ইরানি কোচ, পর্তুগিজ কোচে হয়নি। হয়নি পরীক্ষিত আর্জেন্টাইন কোচ এনেও। এবার তাই সুদিন ফেরাতে আবাহনী দৃষ্টি দিয়েছে স্প্যানিশ কোচের দিকে। ভারত জায়ান্ট ইস্ট বেঙ্গল এবং ব্রুনাই জাতীয় দলের সাবেক বস মারিও রিভেরা ক্যাম্পাসিনোকে এবার দেখা যাবে ছয় বারের লিগ চ্যাম্পিয়ন আবাহনীর ডাগআউটে।
৪৬ বছর বয়সী এই কোচকে চূড়ান্ত করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আবাহনী ক্লাবের ডিরেক্টর ইনচার্জ ও ফুটবল কমিটির চেয়ারম্যান কাজী নাবিল আহমেদ। দলের খোলনলচে পাল্টে তিনি চাইছেন আবাহনীকে ফের চ্যাম্পিয়ন রূপে ফিরিয়ে আনতে। দলটি যে শেষ পাঁচটি লিগের শিরোপা ঘরে তুলতে পারেনি। চেয়ে চেয়ে দেখতে হয়েছে বসুন্ধরা কিংসের বিস্ফোরণ। আবির্ভাবে যারা আবাহনীর শ্রেষ্ঠত্ব ক্ষুন্ন করে বসেছে সেরার আসনে। শেষ দু'টি মৌসুমে আবাহনীর অবস্থা বেশ খারাপ। লিগ শিরোপা দূরে থাক, জুটেনি কোন ঘরোয়া শিরোপা। তাই বাধ্য হয়েই ব্যাপক পরিবর্তনের পথে হাটতে হচ্ছে ধানমন্ডি জায়ান্টদের।
৪৬ বছর বয়সী রিভেরা স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন আর্জেন্টাইন অভিজ্ঞ কোচ ডিয়াগো ক্রুসিয়ানির। বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক এ্ই কোচের অধীনে সর্বশেষ মৌসুমে লিগে আবাহনী হয়েছে তৃতীয়। এছাড়া পারেনি কোন টুর্নামেন্টের ফাইনালে যেতে। যে কারণে মাদ্রিদে জন্ম নেওয়া উয়েফা প্রো-লাইসেন্সধারী রিভেরায় আস্থা রেখেছে আবাহনী। সর্বশেষ ব্রুনাই জাতীয় দলকে কোচিং করানো রিভেরা অবশ্য খুব বেশি সফল হতে পারেননি। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছর ৭ জুন পর্যন্ত তার অধীনে ব্রুনাই খেলেছে ১৪টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ। যার মধ্যে জিতেছে কেবল ৩ ম্যাচে। বাদ বাকী ১১ ম্যাচেই হারতে হয়েছে। এর আগে দুই প্রস্থে ইস্ট বেঙ্গলের ডাগআউট সামলানো রিভেরা প্রসঙ্গে কাজী নাবিল দেশ রূপান্তরকে বলেন, 'তার সঙ্গে চুক্তির কিছু আনুষ্ঠানিকতা বাকী রয়েছে। যা অতি দ্রুত শেষ হয়ে যাবে। তাকেই আমরা কোচ হিসেবে চূড়ান্ত করেছি। আশা করছি তার অধীনে আমরা ফের সাফল্য পেতে শুরু করবো।'
সাফল্য পাওয়ার এই তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকেই আবাহনীর কর্তারা এবার খেলোয়াড় সংগ্রহেও বেশ উদ্যোগী। যদিও তারা পারেনি স্বীকৃত তারকাদের বসুন্ধরা কিংস থেকে ছিনিয়ে আনতে। তাদের লক্ষ্যে ছিল গত মৌসুমে স্থানীয়দের মধ্যে সেরা পারফরমার রাকিব হোসেন। এই উইঙ্গার দুই মৌসুম আগে খেলেছেন আবাহনীর হয়ে। তার দিকেই দৃষ্টি ছিল। প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল রাকিবকে। তবে শেষ পর্যন্ত কিংসেই থেকে গেছেন রাকিব। কিংসের ঘরে হানা দেওয়া সম্ভব হয়নি বলে আবাহনী এবার ভেঙেছে মোহামেডানের ঘর। গেলো মৌসুমে সব প্রতিযোগীতাতেই আবাহনীকে ছাপিয়ে গিয়েছিল মোহামেডান। আবাহনী তাই সাদা-কালো শিবিরের সেরাদের দলে নিয়েছে। শাহরিয়ার ইমন, জাফর ইকবাল, হাসান মুরাদ ও কামরুল হাসানদের নেওয়ার পাশাপাশি শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্র থেকে তারা নিয়েছে জাতীয় দলের এক নম্বর গোলকিপার মিতুল মারমাকে। এখন আবাহনীর কর্তারা ব্যস্ত উঁচু মানের বিদেশী সংগ্রহে। ইতিমধ্যে তারা ব্রাজিলিয়ান প্লে-মেকার রাফায়েল আগুস্তোকে ফেরানো নিশ্চিত করেছে। নাবিল জানালেন, 'রাফায়েলকেই কেবল নিশ্চিত করা হয়েছে। এর বাইরে বেশ ক'জনের সঙ্গে কথা চলছে। আশা করছি শিঘঘরই সবাইকে চূড়ান্ত করতে পারবো।'
টানা শিরোপাশূণ্য থাকাটা মেনে নিতে পারছে না আবাহনী ক্লাবের শীর্ষ কর্তারা। তাই তারা এবার জোড় দিয়েছে ভালো দল গড়ায়। সেই সঙ্গে খেলোয়াড়দের সুযোগ সুবিধার দিকেও নজর দিচ্ছেন তারা। নাবিল বলেন, 'আমরা সবসময়ই শিরোপায় চোখ রেখে দল গড়ি। শেষ কয়েক মৌসুম নানা কারণেই হয়নি বলেই আমরা বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছি। পাশাপাশি খেলোয়াড়দের সুযোগ সুবিধা বাড়ানোর দিকেও আমাদের দৃষ্টি আছে।' সব কিছুই হচ্ছে, হচ্ছে না কেবল নিজস্ব একটা ভেন্যু। ধানমন্ডিতে ব্যাপক সমারোহে নির্মিত হচ্ছে বহুল আলোচিত স্পোর্টস কমপ্লেক্স। আবাহনীর অনুশীলন মাঠকেই ভবিষ্যতে ভেন্যু করার একটা ইঙ্গিত দিয়ে রাখলেন নাবিল, 'এখন কমপ্লেক্স নির্মানের কাজ চলছে। ভবিষ্যতে আমরা এখানেও ছোট পরিসরে নিজস্ব মাঠ তৈরী করতে পারি। এটা আসলে নির্ভর করছে নির্মান কাজ শেষ হওয়ার পর। তবে একটা নিজস্ব ভেন্যুর সুবিধা অনেক। এটা জানি বলেই ভেন্যু নিয়েও আমাদের নানা পরিকল্পনা রয়েছে।'
বাংলাদেশ জাতীয় দলে এখন স্প্যানিশ কোচ। হাভিয়ের কাবরেরার অধীনে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স একেবারে খারাপ বলা যাবে না। যদিও চলতি বছরে এখনও বাংলাদেশ পায়নি জয়ের দেখা। বিশ্বকাপ বাছাইয়ের দ্বিতীয়পর্ব লাল-সবুজরা শেষ করেছে গ্রুপের তলানীতে থেকে। তারপরও কাবরেরায় এখনই আস্থা হারায়নি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন। এদিকে বসুন্ধরা কিংস সর্বজয়ী হয়ে উঠেছে এক স্প্যানিশের ছোঁয়ায়। সেই আবির্ভাব থেকেই দলটির কোচ অস্কার ব্রুজোন। জাতীয় দল ও বসুন্ধরার পর আবাহনীতে স্প্যানিশ কোচ আসার একটা সুবিধেও দেখছেন নাবিল যিনি একই সঙ্গে বাফুফের সহ-সভাপতি ও ন্যাশনাল টিমস কমিটির চেয়ারম্যান, 'দু'টিকে আসলে মেলানো যাবে না। জাতীয় দল আর ক্লাব এক নয়। তবে এটা ঠিক বিভিন্ন দেশের ফুটবল নিয়ে আলাদা আলাদা ধরণ ও দর্শণ থাকে। জাতীয় দল ও সেরা ক্লাবগুলোতে স্প্যানিশ কোচ হওয়ায় আমাদের ফুটবলাররা একটা অনন্য ধরণ ও দর্শণের সঙ্গে অভ্যস্থ হয়ে উঠতে পারবে। তাতে জাতীয় দলও লাভবান হবে।'
২০১৭-১৮ মৌসুমে সবশেষ লিগ শিরোপা জিতেছিল আবাহনী। সেটি ছিল তাদের ষষ্ঠ শিরোপা। দেশের ফুটবল পেশাদার যুগে পা রাখার পর তারাই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সফল দল। তবে আসছে মৌসুমে আবাহনীকে ছুঁয়ে ফেলার সুযোগ আছে কিংসের। আবির্ভাবের পর টানা পাঁচ লিগ শিরোপা জিতে ইতিহাস গড়া কিংস জোড় চেষ্টা চালাবে আবাহনীর আরেকটি শ্রেষ্ঠত্বে ভাগ বসাতে। নয়া স্প্যানিশ কোচের অধীনে আবাহনী নিশ্চয় সেটা হতে দিতে চাইবে না। তাই তো ধানমন্ডি শিবিরে লেগেছে বদলের হাওয়া।