দেশ জুড়ে চলছে পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটি। দেশের সর্বত্র বিরাজ করছে ঈদের আনন্দ। তবে এই আনন্দের মধ্যেও নিরানন্দের ঈদ কাটছে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে ভর্তি রোগী ও তাদের স্বজনরা। পরিবারের সদস্য হাসপাতালে অসুস্থ হয়ে ভর্তি থাকায় হাসপাতালে থাকা রোগী ও তার সঙ্গে থাকা মানুষের যেমন ঈদের আনন্দ নেই তেমনি আনন্দ নেই বাসার অন্য সদস্যদের। তাদের চোখেমুখে রাজ্যের হতাশা।
আজ মঙ্গলবার ঈদের দ্বিতীয় দিনে চলমান সরকারি ছুটিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) কার্ডিওলজি বিভাগের ৪র্থ তলার একটি ওয়ার্ডের সামনে বিষণ্ন মনে দাঁড়িয়ে আছেন পাবনার ওমর সিদ্দিকী। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, জীবনে প্রথমবার হাসপাতালে ঈদ কাটলাম। এক সপ্তাহ আগে পাবনা মেডিকেলে আব্বাকে নিয়ে যাই। চিকিৎসকরা জরুরি ভিত্তিতে ঢাকায় নিয়ে আসার পরামর্শ দেন। এরপর তাকে নিয়ে এই হাসপাতালে আছি। গতকাল ঈদের দিন গেল অথচ আমরা ৫ ভাই আব্বার সঙ্গে হাসপাতালে ছিলাম। আম্মাও সেই যে হাসপাতালে আসলেন আর বাড়ি যাননি। আমাদের ঈদ বলতে কিছুই ছিল না। কেবল ঈদের জামাত পড়ছি।
তারা হাসপাতালে থাকার কারণে পরিবারের কেউ ঈদের আনন্দ পায়নি জানিয়ে ওমর সিদ্দিকী বলেন, বাড়িতে আমার স্ত্রী ও মেয়ে আছে। অন্য ভাইদের ছেলে মেয়েও আছে। সকালে সবার সঙ্গে আমরা হাসপাতালে বসে ভিডিও কলে কথা বললাম। এবার ছেলেমেয়েদের নতুন জামা কিনে দেওয়া হয়নি। আব্বা হাসপাতালে থাকায় কোরবানিও দেওয়া হয়নি। সত্যি বলতে আমাদের পরিবারে ঈদ আসেনি এবার।
এটা কেবল ওমর সিদ্দিকীর পরিবারের গল্পই নয় হাসপাতালে সেবা নিতে আসা বেশিরভাগ রোগী ও তাদের স্বজনদের ঈদের আনন্দ নেই। পরিবারের এক সদস্য অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে থাকার প্রভাব পড়েছে অন্যদের মনে। তা ছাড়া প্রত্যেক রোগীর সঙ্গে এক বা একাধিক সদস্যকে থাকতে হয় ফলে দেখা যায় তাদের পুরো পরিবারে ঈদের আনন্দ থাকে না।
একই ওয়ার্ডে কথা হয় নারায়নগঞ্জের সাহানা বেগমের সঙ্গে। অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে শনিবার হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। শনিবার দুপুরে বাসায় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন তার স্বামী। এরপর নারায়নগঞ্জে এক চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেলে পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে দেখা যায় তার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। সেদিনই স্বামীকে নিয়ে বিএসএমএমইউতে আসেন তিনি। এরপর থেকে হাসপাতালেই দিন কাটছে তার।
সাহানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমার তো বাসায় কেউ নেই। একমাত্র ছেলে ফারুকও তার বাবার সঙ্গে হাসপাতালে। চিকিৎসকরা বলেছেন আমার স্বামীর সার্জারী করতে হবে। বৃহস্পতিবার সার্জারীর তারিখ দিয়েছে। স্বামী সন্তান নিয়ে হাসপাতালে এমন ঈদের কথা জীবনেও কল্পনা করিনি। ছেলেটা পুরোনো জামা পড়ে ঈদের জামাতে গেল। আর তিনি তো তাও পারলেন না। সেমাই ছাড়া তাদের ঈদের জামাতে কখনো পাঠিয়েছি এমন কখনো হয়নি।
এদিকে ঈদের ছুটিতে চিকিৎসা সেবা যেন নির্বিঘ্নে চলে সেই লক্ষ্যে কাজ করছে বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষ। মঙ্গলবার হাসপাতাল সরেজমিন ঘুরে দেখেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (অ্যাকাডেমিক) অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আতিকুর রহমান। তিনি চিকিৎসক-নার্সদের সঙ্গে কথা বলেন তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেন। এছাড়াও বিভিন্ন ব্লকে ঘুরে ঘুরে রোগীদের চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম পরিদর্শন করেন ও তাদের খোঁজখবর নিতে দেখা যায় অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আতিকুর রহমানকে।
তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা যারা চিকিৎসা পেশায় আছি তাদের প্রথম প্রায়োরিটি হচ্ছে রোগীদের সেবা। তাদের সেবায় যেনো কোনো ঘাটতি না হয় সে বিষয়ে আমরা তৎপর। আমাদের চিকিৎসক, নার্সসহ সংশ্লিষ্ট সবাই সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। রোগীদের সঙ্গে কথা বলেছি তারাও সেবা নিয়ে সন্তুষ্টি জানিয়েছেন।
বিএসএমএমইউ সূত্রে জানা যায়, ঈদুল আজহার ছুটির মাঝে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনডোর ও সাধারণ জরুরি বিভাগসহ বিভিন্ন জরুরি বিভাগের চিকিৎসা সেবা অব্যাহত রয়েছে।