শুরু থাকলে শেষটাও থাকবে। জীবনে ও ক্রিকেটেও। নটআউট থেকে গেলেও দলের অন্য ব্যাটসম্যানরা আউট হয়ে যাওয়ার পর যেমন একা একা ব্যাটিং করা যায় না, তেমনি অবসরের ঘোষণা না দিলেও দলে জায়গা না পেলে তো একা একা খেলাও যায় না। তেমনি অবসরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না দিলেও একটা সময়ের পর শীর্ষ পর্যায়ে পেশাদারি খেলা চালিয়ে যাওয়াটাও একজন খেলোয়াড়ের পক্ষে অসম্ভব, সেটা শারীরিক কারণেই। তবে সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক অনেক কারণেই বোধ হয় বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা নিজেদের সাবেকের খাতায় ফেলতে চান না। অবশ্য পদ আঁকড়ে থাকার এই উদাহরণ শুধু ক্রিকেট নয়, দেওয়া যাবে শীর্ষ পেশায়ও। সাবেক আর বর্তমানের ভেতর রাত-দিনের পার্থক্য থেকেই জন্ম নিয়েছে এই অপসংস্কৃতি।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শেষে অনেক ক্রিকেটারই নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছেন। বিশ্বকাপ জিতে বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মা, রবীন্দ্র জাদেজা জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিকে বিদায়। সেমিফাইনালে হেরে যাওয়া অস্ট্রেলিয়া দলের উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান ডেভিড ওয়ার্নারও বিদায় জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিকে, গ্রুপ পর্বেই বাদ পড়া নিউজিল্যান্ডের অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসনও জানিয়েছেন তাকে আর নিউজিল্যান্ডের কেন্দ্রীয় চুক্তিতে না রাখতে। ভারতের কোচ রাহুল দ্রাবিড় আগেই বলে রেখেছিলেন, বিশ্বকাপই তার শেষ। শ্রীলঙ্কার কোচ ক্রিস সিলভারউড, কনসালট্যান্ট মাহেলা জয়াবর্ধনেও সরে দাঁড়িয়েছেন। একটা বড় বৈশ্বিক আসর মানেই একটা চক্রের সমাপ্তি, এই অধ্যায় শেষে কেউ কেউ সরে দাঁড়াবেন এটাই মহাকালের অমোঘ নিয়ম। সেই নিয়মের ব্যতিক্রম বাংলাদেশিদের মধ্যে। তাদের আচরণ সরকারি চাকুরেদের মতো, পদ আঁকড়ে থাকতে চান যতটা সম্ভব।
কাগজে-কলমে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের বয়স আজকে ৩৮ বছর ১৪৮ দিন। তবে বাংলাদেশে জন্মতারিখ নিবন্ধনের ক্ষেত্রে অনেক অভিভাবকই বয়স খানিকটা কমিয়ে দেন, যে কারণে প্রকৃত বয়সের সঙ্গে ‘সার্টিফিকেট এইজ’-এর একটা পার্থক্য থেকেই যায়। ধরে নেওয়া যায় মাহমুদউল্লাহর বয়স তার পাসপোর্টে উল্লিখিত বয়সের চেয়ে এক বা দুই বছর বেশি। তাহলে ২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে বাংলাদেশ দলে তরুণদের তৈরি হওয়ার জন্য তো মাহমুদউল্লাহর স্বাভাবিক বিচার-বুদ্ধিতে উচিত আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া, যেটা তার চেয়েও কম বয়সের অনেক ক্রিকেটার করেছেন। কিন্তু সে রকম কোনো ইঙ্গিত তার কাছ থেকে পাওয়া যায়নি; বরং বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডস ম্যাচের পর সাকিব আল হাসান সংবাদ সম্মেলনে এসে মাহমুদউল্লাহর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ব্যাপ্তি প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘যত দিন তিনি ফিট আছেন এবং পারফর্ম করছেন দলের জন্য। তার আরও অনেক দূর যাওয়ার বাকি আছে। তিনি আমাদের দলের সবচেয়ে ফিট প্লেয়ারদের মধ্যে একজন।’ মাহমুদউল্লাহ আরও অনেক দূর যেতেই পারেন, তবে এই বিশ্বকাপে তিনি যেমন ব্যাটিং করেছেন, সেভাবে ব্যাট করলে ম্যাচ শেষের অনেক আগেই জয় থেকে দূরে চলে যাবে বাংলাদেশ।
সাকিব নিজেও বিশ্বকাপের আগে ব্যক্তিগত কাজেই ছিলেন ব্যস্ত। ব্যবসা, রাজনীতি, ভিনদেশে বসবাস করা পরিবার এবং ক্রিকেট; সবকিছুকে ভারসাম্যপূর্ণ জায়গায় রাখার কঠিন কাজটা সাকিব করছেন, তবে এতে করে তার খেলায় যে প্রভাব পড়ছে, সেটা বোঝা গেছে শীর্ষ পর্যায়ে। প্রিমিয়ার লিগে বিকেএসপি বা ফতুল্লার মাঠে সাকিব হয়তো রান করে দেবেন, মিরপুরে জিম্বাবুয়ে বা আয়ারল্যান্ডের সঙ্গেও উইকেট নেবেন। কিন্তু বিশ্বকাপের মতো জায়গায় আনরিখ নরকিয়া, প্যাট কামিন্স বা জাসপ্রিত বুমরাদের মতো বোলারদের সামাল দেওয়ার সামর্থ্য যে সাকিবের আর নেই, সেটা পরিষ্কার হয়ে গেছে। একটা সময় সাকিব সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ২০২৫ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফি পর্যন্তই খেলবেন জাতীয় দলে। কিন্তু এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ^কাপে জানালেন, বদলে গেছে ভাবনা, ‘শেষ কি না, জানি না। পৃথিবীতে যেকোনো কিছু হওয়া সম্ভব। (চ্যাম্পিয়নস ট্রফি পর্যন্ত) তখন বলেছিলাম। কারণ, ওটা তখন পর্যন্ত চিন্তা ছিল। দল যদি মনে করে আমার দরকার আছে, আমি যদি মনে করি আমার দরকার আছে, উপভোগ না করলে অবশ্যই খেলার বিষয় না। সময় হলেই সবাই জানতে পারবে।’ অর্থাৎ ৩৭ বছর বয়সের বেশি হয়ে যাওয়ার পরও আন্তর্জতিক ক্রিকেটের একটা সংস্করণ খেলা ছেড়ে দেওয়ার ইচ্ছা নেই এই অলরাউন্ডারের।
মাহমুদউল্লাহর বর্তমান ক্রিকেট সামর্থ্যে কোনো ভিনদেশি ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ তো দূরের কথা, ঢাকা লিগে শীর্ষ দলে পারফরম্যান্সের জোরে একাদশে জায়গা খুঁজে পাওয়া কঠিন। সবশেষ মৌসুমে মোহামেডানে খেলে ১১ ম্যাচে ১০ ইনিংসে ৩২৮ রান, ৩টা হাফসেঞ্চুরি আর সর্বোচ্চ ৮৭। দলেই তার চেয়ে বেশি রান আছে দুই ক্রিকেটারের আর লিগের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকদের তালিকায় শীর্ষ ১৫ জনের মধ্যেও নেই। ওয়ার্নার নিশ্চয়ই ভেবেছেন জেইক ফ্রেজার ম্যাগার্কের জন্য জায়গাটা আটকে না রেখে ছেড়ে দিয়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে ব্যস্ত হয়ে গিয়ে জীবনটা উপভোগের কথা। রোহিত-বিরাট-জাদেজারা ভেবেছেন অনেক তো হলো, এবার রিঙ্কু সিং, যশস্বী জয়সওয়ালদের হাতে দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া যাক। ২০২৬ সালে ঘরের মাঠে বিশ্বকাপের শিরোপা ধরে রাখার জন্য দলটাকে তৈরি করা শুরু করতে হবে এখন থেকেই। এমন কোনো পরিস্থিতি নেই মাহমুদউল্লাহর সামনে, বরং কোচ হিসেবে হাথুরুসিংহে দ্বিতীয় দফায় আগমনের পর তার ভবিষ্যৎ নিয়ে শুরুতে একটা সন্দেহের উদ্রেক হলেও দুটো বিশ্বকাপ তো খেলেই ফেলেছেন। তারপরও কাপুরুষোচিত ক্রিকেট খেলে দলের ফলের চেয়ে নিজের মান বাঁচানোকে গুরুত্ব দিয়ে খেলা এই ক্রিকেটার এখনো মুখে কুলুপ এঁটে আছেন যেসব কারণে, তার একটা নিঃসন্দেহে অর্থনৈতিক। মাহমুদউল্লাহ বিসিবির কেন্দ্রীয় চুক্তিতে আছেন ওয়ানডে সংস্করণে, মাসিক বেতন ৪ লাখ টাকা। তবে অর্থের বাইরে খালি চোখে দেখা যায় না যা, তা হচ্ছে সুযোগ-সুবিধা। কেন্দ্রীয় চুক্তির বাইরে গেলেই ক্রিকেটাররা ব্রাত্য হয়ে পড়েন মিরপুরের হোম অব ক্রিকেটে অনুশীলনের সুযোগ-সুবিধা থেকে। এর বাইরে জাতীয় দলে থাকা মানেই ঢাকা লিগ এবং বিপিএলে চড়া পারিশ্রমিক, বিজ্ঞাপনের বাজারেও চাহিদা। মাহমুদউল্লাহ কেন এত বিবর্ণ পারফরম্যান্সের পরও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খেলা চালিয়ে যেতে আগ্রহী তার কারণ হিসেবে এগুলোই থাকবে এগিয়ে।
সাকিবের অবশ্য আর্থিক ব্যাপারটা নিয়ে মাথাব্যথা থাকার কথা নয়। সংসদ সদস্য, ব্যবসায়ী, শেয়ারবাজারে বড় বিনিয়োগকারী, বিজ্ঞাপনের মডেল, ব্যাংকের উদ্যোক্তা...সাকিবের কাছে বিসিবির মাসিক বেতন ৭ লাখ ৯০ হাজার টাকা হয়তো নস্যি। টি-টোয়েন্টি ছেড়ে দিলে বাকি দুই সংস্করণে চুক্তিবদ্ধ থাকলে সাকিবের বেতন কমবে মাত্র ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা। তাহলে সাকিব কি টাকা কিংবা অনুশীলন সুবিধার অভাবের কারণে ছাড়ছেন না? নিশ্চয়ই নয়। সাকিব খুব একটা অনুশীলন করেনও না, বলা যায় সময় পান না। আর বিসিবি না হলেও তার মাসকো-সাকিব একাডেমি, রংপুর রাইডার্সের অনুশীলন মাঠেও দ্বার অবারিত। সাকিব ছাড়ছেন না, কারণ দেশের জাতীয় দলে জায়গা না পেলে তার গ্রহণযোগ্যতা কমে যাবে ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলোতে। আইপিএল, বিগব্যাশের মতো শীর্ষ স্থানীয় লিগগুলোয় সাকিব এখন আর খুব চাহিদাসম্পন্ন ক্রিকেটার নন। তবে শ্রীলঙ্কা, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্রের লিগগুলোয় এখনো সাকিবের চাহিদা আছে, তার নিজস্ব ব্র্যান্ডভ্যালু এবং অলরাউন্ডার হওয়ার সুবাদে।
দেশের ক্রিকেটকে আরও কিছু দেওয়ার ইচ্ছা, এসব ছেঁদো কথা নয়; বরং সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত স্বার্থেই জাতীয় দল থেকে স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়াতে চান না ক্রিকেটাররা। বগুড়ায় শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচ খেলার মাধ্যমে নিজের খেলোয়াড়ি জীবনের ইতি টেনেছিলেন খালেদ মাহমুদ, বর্তমানে বিসিবির পরিচালক। তার পর বাংলাদেশে তারকা ক্রিকেটার কারও মাঠ থেকে গৌরব নিয়ে বিদায় নেওয়ার উদাহরণ নেই। হাবিবুল বাশার নিষিদ্ধ ইন্ডিয়ান ক্রিকেট লিগে যোগদানের আগে বিসিবিকে অবসরের চিঠি দিয়ে গিয়েছিলেন, পরে দেশে এসে নানান শর্তপূরণের পর তার নিষেধাজ্ঞা উঠেছে। মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা মাঠ থেকে বিদায় নিতে রাজি হননি, এখনো অবসরের ঘোষণা না দিলেও বিসিবিকে এই সাবেক অধিনায়ক জানিয়ে দিয়েছেন, কেন্দ্রীয় চুক্তি থেকে বাদ দিয়ে দিতে। তামিম ইকবাল অবসরসংক্রান্ত যে নাটকটা মঞ্চস্থ করেছেন, এরপর অনেকেই ক্রিকেটারদের অবসরের ঘোষণায় অবিশ্বাস প্রকাশ করলেও তামিম ফিরে এসে বুঝেছেন বেশিদিন টিকে থাকা যাবে না। তাই তো তিনি জানিয়ে দিয়েছেন তাকে কেন্দ্রীয় চুক্তির বাইরে রাখতে। ওদিকে টি-টোয়েন্টি থেকে অবসর নেওয়া মুশফিকুর রহিম আবার বিপিএলের সময় সংবাদ সম্মেলনে ‘রিটায়ার কি করেছিলাম ভাই’ বলে উসকে দিয়েছেন জোর করে বাদ দেওয়ার সম্ভাবনাটা।
ক্রিকেটাররা ক্রিকেট খেলবে, সর্বোচ্চ পর্যায়ে যত দিন পর্যন্ত খেলে যেতে পারেন, সেটা চাইবেন এটাই স্বাভাবিক। বিদায়ী সেনাপ্রধান শফিউদ্দিন আহমেদ যেমন বলেছেন, ‘১৯৮১ সালে সেনাবাহিনীর চাকরিতে যোগ দিয়ে এই ইউনিফর্ম পরছি, এটা চামড়ার মতো হয়ে গেছে। এটা খুলে রাখার কথা ভাবলেই কষ্ট হয়।’ তেমনি খেলোয়াড়দের কাছে জাতীয় দলের জার্সিও তো আবেগ-অনুভূতির অন্য নাম। তবে পেশাদার জগতে নতুন এসে পুরনোর জায়গা নেবে, এটাই স্বাভাবিক। ‘হেথা হতে যাও পুরাতন’, এ কথা ওঠার আগেই চলে যাওয়াটা শোভনীয়।
১৯৫০ বিশ্বকাপ ফাইনালে ব্রাজিল দলের গোলরক্ষক ছিলেন বারবোসা, তাকে ফাঁকি দিয়েই জয়সূচক গোলটা করেছিলেন উরুগুয়ের আলসিদেস ঘিঘিয়ে। এরপর যত দিন বেঁচেছিলেন, একরকম অচ্ছুত হয়েই থাকতে হয়েছে বারবোসাকে। ১৯৯৩ সালে একবার ব্রাজিলের ম্যাচে তাকে ধারাভাষ্য দিতে দেওয়া হয়নি। জাতীয় দলের ড্রেসিংরুমে তো নয়ই, এমনকি অনুশীলনেও প্রবেশাধিকার ছিল না তার। এমনই অপয়া মনে করা হতো তাকে। বারবোসা আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘ব্রাজিলে জেল খাটার সর্বোচ্চ সময়সীমা ৩০ বছর। আমার ক্ষেত্রে তো সেটি আরও ১৩ বছর বেশি হয়ে গেছে। পেশাদার খেলাধুলার জগতে সবাই রোহিত-কোহলির মতো সৌভাগ্যবান হয় না, কেউ কেউ বারবোসাও হয়। বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের বোধ হয় এই ব্যাপারটাও জেনে রাখা দরকার।