প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মাধ্যমে ইরানে কতটা পরিবর্তন আসবে?

প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল ২০২৫ সালের জুন মাসে। কিন্তু হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় ইব্রাহিম রাইসির মৃত্যুর কারণে সে দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পদে চলছে উত্তরসূরি বেছে নেওয়ার প্রক্রিয়া। শুক্রবার সকাল থেকেই ভোট শুরু হয়েছে ইরানে। ভোটপর্ব শেষ হলেই শুরু হবে গণনা।

তবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও এর মাধ্যমে দেশের সরকার ব্যবস্থায় খুব একটা পরিবর্তন আসবে না বলে মনে করেন সে দেশের বেশিরভাগ জনগণ। তেহরানে কিশোরী মেয়েকে নিয়ে ভোট দিতে এসেছিলেন আলী নামে এক ব্যক্তি। তিনি দেশের শাসন ব্যবস্থায় কিছুটা উন্নতির আশায় পেজেশকিয়ানকে ভোট দিয়েছেন। 

তবে তিনি শঙ্কা জানিয়ে আল জাজিরাকে বলেন, দেশের বেশিরভাগ মানুষ আজকের এই ভোটদান থেকে বিরত রয়েছেন। কারণ তারা বিশ্বাস করেন যে, এই ভোটের মাধ্যমে খুব বেশি পরিবর্তন আসবে না। পাশাপাশি আমরাও বিশ্বাস করি, ভোটের মাধ্যমে খুব বেশি পরিবর্তন আসবে না। তবে আমাদের ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে আমরা এই ভোটের আনুষ্ঠিানিকতায় যোগ দিয়েছি। 

স্থানীয় সময় শুক্রবার (২৮ জুন) সকাল ৮টায় শুরু হওয়া এ ভোটগ্রহণ চলবে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত। তবে এ সময়ের পরও ভোট কেন্দ্রগুলোতে ভোটার উপস্থিতি থাকা সাপেক্ষে ভোটগ্রহণের সময় বাড়ানো যাবে। আর ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব ভোট গণনা শুরু হবে। 

দেশটির অভ্যন্তরীণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভোটের প্রাথমিক ফল স্থানীয় সময় শনিবার দুপুরের আগেই পাওয়া যেতে পারে। তবে মন্ত্রণালয় থেকে ফল প্রকাশের আগে অন্য কোনো মাধ্যমে পাওয়া ফল নিয়ে মাতামাতি করতে নিষেধ করা হয়েছে।

শুক্রবারের এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে চার প্রার্থীর মধ্যে। তারা হলেন- মাসুদ পেজেশকিয়ান, মোস্তফা পুরমোহাম্মাদি, সাইদ জলিলি এবং মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। 

মাসুদ পেজেশকিয়ান
এবারের প্রার্থীদের মধ্যে পেজেশকিয়ানই সবচেয়ে বয়স্ক এবং একমাত্র সংস্কারপন্থী প্রার্থী। ১৯৫৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর জন্ম নেওয়া পেজেশকিয়ান একজন হার্ট সার্জন। তিনি বরাবর ইরানের বর্তমান শাসকদের সমালোচনা করে এসেছেন। ইরানের সাবেক সংস্কারপন্থী প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামির সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন তিনি। ২০২২ সালে তেহরানের নীতি পুলিশের হেফাজতে কুর্দি তরুণী মাসা আমিনির মৃত্যুর ঘটনার পর ইরানজুড়ে যে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল সে সময় রাইসি সরকারের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন পেজেশকিয়ান।

মোস্তফা পুরমোহাম্মাদি
৬৪ বছর বয়সী মোস্তফা পুরমোহাম্মদি এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামা একমাত্র ধর্মীয় নেতা। রক্ষণশীল ও অভিজ্ঞ এ রাজনীতিক ১৯৫৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর কুমনগরে জন্মগ্রহণ করেন। পুরমোহাম্মদি দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ইরানের গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বেও ছিলেন।

সাঈদ জালিলি
আরও একজন কট্টর রক্ষণশীল প্রার্থী ৫৮ বছরের সাঈদ জালিলি। তিনি ঘোর পশ্চিমাবিরোধী। ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের পরমাণু চুক্তিরও তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন তিনি। ১৯৬৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মাশহাদ শহরে জন্মগ্রহণ করেন জালিলি। খামেনি তাঁকে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পর্ষদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করেছিলেন। জালিলি ইরান-ইরাক যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। সামরিক বাহিনীতে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি একটি পা হারান।

মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ
ইরানের একজন রক্ষণশীল নেতা হিসেবে ৬২ বছর বয়সী মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ অতি পরিচিত। ২০২০ সাল থেকে দেশটির পার্লামেন্টে স্পিকারের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। ইরানের উত্তর–পূর্বের নগরী মাশহাদের কাছে ১৯৬১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন গালিবাফ। রাজধানী তেহরানের মেয়রের দায়িত্ব পালনসহ তিনি সরকারি নানা পদে ছিলেন। এর আগে ২০০৫, ২০১৩ ও ২০১৭ সালেও গালিবাফ প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছিলেন। তবে শেষবার প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে তিনি রাইসিকে সমর্থন দেন। রাজনীতিতে আসার আগে গালিবাফ ইরানের অভিজাত বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের সদস্য ছিলেন। পরবর্তীতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি তাঁকে রেভল্যুশনারি গার্ডের বিমানবাহিনীর প্রধান করেছিলেন। আর ২০০০ সালে পুলিশপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এ নির্বাচনে প্রকাশ্যে কোনো প্রার্থীকে সমর্থন দেননি। কিন্তু মঙ্গলবার টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক ভাষণে খামেনি বলেছেন, যিনি মনে করেন আমেরিকার আনুকূল্য ছাড়া কিছুই করা সম্ভব না তিনি এই দেশকে সামলাতে পারবেন না। পাশাপাশি শুক্রবার ভোট দেওয়ার পর তিনি ইরানের জনগণকে ভোটদানের মাধ্যমে দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার আহ্বান জানান। 

তার উপদেষ্টা ইয়াহিয়া রহিম সাফাভি ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, এমন একজন প্রেসিডেন্টকে নির্বাচিত করুন যার মতামত সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে না। জনগণের উচিত এমন একজনকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে বেছে নেওয়া, যিনি নিজেকে সেকেন্ড ইন কমান্ড মনে করবেন। প্রেসিডেন্টের উচিত হবে না বিভেদ সৃষ্টি করা।

ধারণা করা হচ্ছে, ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ঘনিষ্ঠ কেউ এই নির্বাচনে জয় পাবেন। অর্থাৎ এ নির্বাচনের ফল খামেনির উত্তরাধিকারকে প্রভাবিত করবে। খামেনির বর্তমান বয়স ৮৫ বছর। ধারণা করা হচ্ছে, যিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট হবেন, তিনি পরবর্তী সময়ে খামেনির উত্তরসূরি নির্বাচনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকবেন। এবারের নির্বাচনের আগে খামেনি তাই প্রার্থী হিসেবে তার রক্ষণশীল ধারণা পোষণ করে এমন ব্যক্তিদের আধিপত্য নিশ্চিত করেছেন।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের প্রেসিডেন্টের ভূমিকা বড় করে দেখা হলেও দেশের প্রকৃত ক্ষমতা থাকে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার হাতে। পররাষ্ট্র বা পারমাণবিক নীতি ও সরকারের বিভিন্ন শাখার নিয়ন্ত্রণ, সামরিক, গণমাধ্যম ও বিভিন্ন আর্থিক সম্পদের বিষয়ে তিনিই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেন।