স্বনির্মিত, সৎ এবং সৃজনশীল এক শিল্পোদ্যোক্তা

নতুন বাজেটে শিল্প খাতে সরকারি প্রযতœ এবং নীতি সহায়তা নিয়ে তুমুল তর্ক-বিতর্ক চলছে যখন, চারদিকে চোখ ধাঁধানো উন্নয়ন অবকাঠামো নিয়ে যখন আত্মতুষ্টির প্রচার এবং পজিটিভ বাংলাদেশের প্রশংসায় সবাই নিমগ্ন; তখন বেসরকারি খাতে স্বনির্মিত শিল্পোদ্যোক্তা, বাংলাদেশের নির্মাণশিল্পের পথিকৃৎ, সবসময় যিনি প্রীতিভাজন আচরণ, কঠোর পরিশ্রমী, কর্মনিষ্ঠা, সততা ও কর্মদক্ষতায় ছিলেন একজন ইনসান আল কামিল জনাব আবদুল মোনেম (১৯৩৭-২০২০)-এর কথা উচ্চারিত হওয়া বাঞ্ছনীয় নয় কি? যিনি বাংলাদেশে প্রথম প্রজন্মের সফল উদ্যোক্তা, সড়ক পরিবহন খাতে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব এবং আবদুল মোনেম শিল্প পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা। তার কাছে বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ এবং সফলতার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। তার মেধাবী পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন মুনশিয়ানায় দেশের অধিকাংশ বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। তার কাজের মান উচ্চ স্কেলে প্রশংসিত এবং সেসব অবকাঠামো নির্মাণে বিদেশি স্বনামধন্য কোম্পানি জয়েন্টভেঞ্চার ভিত্তিতে অংশ গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশে এম এ মোনেম লিমিটেড এমনই নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, যার সঙ্গে অধিকাংশ বিদেশি সংস্থা সানন্দে এবং সপ্রশংসিতভাবে অংশ নিয়েছে।

আবদুল মোনেমের জন্মস্থান ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। পঞ্চাশের দশকের শুরুর দিকে এসএসসি পাস করে  মোনেম যখন ঢাকায় আসেন, তখন তার হাতে ছিল গুটিকয়েক টাকা, যা দিয়ে চলাই ছিল দায়। অংশীদারত্বের ভিত্তিতে ঠিকাদার হিসেবে কাজ শুরু করা মোনেম পরে ১৯৫৬ সালে মাত্র ২০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে নিজের প্রতিষ্ঠান আবদুল মোনেম লিমিটেড গড়ে তোলেন। তিনি এই কোম্পানিকে বাংলাদেশের অবকাঠামো নির্মাণ শিল্পের সামনের কাতারে নিয়ে আসেন। তার নিজের নামে গড়া এএমএল কনস্ট্রাকশনস লিমিটেড হয়ে ওঠে দেশের অন্যতম শীর্ষ কনস্ট্রাকশনস ফার্ম। ৬০ বছরের বেশি সময় কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘মার্কেট লিডার’ হিসেবে বিবেচিত এএমএল কনস্ট্রাকশনসের দেশের সবচেয়ে বড় ও চ্যালেঞ্জিং ভৌত অবকাঠামো নির্মাণে ভূমিকা রয়েছে। সড়ক, সেতু, ফ্লাইওভারসহ দেশের বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ কাজে যুক্ত এএমএল কনস্ট্রাকশনস মেট্রোরেল প্রকল্প এবং পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পেও বিভিন্ন কাজে জড়িত। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে নির্মাণেও ভূমিকা রয়েছে এই প্রতিষ্ঠানের। নির্মাণ খাত ছাড়া চিনি পরিশোধনাগার, জ¦ালানি, ভৌত অবকাঠামো নির্মাণের সামগ্রী, ফার্মাসিউটিক্যাল, খাদ্য ও পানীয় খাতেও ব্যবসা রয়েছে মোনেম গ্রুপের। এসব প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে ১০ হাজারের বেশি মানুষ কর্মরত আছেন।

নির্মাণ খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকলেও মোনেম সাহেবের ব্যবসায়িক মতাদর্শ কখনো রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হয়নি বলে মন্তব্য ছিল মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রোকিয়া আফজাল রহমানের। তিনি বলেছিলেন, ‘ব্যবসা শুরু করার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতির অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বা বারবার ক্ষমতার পালাবদল আবদুল মোনেমের ব্যবসায়িক মতাদর্শকে প্রভাবিত করতে পারেনি। বাংলাদেশে অনেক ব্যবসায়ীই রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ব্যবসায়িক সুবিধা আদায় করে থাকেন। কিন্তু আবদুল মোনেম তার সততা দিয়ে বুঝিয়ে দিতেন যে, তিনি কোনো রাজনৈতিক চাপে প্রভাবিত হবেন না।’ যেই রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় থাকুক, আবদুল মোনেমের নৈতিক দৃঢ়তা ও ব্যবসায়িক সততার জন্য প্রত্যেক সরকার তাকে সম্মান দিয়েছে। তিনিও প্রতিটি সরকারের সময়েই ব্যবসা করে গেছেন। কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রভাবে আবদুল মোনেম তার ব্যবসার নীতির সঙ্গে আপস করেননি। আর তার এই চারিত্রিক দৃঢ়তাকে বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক চিন্তাধারা সম্মান করেছে। তিনি সৎভাবে ব্যবসা করে দেখিয়েছেন যে, ব্যবসা কতটা প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব। তিনি সবসময় কীভাবে মানুষের কর্মসংস্থান করা যায় সেই কথাই বলতেন।

২০০৮ সালে ডেইলি স্টার-ডিএইচএল বিজনেস অ্যাওয়ার্ড গ্রহণকালে তিনি বলেছিলেন যে, ‘আমাকে শুধু বিদ্যুৎ আর গ্যাস দিন আর কিছু লাগবে না, যা নির্মাণ করা লাগবে তা আমরা করে নিতে পারব।’ নিজের সততা ও কর্মদক্ষতার ওপর এতটাই আত্মবিশ্বাস ছিল তার। পণ্য উৎপাদন ও সেবা খাতের বিভিন্ন ক্ষেত্রে মোনেম গ্রুপের পদচারণা থাকলেও নির্মাণশিল্পে তাদের ভূমিকা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক খাতকে শক্তিশালী করার পেছনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। নির্মাণ খাতে তাদের প্রযুক্তিগত জ্ঞানের পাশাপাশি এই ব্যবসায় দীর্ঘদিন কাজ করায় আবদুল মোনেমের অভিজ্ঞতার কারণে এই শিল্পে মোনেম গ্রুপকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।  আবদুল মোনেমের সবচেয়ে বড় গুণ ছিল, তিনি অত্যন্ত সাহসী ছিলেন। যে কোনো নতুন ধরনের ব্যবসায় হাত দেওয়ার ঝোঁক ছিল তার।

ব্যবসায়ের পাশাপাশি তিনি সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে সমাজের বিপদগ্রস্ত ও অসহায় মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রদানের লক্ষ্যে গড়ে তোলেন আবদুল মোনেম ফাউন্ডেশন। ওই ফাউন্ডেশন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তার নিজ গ্রাম বিজেশ্বরে প্রায় ৫২ একর জমি দান করেন। যেখানে গড়ে তোলা হয়েছে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাসহ বেশ কয়েকটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী হয়েও খেলাধুলায় দারুণ আগ্রহী ছিলেন আবদুল মোনেম। বাংলাদেশে ফুটবলের জোয়ারের সময় ঢাকার মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন তিনি। ১৯৮৪ থেকে ১৯৯৪-৯৫ মৌসুম পর্যন্ত ঢাকার মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সভাপতি ছিলেন মোনেম। তার সময়ে ফুটবল লিগে ১৯৮৬, ১৯৮৭ ও ১৯৮৮ সালে হ্যাটট্রিক শিরোপা জেতে ঐতিহ্যবাহী ক্লাবটি।

এই সজ্জন ও সৃজনশীল উদ্যোক্তার সঙ্গে আমার পরিচয় বহু দিনের। তিনি আমাকে স্নেহ করতেন এবং একই সঙ্গে আমাকে যথাসম্মান প্রদর্শন করতেন। ২০০৭-০৮ সালে আমরা সেরা করদাতাদের সম্মাননা প্রদান প্রথা চালু করি। আমার স্বাক্ষরিত সনদপত্র আবদুল মোনেম বিজনেস ডিস্ট্রিক্টের ১৩ তলায় অবস্থিত তার অফিস কক্ষে এখনো রাখা আছে। তিনি তার কাজে আমাকে আমন্ত্রণ জানালে প্রথমে সেগুলো দেখাতেন। বলতেন আপনাদের এই স্বীকৃতিপত্র আমাকে উৎসাহিত ও অনুপ্রেরণা দেয়। আমি বলি আপনার মতো সজ্জন, স্বচ্ছ করদাতা ও পরিশ্রমী শিল্পোদ্যোক্তাকে সম্মানিত করতে পেরে আমরাই তো সম্মানিত হই। ব্যক্তি আবদুল মোমেন, তার শিল্প পরিবারের বিরুদ্ধে তার জীবনকালীন শুল্ককর ভ্যাট নিয়মিত ও শুল্ক পরিশোধের ব্যাপারে কখনো কোনো খটমট বাধানোর অভিযোগ ওঠেনি। তিনি শেষের দিকে দেখা হলেই আমাকে অনুরোধ করতেন আমি যেন তার প্রতিষ্ঠান এবং দুই পুত্রের ব্যবসায়িক কাজকর্মে স্বচ্ছতা এবং বিশেষ করে শুল্ককর পরিশোধের বিষয়ে সময়ে সময়ে পরামর্শ প্রদান করি। বাংলাদেশে এ ধরনের আত্মসচেতন ও নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রের কর রাজস্ব পরিশোধের ব্যাপারে এমন নিষ্ঠাবান ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি আমার কাছে বিশেষ ব্যতিক্রম বলে মনে হতো। আমি তার প্রতিষ্ঠানে সপ্তায় একদিন যেন বসি এমন ইচ্ছা ব্যক্ত করে আমাকে ‘উপদেষ্টা’ হিসেবে নিয়োগপত্রও পাঠিয়েছিলেন। ততদিনে আমি একে খান কোম্পানিতে উপদেষ্টা হিসেবে ছিলাম। একে খান অ্যান্ড কোম্পানি এবং আবদুল মোনেম লিমিটেড উভয় প্রতিষ্ঠান বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রয়াসে কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট হতে পারে বিধায় আমি খ-কালীন হিসেবেও তার প্রতিষ্ঠানে যেতে পারিনি। তবে তার জীবৎকাল পর্যন্ত আমার যাতায়াত তো ছিলই আবদুল মোনেম ডিস্ট্রিক্টে। সেসব এখন স্মৃতি।

বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির অন্যতম প্রতিষ্ঠান বারডেম এবং ইকরীর সামনের করিডর দীর্ঘদিন ব্যবহারে সেখানে গর্ত সৃষ্টি ও চলাচলে বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল গাড়ি এবং পথচারী রোগীদের যাতায়াতে। আমরা করিডর মেরামতের/সংস্কারের উদ্যোগ নিলাম। দরপত্র আহ্বান করতে গেলে অংশগ্রহণেচ্ছুরা জানালেন যেহেতু ব্যস্ত হাসপাতাল, রোগীদের আনা-নেওয়ায় যাতায়াতে কোনো ব্যাঘাত সৃষ্টি না হয় সে দিকে লক্ষ রেখে পার্ট পার্ট করে সংস্কারকর্ম সম্পাদনের ব্যবস্থা করতে হবে এবং এর জন্য ১০-১৫ দিন সময় লাগবে। ব্যয়ও কম নয়। আমি মোনেম সাহেবের পরামর্শ চাইলাম। তিনি ইঞ্জিনিয়ারকে পাঠিয়ে কাজটি দেখে আসতে বললেন। এরপর তার অফিস থেকে বলা হলো রাত দশটা থেকে ভোর চারটা পর্যন্ত পুরো করিডরটি তাদের কাজের জন্য খালি করে  দিতে । যেমন কথা তেমন কাজ । পরদিন ভোর ৬টায় আমরা দেখলাম পুরো চত্বর মানসম্মত রূপ নিয়েছে। তার নির্দেশনা, সংস্কারের উন্নত টেকনিক, ভারী মেশিনারিজ মোবালাইজ করে মাত্র ৬-৭ ঘণ্টায় আবদুল মোনেম লিমিটেডের কর্মীরা কাজটি করে দিলেন, তাও বিনা ব্যয়ে ডায়াবেটিক সমিতির প্রতি সৌজন্য হিসেবে। সমিতির ষাট বছর পূর্তি উপলক্ষে ‘বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি স্বাস্থ্যসেবায় ষাট বছর’ শিরোনামে আমি একটি পা-ুলিপি তৈরি করি। আবদুল মোনেম লিমিটেড বইটি ১০০০ কপি মুদ্রণের ব্যয়ভার অনুদান হিসেবে বহন করে। শর্ত এই বইয়ের বিক্রয়লব্ধ অর্থও বারডেমের রোগী কল্যাণে খরচ করতে হবে। ডায়াবেটিক সমিতির প্রতি তার এই বদান্যতার প্রেরণা আমি খুঁজে পাই পরে।

ডায়াবেটিক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা জাতীয় অধ্যাপক ডা. ইব্রাহিম এবং মোনেম সাহেবের পিতার মধ্যে ছিল বেশ সম্মান ও সমীহের সম্পর্ক, তাদের সেই  কলকাতা জীবনকালে ১৯৪৩-৪৫ সালের দিকে। সে সূত্র ধরেই একদিন তিনি তার পারিবারিক ইতিহাস বলার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। আমি সেটি লুফে নিই এবং তার বড় ছেলে আমাদের পরম স্নেহভাজন মাঈনুদ্দীন মোনেম একটা খাতায় রেকর্ড করার পদক্ষেপ নিলে, কর্মব্যস্ত মোমেন সাহেব যখন সময় পেতেন তিনি বলে যেতেন তার পিতা-মাতা এবং তার ছেলেবেলাকার কথা। সে সময় আমরা তার ঢাকা জীবনের প্রারম্ভকাল পর্যন্ত সময়ের কথা রেকর্ড করেছিলাম। তারপর করোনাকাল উপস্থিত হয় এবং ৮৩ বছর বয়সে তিনি আমাদের শোকের সাগরে ভাসিয়ে চলে যান পরপারে।

লেখক: সাবেক সচিব ও এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

mazid.muhammad@gmail.com