ঈদুল আজহা ছুটি শেষে খুলেছে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। এতে ক্যাম্পাসে ফিরেছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। তবে ক্যাম্পাসগুলো খুললেও ক্লাসে ফিরতে পারেনি শিক্ষার্থীরা। কারণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সার্বজনীন পেনশনের ‘প্রত্যয়’ স্কিম বাতিলের দাবিতে অর্ধদিবস কর্মবিরতি পালন করছেন। এতে বিপাকে পড়েছেন শিক্ষার্থীরা।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের কর্মসূচি অনুয়ায়ী, আগামীকাল বৃহস্পতিবার সারা দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অর্ধদিবস কর্মসূচি পালন করবেন। দাবি আদায় না হলে আগামী ৩০ জুন পূর্ণদিবস কর্মবিরতির ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন তারা। এতেও সমস্যার সমাধান না হলে আগামী ১ জুলাই থেকে সর্বাত্মক কর্মবিরতি পালন করার ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষকরা। তখন ক্লাস-পরীক্ষার পাশাপাশি প্রশাসনিক ও অ্যাকাডেমিক সকল কাজ থেকে বিরত থাকবেন তারা।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের এমন কর্মসূচিতে আশঙ্কায় দিক কাটছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থীর। কারণ দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় এখনও করোনার ধকল কাটিয়ে উঠতে পারেনি। করোনায় দীর্ঘদিন ক্যাম্পাস বন্ধ থাকায় অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজট তৈরি হয়েছে। তা কাটিয়ে ওঠার আগেই শিক্ষকরা আন্দোলনে নেমেছেন। শিক্ষকদের এমন আন্দোলন সেশনজট বাড়িতে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছে শিক্ষার্থীরা।
একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আগামী জুলাই মাস থেকে প্রত্যেকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বর্ষের সেমিস্টার পরীক্ষা হওয়ার কথা। এছাড়াও গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার ভর্তি ও গুচ্ছের বাইরে থাকা বিশ্ববিদ্যাগুলোর ভর্তি পরীক্ষা কার্যক্রম শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু আগামী ৩০ তারিখের মধ্যে শিক্ষকদের দাবি আদায় না হলে তারা সর্বাত্মক কর্মসূচিতে যাবেন। এতে ওই পরীক্ষাগুলো হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। এতে সেশনজট বাড়বে বলে আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়াও শিক্ষার্থীরা ক্লাসে ফিরতে না পারলে তাদের মধ্যে হতাশা কাজ করতে পারে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আগামী ১ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৩-২৪ সেশনের শিক্ষার্থীদের ওরিয়েন্টশন ক্লাস হওয়ার কথা। ওই ক্লাসে অংশ নিতে ১ম বর্ষের অনেক শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে এসেছেন। তবে শিক্ষকদের চলমান আন্দোলনের কারণে পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে ওরিয়েন্টশন ক্লাস। আগামী ১৫ জুলাই ওই ক্লাস অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক সুলতান-উল-ইসলাম।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট সূত্রে জানা গেছে, আগামী জুলাই মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের, বিভাগের প্রায় ১৭টি ব্যাচের পরীক্ষা শুরু হবে। ওই পরীক্ষাগুলো জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে শুরু হওয়ার কথা। এছাড়াও চলমান আছে ১৬ টি ব্যাচের পরীক্ষা। এই পরীক্ষাগুলো শেষ হবে আগামী মাসে।
নাম প্রকাশ না করা শর্তে কলা অনুষদের এক শিক্ষার্থী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৮-১৯ সেশনের শিক্ষার্থী। নিয়মানুযায়ী ২০২২ সালে আমার স্নাতক ও ২০২৩ সালে স্নাতকোত্তর শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু করোনার কারণে আমরা সেশনজটে পড়েছি। সেই সেশনজট এখন কাটাতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।’
তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষকদের আন্দোলন দীর্ঘায়িত হলে সেশনজট আরও বাড়বে। এমনিতেই আমরা অনেক পিছিয়ে পড়েছি। তাই শিক্ষকদের কাছে দাবি, আপনারা ক্লাস-পরীক্ষা চালু রেখে আন্দোলন করুন। এতে অন্তত আমরা উপকৃত হবো।’
তবে এই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি হবে না বলে মন্তব্য করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি সাধারণ সম্পাদক ও মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ওমর ফারুক। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগামী এক তারিখ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সবকিছু একেবারে শাটডাউন। কোনো ক্লাস, পরীক্ষা অ্যাকাডেমিক কাজ কিছুই হবে না। এমনকি প্রশাসনকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, প্রশাসনিক কাজকর্ম, শিক্ষকদের প্রমশনসহ অন্য সবকিছু বাদ থাকবে। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের সিদ্ধান্ত একযোগে পালন করা হবে।’
শিক্ষকদের আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা ভোগান্তির শিকার হবেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা চাই না শিক্ষার্থীরা দুর্ভোগে পড়ুক। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যত নিয়ে আমরা চিন্তিত। এই আন্দোলনের পরে শিক্ষার্থীদের যে ক্ষতি হচ্ছে তা আমরা পুষিয়ে দেওয়া হবে। তাদের কোনো চিন্তা নেই। শিক্ষার্থীর ক্ষতি হোক সেটা কোনো শিক্ষকই চায় না। তাদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই আমরা আন্দোলনে যাচ্ছি।’
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়েও আগামী মাসে একাধিক বিভাগের পরীক্ষা আছে। কিন্তু সেই পরীক্ষা নিয়ে শঙ্কার মধ্যে আছেন শিক্ষার্থীরা। এমনিতেই বিশ্ববিদ্যালয়টিতে আগের তুলনায় বেড়েছে সেশনজট। একাধিক বিভাগে প্রায় একবছর থেকে দেড় বছরও সেশনজট রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে অনেক শিক্ষার্থীই হতাশা প্রকাশ করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন আমাদের ক্লাস ও পরীক্ষার নেওয়ার কথা। কিন্তু তা বাদ দিয়ে আমরা আমাদের আন্দোলনে থাকতে হয়। এই পরিস্থিতির জন্য আমরা দায়ী না। পরিস্থিতি আমাদের এই পর্যায়ে টেনে এনেছে। তবে শিক্ষার্থীদের কথা আমাদের মাথায় আছে।’
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের মহাসচিব অধ্যাপক ড. মো. নিজামুল হক ভূঁইয়া বলেন, ‘নিয়মতান্ত্রিকভাবে আমাদের দাবি নিয়ে আন্দোলন করে আসছি। কিন্তু এখনো কোনো ধরনের পদক্ষেপ দেখতে পাচ্ছি না। ঈদের আগে (ঈদুল আজহা) আমরা কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলাম, দাবি আদায় না হলে অর্ধদিবস করে ২৫,২৬ ও ২৭ তারিখ কর্মবিরতি পালন করব। ৩০ তারিখ পূর্ণ কর্মবিরতি পালন করব। তবে পরীক্ষা ও পরীক্ষাসংক্রান্ত কাজগুলো এর আওতার বাইরে থাকবে। আমরা ভেবেছিলাম, তত দিনে সরকারের পক্ষ থেকে একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসবে। কিন্তু এখনো কোনো ধরনের দৃশ্যমান কিছু দেখছি না। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলমান থাকবে। আগামী পহেলা জুলাই থেকে সর্বাত্মক কর্মবিরতি চলবে। কোনো শিক্ষক আর ক্লাস-পরীক্ষা নেবেন না।’
(প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন রাবি প্রতিনিধি)