কুমিল্লা আদর্শ সদরের শালধর এলাকায় গোমতী নদীর চরে রাসেলস ভাইপার ভেবে মারা হয়েছে অজগর সাপ। গতকাল শনিবার সাপটিকে পিটিয়ে মারেন মো. শামীম নামের এক যুবক। সাপটিকে মারার পর ওই যুবক সাপের ছবি ও ভিডিও নিজের মোবাইল ফোনে ধারণ করে ফেসবুকে পোস্ট করেন। মুর্হুতের মধ্যে রাসেলস ভাইপার নামে তা এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু পড়ে জানা যায়, এটি রাসেলস ভাইপার নয়, অজগর সাপ।
এছাড়া গতকাল শনিবার পটুয়াখালীর বাউফলে রাসেলস ভাইপার ভেবে মেটে সাপসহ তার ১৭টি বাচ্চাও মেরে ফেলা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাপ দেখলেই মানুষ রাসেলস ভাইপার ভেবে হত্যা করছে। অনেক ক্ষেত্রে নির্বিষ সাপও হত্যা করা হচ্ছে। এভাবে সাপ নিধনে প্রকৃতির ভয়ানক ক্ষতি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে দেশজুড়ে রাসেলস ভাইপার সাপ নিয়ে ছড়িয়েছে আতঙ্ক। বিশেষ করে নদীতীরবর্তী কয়েকটি জেলায় সাপটির দেখা মিলছে। অনেক জায়গায় এই সাপের কামড়ে মৃত্যু ও হাসপাতালে ভর্তির খবরও জানা গেছে। তবে স্যোশাল মিডিয়ায় সাপটি বিস্তার নিয়ে নানা গুজব ছড়িয়ে পড়েছে। এতে দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে ভীতিকর পরিস্থিতি। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তোরণে সচেতনার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ফিরোজ জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাসেলস ভাইপার সাপটি আগে থেকেই আমাদের দেশে ছিল। এমন নয় যে নতুন করে আসছে। তবে সম্প্রতি এই সাপের বিস্তার হয়তো বেড়েছে। এর পেছনে সামগ্রিকভাবে দায়ী আমরাই। কারণ বন্যপ্রাণী দেখলেই আমরা হত্যা করি। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে বেজি, বাগডাশ, গন্ধগোকুল, বনবিড়ালের মতো প্রাণীকেও হত্যা করা হয়েছে। অথচ এই প্রাণীগুলো সাপ খায়। এদিকে শঙ্খচূড়, গোখরা, কেউটে রাসেলস ভাইপার খায়। কিন্তু এগুলোর সংখ্যা তুলনামূলক কমে যাওয়ায় এখন রাসেলস ভাইপার বাড়তে শুরু করেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখন নির্বিচারে সাপ হত্যার ঘটনা ঘটছে। যা সত্যিই দুঃখজনক ঘটনা। এমনিতেই বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে আমরা উদাসীন। তার ওপরে এভাবে প্রাণী হত্যার ঘটনা ঘটতে থাকলে প্রকৃতি তার ভারসাম্য হারাবে। এই অবস্থা থেকে বের হতে মানুষের মাঝে সচেতনতা বাড়াতে হবে। এখন থেকেই পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে হবে। নয়তো যেভাবে প্রাণী হত্যা চলছে, তাতে প্রকৃতি ধ্বংস হতে সময় লাগবে না।’
এদিকে রাসেলস ভাইপার নিয়ে উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতি দিয়েছে। তাতে সাপ মারাকে দণ্ডনীয় অপরাধ উল্লেখ করে এ থেকে বিরত থাকতে আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি বিবৃতিতে সাপের কামড় এড়াতে করণীয়, সাপের কামড়ের পর করণীয় এবং রাসেলস ভাইপারের প্রাদুর্ভাব কমাতে করণীয় বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ফরিদ আহসান ‘রাসেলস ভাইপারের পুনরাবির্ভাব ও মানুষের ঝুঁকি’ নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি বলেন, ‘বরেন্দ্র অঞ্চলগুলোতে আগে থেকেই রাসেলস ভাইবার ছিল। কিন্তু সম্প্রতি এই সাপের বিস্তার বাড়ার কারণ হচ্ছে, বরেন্দ্র অঞ্চলের জমিগুলোতে আগে একবার ফসল হত। কিন্তু সেই জমিগুলোতে এখন দুবার থেকে তিনবার ফসল হয়। আর জমিতে ফসল থাকলেই ইঁদুরও থাকে সাপও থাকে। যেহেতু রাসেলস ভাইপারের প্রধান খাদ্য ইঁদুর, তাই ইঁদুর খেয়ে এই সাপ তাদের বিস্তার বাড়িয়েছে। এছাড়াও ভারত থেকে কচুরিপানায় ভর করে পদ্মা নদী হয়ে এই সাপ আমাদের বরেন্দ্র অঞ্চলে এসেছে। যা এখন অনেক জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সাপ পেলেই যে মেরে ফেলা হচ্ছে, এটি খুব ভয়ের খবর। এই সাপ শুষ্ক জায়গায় থাকে। তাই বন্যা ও বৃষ্টির জন্য সাপটি শুকনা জায়গা খুঁজে খুঁজে উঠছে। এই সাপের কামড়ে দ্রুত রক্ত জমাট বেঁধে যায়, ফুসফুসের ওপর প্রভাব পড়ে। তাই যে সাপেই কাটুক, রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।’
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ও টক্সিকোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশ সভাপতি ডা. মো. আবুল ফয়েজ ডিব ইকোলজি অ্যান্ড স্নেক কনজারভেশন ফাউন্ডেশনের সেমিনারে বলেন, ‘আমরা বলি যে সাপই হোক আপনারা হত্যা করবেন না। কারণ সাপ হত্যা আইনত দন্ডণীয় অপরাধ। সাপ মানুষের অনেক উপকার করে। রাসেলস ভাইপারসহ যে কোন সাপ কামড়ালে আপনারা সরাসরি নিকটস্থ হাসপাতালে যাবেন। কখনই ওঝার কাছে যাবেন না।’