জোর খাটিয়ে চার ভোটার বাড়িয়ে সালাউদ্দিন বললেন ‘ফিনিশ’

নারী ফুটবল লিগে অংশ নেওয়া বেশিরভাগ দলের কোনো শক্ত ভিত্তি নেই। দুই-এক বছর পরপর বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের প্রভাবশালী সদস্য ও নারী ফুটবল কমিটির প্রধান মাহফুজা আক্তার নামসর্বস¦ কিছু দলকে দিয়ে খেলান নারী লিগ। যাদের কারও কারও নেই কোনো ক্লাব টেন্ট। প্যাড সর্বস্ব সেই ক্লাবগুলোকেই ভোটাধিকার দিতে উঠেপড়ে লেগেছিলেন কিরণ। জোর সমর্থন পেয়েছেন বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিনের কাছে। তাতেই হয়েছে লক্ষ্যপূরণ।

শনিবার অর্ধকোটি টাকার বার্ষিক সাধারণ সভা করে সর্বশেষ নারী লিগের শীর্ষ চার দলকে দেওয়া হয়েছে কাউন্সিলরশিপ। এখানে সাধারণ সদস্যদের মতামতকে দেওয়া হয়নি গুরুত্ব। জানতে চাওয়া হয়নি তাদের বক্তব্য। ‘হাঁ-না’ ভোটে ‘না’-এর পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও বিস্ময়করভাবে ‘হাঁ’-কে জয়যুক্ত করে দ্রুত চার ভোট বাড়িয়ে নেন সালাউদ্দিন-কিরণ গং। এই নাটকে বড় ভূমিকা ছিল আলোচিত ও ফিফার সাজাপ্রাপ্ত বাফুফের সিনিয়র সহ-সভাপতি সালাম মুর্শেদীর।

মাত্র দেড় ঘণ্টার এজিএম-এ সাধারণ সদস্যদের কথাই বলতে দেওয়া হয়নি। বাফুফের কর্তারা দ্রুতই আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেছেন। নারী লিগের চার শীর্ষ দলকে কাউন্সিলরশিপ দেওয়ার পাশাপাশি ২০২৩ সালের অর্থ প্রতিবেদন ও ২০২৪ সালে বাজেটও অনুমোদন করিয়ে নেন। এরপর এজিএম পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে এসে বাফুফে সভাপতি চার ক্লাবকে কাউন্সিলরশিপ দেওয়ার পক্ষে নানা মনগড়া যুক্তি দেখাতে থাকেন। দুপাশ থেকে তাকে সহায়তা করেন সালাম মুর্শেদী ও বাফুফের আরেক আলোচিত সহ-সভাপতি কাজী নাবিল আহমেদ।

এজিএম-এ গুরুত্বপূর্ণ কী কী হলো জানতে চাইলে নিজস্ব ভঙ্গিমায় বাফুফের চারবারের সভাপতি বলেন, ‘যেটা নতুন হয়েছে যে, মেয়েদের (লিগের) ৪টা কাউন্সিলরশিপ পাস হয়েছে। বাফুফের ওমেন্স কমিটির একটা চাওয়া ছিল যে মেয়েরা লিগ খেলে, জাতীয় দলে খেলে। তারা চেয়েছিল অনেকগুলো। তবে ৪টা পাস হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের পর তারা ভোটাধিকার পাবে।’

গত বছর জানুয়ারিতে ফিফা থেকে কাউন্সিলর কমানোর নির্দেশনা পেয়েছিল বাফুফে। সেই নির্দেশনার তোয়াক্কা না করে তারা কমানোর জায়গায় এমন চারটি কাউন্সিলরশিপ বাড়িয়েছে যাদের অংশ নেওয়া লিগ নিয়েই আছে হাজারো প্রশ্ন। নারী ফুটবল কমিটির প্রধান কিরণের পরোক্ষ হস্তক্ষেপে এবার জাতীয় দলের সব তারকা নিয়ে দল গড়েছিল নাসরিন স্পোর্টস অ্যাকাডেমি। ক্লাবটির খেলোয়াড়রা বাফুফের আবাসনসহ ও সব সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে অংশ নিয়েছে লিগে। তারাই শেষ পর্যন্ত হয়েছে চ্যাম্পিয়ন। রানার্স-আপ হওয়া আতাউর রহমান ভুঁইয়া মানিক কলেজ স্পোর্টিং ক্লাবটিরও একই অবস্থা। এর মালিক বাফুফের আরেক সহ-সভাপতি আতাউর রহমান ভুঁইয়া। দলটি গেল তিনটি লিগে অংশ নিয়েছে বাফুফের সব সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে। তৃতীয় ও চতুর্থ হয়ে ভোটাধিকার পেয়েছে বাংলাদেশ আর্মি ফুটবল ক্লাব ও রংপুরের সদ্যপুস্করিনি যুব সংঘ।

সালাউদ্দিনের দাবি, ফিফা এ নিয়ে কোনো ‘জটিলতা’ তৈরি করবে না। একই সঙ্গে বাফুফে প্রধান জানালেন চারটি ক্লাবকে কাউন্সিলরশিপ দেওয়ার ক্ষেত্রে কেবল তাদের পয়েন্ট টেবিলে অবস্থানকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, দেখা হয়নি তাদের সার্বিক অবস্থা। তিনি বলেন, ‘যেখানে আপনার কাছে ১৪৭টা কাউন্সিলর আছে, চারটা বাড়ালে কী এমন এসে যায়। কারণ একটা জিনিস খেয়াল করে দেখবেন, বড় বড় নামকরা ক্লাবগুলো এখনো মেয়েদের লিগ খেলে না। ফিফাকে আমি বোঝাতে পারব। ফিফা যেটা বলছিল, আমরা বলেছিলাম তোমরা করতে গেলে তোমাদের করতে হবে, কারণ আমরা কমাতেও পারব না, বাড়াতেও পারব না। কারণ কমাতে গেলে কংগ্রেস লাগবে, বাড়াতেও কংগ্রেস লাগবে, তখন তারা বলল যে এটাকে স্থগিত রাখো, আমরা পরে তোমাদের সঙ্গে এ নিয়ে বসব..। এখানে কোনো ক্রাইটেরিয়া দেখা হয়নি, যে ১০ জন খেলেছে তাদের মধ্যে শীর্ষ ৪ জনকে দেওয়া হয়েছে। ...ফিনিশ।’

সালাউদ্দিনকে সমর্থন জানিয়ে পাশে থাকা সিনিয়র সহ-সভাপতি সালাম মুর্শেদী দাবি করেন, ‘এটা আমাদের নির্বাহীতে (কমিটি) অনুমোদিত হয়েছে এবং কংগ্রেসও আমাদের অনুমোদন দিয়েছে। আমাদের সম্মানিত ডেলিগেটরা যে ক্লাবগুলোকে অনুমোদন দিয়েছেন, আগামী নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন।’ অথচ বেশ কয়েকজন কাউন্সিলরের অভিযোগ, এই ইস্যুতে যে ভোট হয়, তাতে কাউন্সিলর না দেওয়ার পক্ষে রায় দেন সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য। তবে সালাম মুর্শেদী বিস্ময়করভাবে পক্ষের ভোটকে বিজয়ী ঘোষণা করেন।

হিসেবে গোঁজামিল, অনিয়ম, জালিয়াতি ও দায়িত্বে অবহেলার দায়ে সম্প্রতি বাফুফে বাফুফের ফিন্যান্স কমিটির প্রধান হিসেবে সালাম মুর্শেদীকে অর্থ জরিমানা করে। এছাড়া সাবেক সাধারণ সম্পাদক, অর্থ কর্মকর্তাসহ বেশ কজনকে অর্থ জরিমানা ও বিভিন্ন মেয়াদে ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ করা হয়। যে কারণে বার্ষিক সাধারণ সভায় বিগত বছরের অর্থ প্রতিবেদন নিয়ে বিস্তর আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। তবে আলোচনার কোনো সুযোগই দেওয়া হয়নি সাধারণ সদস্যদের। বারবার বক্তব্য দিতে চাইলেও কথা বলতে না দেওয়া মহাখালী স্পোর্টিং ক্লাবের কাউন্সিলর ও সাধারণ সম্পাদক মোস্তাক পাশা মিলন বলেন, ‘এরা তো আমাদের কথাই বলতে দেয় না। আমরা বারবার কথা বলতে চেয়েও ফ্লোর পাইনি। তাছাড়া তারা নির্বাচনও করতে দেন না বিরোধীদের। দিনের পর দিন পদ আঁকড়ে ধরে ফুটবলটাকে ধ্বংস করে ফেলারই নতুন করে ক্ষমতায় আসার চক্রান্ত করছে নামসর্বস¦ দলগুলোকে কাউন্সিলরশিপ দিয়ে।’ শরীয়তপুরের কাউন্সিলর মোজাম্মেল হক অবশ্য বক্তব্য রাখতে পারেন। তিনি তার বক্তব্যে সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের সাবেক প্রধান বেনজীর আহমেদ ও কর কর্মকর্তা মতিউর রহমানের গোপনে দেশত্যাগের বিষয়টি সামনে এনে বলেন, ‘ভবিষ্যতে বেনজীর-মতিউরের মতো বাফুফের সামনের সারিতে বসা আপনাদের কাউকে কাউকে কি দেখব গোপনে দেশত্যাগ করতে?’

নির্বাচনী কংগ্রেস হওয়ার কথা আগামী অক্টোবরে। সালাউদ্দিন গং-এর মেয়াদও পূর্ণ হবে তখন। এর আগে তড়িঘড়ি চার ভোটার বাড়িয়ে আসলে নির্বাচনী বৈতরণী পার করতে চাইছেন গেল চার মেয়াদে দায়িত্বে থেকেও ফুটবলের দৃশ্যত উন্নতি আনতে না পারা কর্তারা। এখন সাধারণ সদস্যদের কোর্টে বল। শেষ পর্যন্ত তারা ফুটবলের চিন্তা করে রায় দেবেন, নাকি অতীতের মতো বিবেক বিকিয়ে নিয়ে আসবেন প্রমাণিত ব্যর্থদের সেটা বোঝা যাবে সামনের নির্বাচনে।