বিআরটিএ'র তথ্য অনুযায়ী রাজধানীতে বেসরকারিভাবে চার হাজারের বেশি বাস চলাচল করে। এর বাইরে বিআরটিসির বেশ কিছু বাস সড়কে সাধারণ যাত্রীদের সেবা দিয়ে থাকে। সিটিতে চলা বাসগুলোতে নারীদের জন্য মাত্র ৯টি সিট বরাদ্দ থাকে। তবে অধিকাংশ সময় সেসব সিটে বসে থাকেন পুরুষ যাত্রী। ২০১৮ সালে দোলনচাঁপা নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নারীদের জন্য ৪টি বাস নামায় সড়কে। কিন্তু সেটি ২০২২ সালে ২৩ অক্টোবরে বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে বিআরটিসির বাস ছাড়া নারীদের জন্য সড়কে আর কোনও বাস নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৯৮ সালে বিআরটিসির মহিলা বাস সার্ভিস চালু হয়। ২০০১ সালে তা ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় সম্প্রসারণ করা হয়। ২০০৯ সালে আবার এ সেবাকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেয় সরকার। সর্বশেষ ২০১৮ সালে বিআরটিসির পাশাপাশি পরিবহন সংস্থা দোলনচাঁপা যাত্রা শুরু করলেও সেটি বন্ধ হয়ে যায়।
আরও জানা যায়, সড়কে প্রতিনিয়ত নারীদের যাতায়াতে হিমশিম খেতে হয়। বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক পরিচালিত ‘নারীর জন্য যৌন হয়রানি ও দুর্ঘটনামুক্ত সড়ক’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের গণপরিবহনে যাতায়াতের সময় ৯৪ শতাংশ নারী মৌখিক, শারীরিক বা অন্য কোনোভাবে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। সেই সঙ্গে বাসের হেলপাররা নারী যাত্রীদের বাসে উঠতে বাধা প্রয়োগ করে মাঝে মধ্যে। এতে করে নারী যাত্রীরা সড়কে বাসগুলোতে যাতায়াত করার সময় নানা সমস্যায় পড়েন।
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা মরিয়ম মীম দেশ রূপান্তরকে বলেন, শহরে নারীদের জন্য বাস এখনো চোখে পড়েনি। আর যেসব বাস আছে সেগুলোতে নারীদের জন্য যে ৯টি সিট বরাদ্দ থাকে, সেখানেও অনেক পুরুষ যাত্রীদের বসে থাকতে দেখা যায়। সেই সাথে রাত ৮টার পর অনেক গাড়িতে নারীদের উঠাতে চায় না বাসের হেলপাররা। এগুলো যেন দেখার কেউ নেই।
মিরপুরের বাসিন্দা ফাতেমা বেগম নামের এক নারী যাত্রী বলেন, এই রুটে নারীদের জন্য বিআরটিসির একটি বাস মাঝেমধ্যে দেখা যায়। তবে বেশি বাস না থাকায় বেশিরভাগ সময় ওঠা যায় না। সিটিতে যে বাসগুলো চলে সেগুলো নারী যাত্রীবান্ধব বাস হয়ে ওঠেনি। যার জন্য প্রতিনিয়ত বাসে চলাচলে আমাদের সমস্যায় পড়তে হয়। তাই সরকারের উচিত নারীদের জন্য সরকারি ও বেসরকারিভাবে আরো বাস নামানো।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচীব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী জানান, একটি আদর্শ শহরে নারীদের জন্য বাস থাকা খুবই দরকার। কিন্তু এত বড় শহরে নারীদের জন্য বাস নেই। কৌশলগত নানা সমস্যা সমাধান না করতে পারায় নারীদের জন্য বাস সড়কে টেকে না। অথচ নারী যাত্রী যারা আছে তাদের প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে বাসে চলাচল করতে হয়। বাসে চলাচল করতে গিয়ে হেনস্থার স্বীকার হয়ে।
বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. হাদিউজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, নারী বাসের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা না থাকায় সড়কে বন্ধ হয়ে যায় নারী বাস। আমাদের দেশে মাঝেমধ্যে কিছু ভালো উদ্যোগ নেওয়া হয়, কিন্তু সেগুলো টেকসই না হওয়ায় আলোর মুখ দেখে না। কিছুদিন চলার পর সেগুলো বন্ধ হয়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, নারীদের বাসগুলো কালার ভিত্তিক করা দরকার। যেন দূর থেকে সবাই চিনে সেটি নারী বাস। আর প্রথম দিক থেকে যাত্রী কম পেলেও যখন বাসের সংখ্যা বেড়ে যাবে বাসগুলো গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলো সবাই দেখতে পাবে। তখনই এর চাহিদা বাড়বে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) চেয়ারম্যান মো. তাজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের লোকসান হলেও ৯টির মতো নারী বাস সড়কে চলছে। কিন্তু যে বাসগুলো চলে সেগুলোতে যাত্রী পাওয়া যায় না। তবে যাত্রীদের চাহিদা থাকলে আরো বাস নামানো হবে বলে জানান তিনি।