইনে যাবে। ফলে সূর্যের আলো যতক্ষণ ততক্ষণই এই বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে।
পরবর্তী সময়ে ব্যাটারি যুক্ত করার সুযোগ থাকবে কি না এ প্রসঙ্গে গ্রিনার গার্মেন্টস ইনিশিয়েটিভ লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী বলেন, সে সুযোগ রয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ যদি ব্যাটারি যুক্ত করে উৎপাদিত বিদ্যুৎ রাতেও ব্যবহার করতে চান তাহলে তাও করে দিতে পারব।
বিশেষজ্ঞ বক্তব্য : চট্টগ্রাম বন্দরের কার্বন নিঃসরণ নিয়ে ২০২২-২৩ সালে জাতিসংঘের পরিবেশ তহবিলের অধীনে গবেষণা পরিচালনা করেছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল আমীন। তিনি বলেন, বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরিত গবেষণা প্রতিবেদনে কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। বন্দর কর্তৃপক্ষ সৌরশক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পদক্ষেপ নেওয়ায় ধরে নেওয়া যায়, রিপোর্ট বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে।
গবেষণা প্রতিবেদনে গ্রিন পোর্ট বাস্তবায়নে বন্দরে যেসব জাহাজ ভেড়ে সেসব জাহাজে পর্যায়ক্রমে সৌরবিদ্যুৎ সরবরাহ এবং বন্দরে ব্যবহৃত সব ইকুইপমেন্টে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার নিশ্চিতের কথা বলা হয়েছিল উল্লেখ করে ড. মোহাম্মদ আল আমীন বলেন, এ ছাড়া ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের পরিবর্তে লরির ব্যবহার বাড়ালে কার্বন নিঃসরণ কমে আসবে।
উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজে কনটেইনার উঠানো-নামানোর পাশাপাশি কনটেইনার পরিবহনে ১৮টি গ্যান্ট্রি ক্রেনসহ ১০ ধরনের ১৬৯টি বিশেষায়িত ক্রেন দিন-রাত কাজ করে। একই সঙ্গে বন্দরের জেটি এবং ইয়ার্ডে সচল রয়েছে আরও ২৭২ ধরনের যন্ত্র। রয়েছে ৩০ হাজারের বেশি নানা ধরনের যানবাহন। এর বাইরে রয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষের অফিস, হাসপাতাল, স্কুল-কলেজসহ আবাসিক কলোনি। এতে করে বিদ্যুতের চাহিদা বন্দরের অফপিক আওয়ারে ৭ মেগাওয়াট থেকে পিক আওয়ারে সর্বোচ্চ ১৩ মেগাওয়াট পর্যন্ত পৌঁছে।