বার্বাডোজে বিশ্বকাপ জিতেও আতঙ্কে রোহিত শর্মারা, কারণ ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় বেরিল। শিরোপা নিয়ে দেশে ফিরবেন ভারতীয় ক্রিকেটাররা নাকি সাগরে ভেসে যাবেন এই নিয়ে বেশ কিছু গণমাধ্যম আতঙ্ক ছড়ালেও শেষপর্যন্ত বড় কোন ক্ষতির কারণ হয়নি এই ঘূর্ণিঝড়। শুধু মাঝখান দিয়ে বিমান চলাচল বন্ধ থাকায় জিম্বাবুয়ে সফরের দলে দেরিতে যোগ দিচ্ছেন ভারতের রিজার্ভ বেঞ্চের কয়েকজন ক্রিকেটার।
বাংলাদেশেও মঙ্গলবার বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের নিয়মিত বোর্ড পরিচালকদের সভার আগেও এরকমই আতঙ্ক ছড়িয়েছিল কিছু চিহ্নিত গণমাধ্যম। সেই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও হৈ চৈ। চাকরি হারাচ্ছেন চন্ডিকা হাথুরুসিংহে, অধিনায়কত্ব হারাচ্ছেন নাজমুল হোসেন শান্ত, কোচের পদে আসতে যাচ্ছেন মোহাম্মদ সালাউদ্দিন, এমন সব ভবিষ্যতবাণীর ছড়াছড়ি। তবে মাসটা আষাঢ় আর এই সবই তাই আষাঢ়ে গল্প হয়েই থাকল। ক্রিকেট বোর্ডের সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে প্রায় ১ ঘন্টা (৫৫ মিনিট) কথা বলেছেন বোর্ড সভাপতি এবং ক্রীড়া মন্ত্রী নাজমুল হাসান পাপন। সেই দীর্ঘ আলাপে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাকে নিয়ে যেসব রসিকতা চলে তা নিয়ে উষ্মা আছে। বিস্তর অবান্তর আলাপ আছে। আর আছে পরিকল্পনাহীনতার ছাপ।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সাকিব আল হাসান ও মাহমুদউল্লাহ প্রত্যাশিত পর্যায়ে ভাল খেলতে পারেননি। পরবর্তী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ পরিকল্পনায় (২০২৬, ভারত ও শ্রীলঙ্কা) তাদের রাখা হবে কি না এমন প্রশ্নে নাজমুল যুক্তি দিয়েছেন, ' এই যে সাকিব, ও তো টি-টোয়েন্টি খেলতে যাচ্ছে। ওখানে গিয়ে যদি খেলা শুরু করে দেয়, তাহলে কি বাদ দিতে পারবেন? নাকি আমি দিব? আমি তো ওকে আরো তাড়াতাড়ি নিয়ে আসব যে জলদি আসো। এগুলা পারফরম্যান্সের উপর নির্ভর করে। কিন্তু আমি আপনাদেরকে একটা কথা বলতে চাই, শুধু সাকিব নয়, আজকে বাংলাদেশের ক্রিকেট যে জায়গায় এসেছে সেখানে সাকিব, তামিম, মুশফিক, রিয়াদ এদের প্রত্যেকের অবদান এত বেশি যে এই সময়ে এসে ওদের দলে চান্স পাওয়া বা ভাল খেলার প্রমাণ করা এটা ওদের জন্য অপমানজনক। আমরা চাই ওরা ওদের সেরাটা খেলে অবসরে যাক।' বোর্ড প্রধানের এই উত্তরেই বোঝা যায়, তার দৃষ্টি আগামীর দিকে নাকি অতীতে।
অনেক সমালোচনা হয়েছে আফগানিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশ সেমিফাইনালে যাবার সুযোগটা না নেয়ায়। বিসিবি সভাপতি মনে করেন ঠিকই করেছে বাংলাদেশ, চেষ্টা করেছে, 'আমি একটা ব্যাপারের উত্তর দিতে পারছি না, তা হল আমাদের অধিনায়ক বলেছে যে ৩ উইকেট পড়ার পর আমরা চেষ্টা করিনি। এটা কিন্তু গ্রহণযোগ্য না। কিন্তু আমি যতক্ষন খেলা দেখেছি ততক্ষণ এমনটা মনে হয় নাই। যতক্ষণ পর্যন্ত তাওহীদ হৃদয় ছিল ততক্ষণ ওরা চেষ্টা করেছে। মাহমুদউল্লাহ ও রিশাদও রশিদ খানকে ছয় মারতে গিয়ে আউট হয়েছে।'
'আমরা প্রথম থেকেই বলছি। ওর (শান্তর) এই কথার সঙ্গে আমরা একমত না। এটা কোন ভাবে মেনে নেয়া যায় না। ১২ ওভার পর্যন্ত (আফগানিস্তানের বিপক্ষে) আমাদের লড়াই করা উচিত ছিল। দেখলাম যে যখন রক্ষণাত্মক খেলার দরকার ছিল তখন মেরে খেলেছে। আর যখন মেরে খেলার দরকার ছিল তখন রক্ষণাত্মক খেলেছে। ১২ ওভারে ১১৫ রান টি-টোয়েন্টিতে করা কোন ব্যাপারই না। এটা আমি মেনে নিচ্ছি। কিন্তু ওই উইকেটে কেউ কি ওই রান করতে পেরেছে। অস্ট্রেলিয়াও তো আফগানিস্তানের কাছে হেরেছে ওই উইকেটে। ওই কন্ডিশনটা সহজ ছিল না কিন্তু ওরা (বাংলাদেশ ব্যাটাররা) চেষ্টা করেছে।'
বিশ্বকাপের সময় যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী এক রাজনৈতিক নেতার বাসায় ক্রিকেট দলের সবার দাওয়াত খেতে যাওয়ার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ক্রীড়া মন্ত্রীর উত্তর, 'এটা নিয়ে আলাপ হয়েছে। আলাপ না হওয়ার কোন কারণ নাই। এখানে আলাপ হয়েছে যে এদের তো বাইরে যেতে পারার কথাই না। উইথআউট বোর্ডস পারমিশন। আমি জিজ্ঞেস করেছি যে বোর্ড থেকে পারমিশন নেয়া হয়েছে কি না।' ভারতের সঙ্গে ম্যাচের সকালে তাসকিনের দেরিতে মাঠে পৌঁছানোর ব্যপারে নাজমুলের বক্তব্য, 'সকালে টিভি খুলে যখন দেখলাম তাসকিন খেলছে না তখন সঙ্গে সঙ্গে আমি ফোন দিয়েছি রাবিদকে (মিডিয়া ম্যানেজার)। রাবিদ বলল যে ও টিমবাস মিস করেছে তবে ও এসেছে। হয়তো একটু দেরি করে এসেছে। এখন কেন আসে নাই, কেন দেরি হয়েছে সেই রিপোর্টটা না পাওয়া পর্যন্ত...একটা হচ্ছে আমি নিজেই ডেকে জিজ্ঞেস করা তবে বেস্ট ওয়ে হচ্ছে রিপোর্ট (কোচ ও ক্যাপ্টেনের ) আশা পর্যন্ত অপেক্ষা করা।'
ক্রীড়াঙ্গণের অভিভাভবক হয়ে ওঠা সাবেক রাষ্ট্রপতিপুত্র এবং ক্রীড়ামন্ত্রী নাজমুল প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে জাতীয় দলের সঙ্গে এখন আর তার সংশ্লিষ্টতা আগের মত নেই। আগে যেমন একই হোটেলে থাকতেন, সকালে প্রাতরাশের টেবিলে কথা বলতেন এখন গত প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে তার সম্পৃক্তা কম। এখন তিনি খেলা দেখতেও কম যান, ওয়েস্ট ইন্ডিজে যাননি আর ওয়ানডে বিশ্বকাপে এক ম্যাচে গেছেন। এমন অনেক আলাপই হয়েছে, যাতে হাসির ফোয়ারা ছুটেছে দর্শকসারীতে বসা সাংবাদিকদের ভেতর। কিন্তু মৌলিক কোন সমস্যার সমাধান আসেনি এই বৈঠকে। সাবেক প্রধান নির্বাচক এবং চিফ কো-অর্ডিনেটর অব প্রোগ্রাম মিনহাজুল আবেদীন বলেছিলেন নতুন একটি টি-টোয়েন্টি ঘরোয়া প্রতিযোগিতার কথা। এই টুর্নামেন্টের রূপরেখা নিয়ে কোন আলোচনা হয়নি। বরং কেন বাংলাদেশ দল যুক্তরাষ্ট্রে ঐচ্ছিক অনুশীলনে যায়নি এসব নিয়েই নাকি আলোচনা হয়েছে বেশি। সেই সঙ্গে বিসিবি প্রধান সতর্ক করে দিয়েছেন সেই সব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীদের, যারা তার নামে বিভিন্ন ভুয়া খবর ছড়িয়ে বেড়ান! এরপর নাকি আইনি ব্যবস্থা নেবে বিসিবি।
কিছুদিন আগে কিশোরগঞ্জে এক রাজনৈতিক সভায় নাজমুল যে বক্তৃতা করেছিলেন, বিসিবি সভার পর তার কাছ থেকে পাওয়া প্রশ্নের উত্তরের সঙ্গে তার অমিল সামান্যই। এবং এটাই প্রধানতম সমস্যা। দেশের ক্রিকেট যারা চালান, তারা মনে করছেন সব চলছে ঠিকমতই। বিশ্বকাপে সুপার এইটে ওঠাটাই সাফল্য, বাকিটা বোনাস। তারা এটাও মনে করেন কতিপয় ক্রিকেটার অতীত পারফরম্যান্সের জোরে যতদিন খুশি খেলে যেতে পারবেন। স্বয়ং বোর্ড সভাপতির কথাতেই যদি এইসব ইঙ্গিত থাকে তাহলে নির্বাচকরা কিভাবে সামনের দিকে হাঁটবেন? তাই তো দেশের ক্রিকেট থেকে যায় তিমিরেই, পাক খেয়ে যায় ব্যর্থতার একই আবর্তে।