পেনশন কেন বাধ্যতামূলক

সরকারি চাকরিজীবীদের এই প্রশ্নটা লোকজন প্রায়ই করেন। দেশের অধিকাংশ নাগরিক একটা সরকারি চাকরির জন্য নিবেদিত। কেন? চাকরি শেষে পেনশন পাওয়ার নিশ্চয়তা। পেনশনের টাকায় একজন সরকারি কর্মী শেষ বয়সে নিশ্চিতে, আরামে থাকে। হয়তো নগরে একটা ফ্ল্যাট কেনে, গ্রামে পুরনো বাড়িটা সংস্কার করে বাকি জীবনটা একটু আয়েশে কাটায়।

অনেক বছর আগে, গত শতকের শেষের দিকে হবে, বিশিষ্ট টিভিব্যক্তিত্ব ফজলে লোহানী একটা সিনেমা বানিয়েছিলেন। ছবিটার নাম ছিল পেনশন। ছবির প্রধান চরিত্র চাকরি শেষে পেনশনের টাকা তুলতে গেলে অফিসের সাহেব পিয়ন কেরানিরা কীভাবে উপরি চেয়ে বেচারার ফাইল গপিস করেছিল, তারই বাস্তব চিত্র ছিল। অনেক দিন আগের ছবি, অতটা মনে নেই। কিন্তু পেনশন নিয়ে টেনশনের যে গল্প ছিল পেনশন ছবিতে, আবার সেই টেনশনের পরিস্থিতি দেখতে পাচ্ছি বাংলাদেশে।

ঘটনা যতটা টেনশনের, তার চেয়েও বেশি রাজপথের মিছিল বা প্রতিবাদে পেনশন বিরোধিতার। পেনশন তো ভালো, দিন বা মাস শেষে পকেটে টাকা আসবে, তাহলে বিরোধিতা কেন? এবং বিরোধিতা কারা করছেন? বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের ক্লাসের পড়ানো বাদ দিয়ে ছাত্রদের পরীক্ষার খাতা ড্রয়ারে রেখে কেন রাজপথে?

এই প্রশ্নের উত্তরে যাওয়ার আগে, একটা উদাহরণ। অপারেশন করে রক্ত বের করার পরে যখন প্রশ্ন ওঠে, কেন অপারেশন, তখন ডাক্তার হাতে রক্ত নিয়েই সমস্যার সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করেন। পরিস্থিতি ততক্ষণে জটিল আকার ধারণ করে রোগীর। কারণ রোগী অপারেশ টেবিলে শুয়ে আছে। বাংলাদেশে কোনো ঘটনা সরকার ঘটালে আমলাদের ঘাড়ে রেখে বা আমলাদের পরামর্শে, অনেকটা রোগীকে টেবিলে শুইয়ে অর্ধেক আহত করে পরিস্থিতি রক্তাক্ত করে জানান দেয়, এ কারণে অপারেশন করেছি। ততক্ষণে জল অনেকটা ঘোলা হয়ে যায়। সর্বজনীন পেনশন স্কিম তো সরকার করেছে দেশের জনগণের কল্যাণের জন্য! যদি জনগণের কল্যাণের জন্য করেই থাকেন, তাহলে প্রচার কোথায়? বলা হয়ে থাকে, প্রচারেই প্রসার। কেউ জানে না, হঠাৎ ঘোষণা সবার জন্য পেনশন স্কিম। ভালো সিদ্ধান্ত। কিন্তু একজন নাগরিক সরকারের চাকরিজীবীরা পেনশন স্কিমে কেন যুক্ত হবে, মাসিক চাঁদা দিয়ে? দিলে কী লাভ হবে, কতটুকু লাভ হবে, সরকারি চাকরিজীবীরাই যোগ দেবে, নাকি বেসরকারি জনগণও যুক্ত হতে পারবেন? সরকার যে সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালু করেছে, তাতে কারা কারা কীভাবে কত টাকার বিনিময়ে কত লাভবান হবে, নির্দিষ্ট করে কিছু বলা নেই।

সর্বজনীন পেনশন পদ্ধতি চালুর ফলে দেশের চারশর বেশি স্বশাসিত, স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত, সংবিধিবদ্ধ বা সমজাতীয় প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ কর্মীদের বাধ্যতামূলক এই কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ বলছে, পেনশন গ্রহণের ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অবসরের পর মাসে মাসে ভাতা পাবেন।  পরিবর্তিত পেনশনে কর্তৃপক্ষ ‘প্রত্যয়’ নামে নতুন একটি স্কিম যুক্ত করেছে প্রথমবারের মতো চালু হওয়া সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায়। বলা হচ্ছে, আগে প্রভিডেন্ট ফান্ডে সংস্থার প্রদানকৃত অর্থ কর্মচারীর কন্ট্রিবিউশন কম হলেও প্রত্যয় স্কিমে কর্মীর সমান টাকা জমা দেওয়ায় পেনশনভোগী অধিক লাভবান হবেন। কিন্তু শুভংকরের ফাঁকিটা রয়ে গেছে এই ঘোষণায়, এই স্কিমে অর্থাৎ ‘প্রত্যয়’ বর্তমান ব্যবস্থার মতো অবসরে যাওয়ার পর এককালীন অর্থ পাওয়া যাবে না। সরকারের কর্মীরা জীবনের শেষ বেলায় পেনশনের টাকা দিয়ে বাকি জীবনের নিশ্চয়তা খোঁজেন, নিশ্চিত জীবনের সন্ধানে থাকেন। সরকারের প্রবর্তিত প্রত্যয় স্কিমে এককালীন টাকা পাওয়া যাবে না। মাসে মাসে একটা টাকা পাবেন। সেই টাকা তো সরকারের সাধারণ পেনশনভোগীরাও পেয়ে থাকেন। তাহলে, দুই পেনশনের মধ্যে কেন মৌলিকভাবে এত পার্থক্য? কেন পেনশন পাওয়ার অধিকারীরা একসঙ্গে টাকা পাবেন না? একসঙ্গে টাকাও দেবেন না, আবার জোর করে স্কিমে যুক্ত করতে চাইবেন কেন? প্রত্যয় স্কিমের মধ্যে প্রবেশ করলে আর্থিক বৈষম্যর শিকার হবেন এমন যুক্তি দিচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা। শোনা যাচ্ছে, রাষ্ট্রায়ত্ত অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো ব্যাংকগুলোকেও প্রত্যয় স্কিমের আওতায় আনা হবে এবং ব্যাংকের কর্মীরা এই সংবাদে মুষড়ে পড়েছেন। কেন মানুষ সরকারি চাকরি করে? সাধারণ সরকারি চাকরিজীবীদের সারা জীবনের একমাত্র পাওয়া পেনশনের টাকা। শত শত বছর ধরে চলে আসছে, আবার হঠাৎ করে এই প্রত্যয় স্কিম চালুর কী দরকার? একটা স্থিতিশীল পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করা কেন? মানুষের জীবনের প্রথম ও একমাত্র গ্যারান্টি অর্থ। সেই অর্থ নিয়ে অনর্থ ঘটালে বা ঘটাতে চাইলে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে বলা মুশকিল। কেননা, যেভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পথে নামছেন এবং সরকার যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ সরকারি চাকরিজীবী সাধারণ মানুষের দাবির প্রতি শ্রদ্ধাবনত না হয়, গোটা দেশ ও দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করবে। এমনিতেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ভয়বহ নাজুক। পৃথিবীর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় রেটিংয়ে থাকে না, পড়াশোনা ও গবেষণার নাজুকতার কারণে। পড়াশোনা বা গবেষণার চেয়ে বেশি বিশ্ববিদ্যালগুলোতে দলবাজি, রাজনীতির নোংরা খেলা। এসব অস্বস্তিকর ও বেদনাদায়ক পরিস্থিতির মধ্যে যদি বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের প্রত্যয় পেনশন ঠেকানোর জন্য রাজপথে আন্দোলনে নামতে হয়, তাহলে পঙ্গু ব্যবস্থাপনা আরও জেঁকে বসবে। কোন কোন দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আন্দোলনে যাচ্ছেন বা যেতে বাধ্য হচ্ছেন, সে বিষয়ে একটু নজর দেওয়া যাক। সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা প্রত্যয় স্কিম থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্তি প্রত্যাহার, সুপার গ্রেডে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্তি এবং শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেল প্রবর্তনের দাবি করে আসছেন, কেবল দাবি করেই বসে থাকেননি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আন্দোলন করে আসছেন দুই মাস ধরে। কঠিন ও বৃহত্তর আন্দোলনে যাওয়ারও প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

দেশে একটা পেনশন স্কিম চালু করেছে সরকার। সব মানুষের কল্যাণের জন্য, ভালোর জন্য। প্রশ্ন হচ্ছে, সেই পেনশনে বাধ্যতামূলক সরকারি কর্মীদের ঢোকাতে হবে কেন? তাও আবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে? যদি জনগণের জন্য টেকসই হয়, কল্যাণকর হয়, উপযোগী হয়, জনগণ তো এমনিতেই ‘প্রত্যয়’ পেনশন স্কিমে ঢুকবেন। জোর কেন? ‘প্রত্যয়’ পেনশন স্কিম বাস্তবায়নে জোরজবরদিস্ত কেন? তাও শুরু হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দ্বারা, যারা সমাজ বা রাষ্ট্রের সবচেয়ে সংবেদনশীল। জনগণই যদি সব ক্ষমতার কেন্দ্র হয়ে থাকে, সেই জনগণকে বুঝিয়ে, পরিস্থিতি লাভ-ক্ষতি জানিয়ে দিলেই তো জনগণ একত্র হয়ে পেনশন নেবে। জীবনকে সমৃদ্ধ করবে। সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালু হওয়ার সময়ে, একটা শোরগোল উঠেছিল। ব্যাংকের টাকা খেলাপিদের কবজায়। হাজার হাজার নয়, প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা খেলাপি। ফলে সরকারের টাকার প্রয়োজনে ভিন্ন কৌশলে এই পেনশন স্কিম চালু করেছে, মূলত জনগণের টাকায় সরকার পরিচালনা করার জন্য। এসবই হয়তো উড়ো কথা, বা বানানো সাবটাইটেল। কিন্তু যখন বাধ্যতামূলকভাবে যোগ দিতে বলা হয়, তখনই শক্ত কাঁঠালও পেকে পচে যায়, দুর্গন্ধ ছড়ায়। সময় এসেছে, সরকার সর্বজনীন পেনশন নিয়ে কোন দিকে যাবে, তার সঠিক ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়ার।

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক

monihaider68@gmail.com