আফ্রিকান দেশগুলোতে যে রীতিতে ঈদুল আজহা উদযাপিত হয়

দেশ কিংবা বিদেশ, ঈদুল আজহার বড় অংশ জুড়েই থাকে পশু কোরবানির আচার। ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা ঈদের নামাজের পর পশু কোরবানির মধ্য দিয়ে পালন করেন এই ধর্মীয় উৎসবটি। বিশ্বের নানা প্রান্তের কোটি কোটি মুসলিম কোরবানির ঈদ উদযাপন করলেও দেশভেদে কোরবানির পদ্ধতিতে ভিন্নতা রয়েছে।

আফ্রিকা মহাদেশে প্রায় ৪৪৬ মিলিয়ন মুসলিম ধর্মের লোক বাস করেন যা মহাদেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক। এদের মধ্যে বেশিরভাগ মুসলমান উত্তর, পশ্চিম ও পূর্ব আফ্রিকায় বসবাস করেন। আর তাই ঈদ এলে এসব মুসলিমদের মাঝে অন্যরকম প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যায়। এই মহাদেশের বিভিন্ন দেশে ঈদ উদযাপনের চিত্র প্রায় একই রকম।  

নাইজেরিয়া

১১ শতকের দিকে নাইজেরিয়াতে ইসলামের প্রবর্তন ঘটে। নাইজেরিয়ার মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক মুসলিম ধর্মের অনুসারী। অন্যান্য দেশের মতো এরাও ঈদুল আজহা উদযাপন করে থাকেন। নাইজেরিয়ায় ঈদুল আজহাকে অনেকে হাউসা বাব্বর সাল্লায় নামেও ডাকেন। 
অন্যান্য দেশের মতো এদেশের মুসলিম ধর্মাবলম্বীরা নতুন পোশাক পরিধান করে ঈদগাহে গিয়ে নামাজ আদায় করেন। 

নামাজ আদায়ের পর ইমাম সাধারণত একটি পুরুষ ভেড়া কোরবানি করেন। এই ভেড়া ঈদের নামাজ শুরুর সময় থেকেই ঈদগাহের মাঠে এনে রাখা হয়। এরপর প্রত্যেকে যে যার বাড়ি গিয়ে নিজেদের কুরবানির পশু ভেড়া অথবা ছাগল জবাই করেন। তবে সামর্থ্যবানরা গরু অথবা উট কোরবানি দিয়ে থাকেন। এরপর সেই মাংস আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবদের মাঝে ভাগাভাগি করে নেন।

ঘানা

ঘানায় খ্রিস্টধর্ম সবচেয়ে বড় ধর্ম। তবে এখানকার জনসংখ্যার ১৯.৯ শতাংশ লোক ইসলাম ধর্ম পালন করেন। জনসংখ্যার দিক থেকে কম হলেও মুসলিমরা দেশের প্রধান বিষয়গুলোতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ঈদুল আজহা দেশের মুসলমানদের জন্য একটি বিশেষ উৎসব। ঈদের এই উৎসব তিনদিন যাবত পালন করা হয়। 

তবে মজার বিষয় হলো, উৎসবটি শুধু মুসলমান নয়; খ্রিস্টানদের কাছেও অনেক প্রত্যাশার। কারণ উভয় ধর্মের লোকজনই ঈদ উৎসবের খাবার উপভোগ করেন এবং উদযাপনে অংশ নেন। এছাড়া  সারা বিশ্বের মুসলমানদের মতো, ঘানাবাসীরাও ঈদের নামাজে অংশ নেওয়া, খুতবা শোনা, পশু কোরবানি করা, দরিদ্রদের সাহায্য করা এবং খাবার ভাগ করে নেওয়ার মতো বিষয়গুলো পালন করেন। 

মাদাগাস্কার

দ্বীপরাষ্ট্র মাদাগাস্কারে ইসলাম একটি সংখ্যালঘু ধর্ম। মাদাগাস্কারের মুসলমানরা বেশিরভাগই উপকূলীয় এলাকায় বাস করেন। বিশ্বের সব জায়গার মতো ঈদুল আজহার দিনে তারাও ভালো পোশাক পরে নামাজের জন্য মসজিদে যান।

নামাজ শেষে পশু কোরবানি করেন। মাদাগাস্কারে জেবু নামে একটি পশু অনেক বেশি পাওয়া যায়। এটি মাঝারি আকারের শিংওয়ালা এবং কুঁজযুক্ত গবাদি পশু; যার মাথা ও কান ছোট এবং রয়েছে মসৃণ পশম। মাদাগাস্কারের দ্বীপজুড়ে এই প্রাণীটি অনেক দেখা যায়। এই প্রাণীটি পারিবারিক আচার-অনুষ্ঠানে জবাই করা হয়। এছাড়া ঈদুল আজহাতেও এই পশু কোরবানি করা হয়। জবাইকৃত পশুর মাংস দরিদ্র ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া হয়।

এছাড়া ঈদে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ইসলামের ধর্মীয় জ্ঞান এবং বুদ্ধিমত্তা যাচাইয়ের জন্য কুরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। ঈদে মুসলমানরা মালাগাসি খাবার রান্না করেন, যার মধ্যে রয়েছে মাংস এবং শাকসবজি মিশ্রিত ভাত। সেইসাথে "গোদ্রোগোদ্রো" নামক মিষ্টি খাবার থাকে, যা সাধারণত চালের আটা, নারকেলের দুধ, চিনি, ভ্যানিলা, দারুচিনি, জায়ফল এবং তেলের সংমিশ্রণে তৈরি একটি ঐতিহ্যবাহী কেক।

সেনেগাল

পশ্চিম আফ্রিকার দেশ সেনেগালে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯৭ শতাংশ মুসলিম। এখানে ঈদুল আজহা স্থানীয়ভাবে তাবাস্কি নামে পরিচিত। এই তাবাস্কি উৎসব মুসলিম পরিবার এবং সম্প্রদায়কে একত্রিত করে। ঈদুল আজহায় প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই একটি ভেড়া বা গরু জবাই করা হয়। মাংসের কিছু অংশ গরীবদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। 

তবে "অপারেশন তাবাস্কি" নামক কর্মসূচির আওতায় যারা ভেড়া কেনার সামর্থ্য রাখে না তাদের সরকার সাহায্য করে থাকে। তাবাস্কি সকালের প্রার্থনার মাধ্যমে শুরু হয়। কোরবানিতে ভেড়া ছাড়াও মূল খাবারের পরিপূরক হিসেবে বিভিন্ন শাকসবজি, সস এবং ভাতের ব্যবস্থা করা হয়।