আইনের ঔপনিবেশিক শাসন

সভ্যতার সূচনা থেকেই আইন পৃথিবীর প্রতিটি গোষ্ঠীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আইন কোনো স্থবির বিষয় নয়, বরং প্রচন্ড মাত্রায় চলমান ও পরিবর্তনশীল। প্রয়োজনের খাতিরে আইনের ধারা সর্বদা গতিশীল থাকে। আর আইন নাগরিকের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ হলেও মাঝে মাঝে তা শোষণের হাতিয়ারও হয়ে ওঠে। যেমন, ঔপনিবেশিক শাসকরা আইনকে ব্যবহার করেন প্রজাদের নিপীড়নে আর সেই উদ্দেশ্যেই আইনের ধারা রচিত হয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পার হলেও কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আইনের ধারা অত্যন্ত সেকেলে শুধু নয় বরং ঔপনিবেশিক সময়কে ধারণ করে।

বাংলাদেশ কোড, লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগ এবং আইন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে আইন আছে ১ হাজার ২০৭টি। কিন্তু এত আইন থাকার পরও মানুষের সত্যিকারের সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন আছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, যত আইন আছে অনেক ক্ষেত্রে মানুষের কল্যাণে প্রয়োগ নেই। অনেক ক্ষেত্রেই আইন যত না কল্যাণমূলক তারচেয়ে বেশি শোষণমূলক। এসব আইনে ঔপনিবেশিক শাসনামলে প্রণীত ফৌজদারি অপরাধের বিচারসংক্রান্ত ফৌজদারি কার্যবিধি, শাস্তিসংক্রান্ত দ-বিধি, দেওয়ানি কার্যবিধি, সাক্ষ্য আইনের মতো অপরিহার্য আইন যেমন আছে, তেমনি কিছু আইন আছে কাগজে-কলমে আর সংখ্যায়, যেসবের প্রায়োগিকতা এখন নেই। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, খাল খনন ও এর রক্ষণাবেক্ষণে ১৬০ বছর আগে ‘দ্য ক্যানালস অ্যাক্ট, ১৮৬৪’ নামে একটি আইন করেছিল ব্রিটিশ সরকার। নৌযান, নদী ও খালের সুরক্ষায় আইন থাকায় বাংলাদেশে এখন ব্রিটিশ আমলের আইনটি অচল, অপ্রয়োজনীয়। তেমনি এখনো প্রণীত আছে ‘দ্য হুইলস অ্যান্ড ইনটেসটিসি রেজল্যুশন, ১৭৯৯’ নামের অচল হয়ে পড়া আইন।

ঔপনিবেশিক সময়ে ব্রিটিশদের করা ২১৭টি আইন এবং পাকিস্তান আমলের ১৪০টি আইন এখনো বলবৎ আছে, যাদের বেশিরভাগেরই প্রয়োজনীয়তা আছে কি না এই নিয়ে পর্যালোচনা জরুরি। ফৌজদারি আইনবিদদের মতে, বাংলাদেশের আইনগুলোর কাঠামোতে সমস্যা নেই। তবে এগুলো সংশোধনমূলক নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে নিপীড়নমূলক। আটক, গ্রেপ্তার, রিমান্ড কিংবা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত করে এমন নিবর্তনমূলক আইনও আছে। আইন না মানা এবং আইনের প্রয়োগের ঘাটতির কারণে সমঅধিকার, ন্যায়বিচার, আইনের শাসন ও সাম্য স্থাপনে এসবের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে প্রায়ই। স্বাধীনতার পরেও আইন করার হার কমেনি। এ বছরের মে মাস পর্যন্ত ৮৫১টি আইন হয়েছে।  সবচেয়ে বেশি আইন পাস হয়েছে ২০২৩-এ, ৬৬টি, যা সদ্য স্বাধীন দেশে ১৯৭২ সালে হওয়া ৬৫টি আইনের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। গত পাঁচ বছরে আইন প্রণয়নের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

আইন অপ্রয়োজনীয় এবং সেকেলে হয়ে গেলে বাতিল করাই বিধান। অথচ বাংলাদেশে এই নিয়ে নজর নেই বললেই চলে। আইন কমিশনের সদস্য (হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি) এটিএম ফজলে কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ প্রক্রিয়া নিয়ে সরকারের আলাদা বাজেট নেই। তাগিদও নেই। কমিশনের কাজ সুপারিশ করা। সরকারের নির্দেশনা পেলে আরও কিছু পুরনো আইন বাতিলে কাজ করার সুযোগ ছিল। কিন্তু হয়নি। ফলে অচল এ আইনগুলো এখনো কাগজে-কলমে-সংখ্যায় রয়ে গেছে।’

একদিকে যেমন অপ্রয়োজনীয় আইন বাতিলের উদ্যাগ নেই, অন্যদিকে অতি গুরুত্বপূর্ণ আইন যেমন উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগ, সাক্ষী ও সংখ্যালঘু সুরক্ষা এবং বৈষম্য-বিরোধ রোধের আইন এখনো হয়নি। সংবিধানের আলোকে সব ধরনের বৈষম্য-বিরোধ রোধে দুই বছরের বেশি সময় আগে জাতীয় সংসদে ‘বৈষম্য বিরোধী বিল-২০২২’ উত্থাপন করা হলেও সেটি এখনো আইন হয়নি। জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও ব্লাস্টের ট্রাস্টি অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ব্রিটিশরা আইন করত শোষণ, শাসন, কর্র্তৃত্ব বজায় রাখার জন্য আর সাজা দেওয়ার জন্য। তাদের চিন্তাভাবনাই আমরা ধারণ ও বহন করে চলেছি। সে মানসিকতা থেকে আমরা বের হতে পারিনি।’