ইউরোর শেষ ষোলোর ম্যাচে প্রথম কোনো টাইব্রেকার শুটআউট। প্রথম ৯০ মিনিট ও এরপর অতিরিক্ত ৩০ মিনিট খেলার পরও ফল না আসায় এমন অবস্থার সামনে স্লোভেনিয়া ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর্তুগাল। প্রথম শটটি নিতে এলেন স্লোভেনিয়ার জোসিপ ইলিচিচ। তার সামনে পাহাড় হয়ে দাঁড়ানো পর্তুগিজ গোলরক্ষক দিয়োগো কস্তা। ইলিচিচ শট নিলেন, ডান দিকে ঝাঁপিয়ে তা ঠেকিয়ে দিলেন কস্তা। অতিরিক্ত সময়ে সুযোগ হাতছাড়া করলেও এবার কোনো ভুল করেননি রোনালদো, বল জড়ালেন জালে। দ্বিতীয় শট নিলেন জুর বালকোভেচ। সুবিধাজনক উচ্চতায় পেলেন কস্তা। ঠেকিয়ে দিলেন এ শটও। পর্তুগালের হয়ে ঠান্ডা মাথায় জাল খুঁজে নিলেন ব্রুনো ফার্নান্দেজ। বেঞ্জামিন ভারবিচ এলেন স্লোভেনিয়ার তৃতীয় শটটি নিতে। এবারও ডান দিকে ঝাঁপিয়ে কস্তা সুরক্ষিত রাখলেন নিজের গোল। পরের শটে বার্নার্দো সিলভার লক্ষ্যভেদেই নিষ্পত্তি হয়ে গেল ম্যাচের ফল। ইউরোপের যেকোনো দেশকে ছাপিয়ে সবচেয়ে বেশি সপ্তমবারের মতো ইউরোর কোয়ার্টার ফাইনালে উঠল পর্তুগাল। আর প্রথম গোলরক্ষক হিসেবে ইউরোর কোনো শুটআউটে তিনটি শট ঠেকিয়ে দিয়ে ম্যাচসেরার পাশাপাশি অতিমানবে পরিণত হলেন দিয়োগো কস্তা।
ফ্রাঙ্কফুর্টে সোমবার রাতের ম্যাচে স্লোভেনিয়ার বিপক্ষে একটাই লক্ষ্য নিয়ে নেমেছিল পর্তুগাল। আক্রমণে আক্রমণে প্রতিপক্ষের নাভিশ্বাস তুলে দেওয়া। রোনালদো-সিলভারা নিজেদের মধ্যে একাধিক পাস খেলতে খেলতে আক্রমণে উঠলেও স্লোভেনিয়ার রক্ষণকে টলাতে পারছিলেন না তারা। বক্সের কাছে গিয়ে থেমে যাচ্ছিল পর্তুগালের আক্রমণ। শুধু তাই নয়, পর্তুগালকে চিন্তায় ফেলে মাঝেমাঝেই প্রতি আক্রমণে উঠে আসছিল স্লোভেনিয়া। সঙ্গে রোনালদোকে কড়া মার্কিংয়ে রাখার কাজটি জুতসইভাবে পালন করছিলেন রক্ষণভাগের খেলোয়াড়রা। ৮ মিনিটে রোনালদোকে শট নিতে আটকে দেন। ৩০তম মিনিটে হেডে পারদর্শী রোনালদো কোনোরকমে মাথা ছোঁয়ান বলে। এর কিছু সময় পর বক্সের বাইরে থেকে তার নেওয়া ফ্রি কিকও উড়ে যায় বারের ইঞ্চিখানেক ওপর দিয়ে। গোলহীনভাবেই শেষ হয় প্রথমার্ধ।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেও পর্তুগালের দাপট ছিল বেশি। এবার স্লোভেনিয়াও জবাব দিচ্ছিল বেশ। পর্তুগাল একবার আক্রমণে উঠলে পর মুহূর্তেই স্লোভেনিয়া উঠে যাচ্ছিল ওপরে। ৫৪ মিনিটে আবার ভালো জায়গায় একটি ফ্রি কিক পেয়েছিল পর্তুগাল। সজোরে নেওয়া রোনালদোর সেই শট ফিস্ট করে মাঠের বাইরে বের করে দেন গোলরক্ষক ওবলাক। হাল না ছাড়া স্লোভেনিয়াও নষ্ট করে সুযোগ। নির্ধারিত সময়েও তাই ভাঙেনি ডেডলক।
অতিরিক্ত সময়ের খেলায় আত্মবিশ্বাসী স্লোভেনিয়ার সামনে কিছুটা ক্লান্ত দেখাচ্ছিল পর্তুগালকে। তবুও প্রথমার্ধের শেষ দিকে পেনাল্টি পায় পর্তুগাল। পেনাল্টি নিতে যান রোনালদো। রোনালদোকে ভালোই চেনেন ওবলাক। বাঁদিকে ঝাঁপিয়ে ঠেকিয়ে দেন রোনালদোর শট। মিস করার পরেই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলেন রোনালদো। হাত সরাতে দেখা যায় তার চোখে জল। সতীর্থরা ছুটে এসে তাকে সান্ত্বনা দিলেও কান্না থামছিল না পর্তুগিজ অধিনায়কের। তখনো ম্যাচের ১৫ মিনিট বাকি। তখনো সুযোগ ছিল পর্তুগালের কাছে। সেটা বোঝা যাচ্ছিল না রোনালদোর কান্না দেখে। মনে হচ্ছিল তার দল বিদায় নিয়েছে।
১১৫ মিনিটের মাথায় ম্যাচের সহজতম সুযোগ পেয়েছিল স্লোভেনিয়াই। পাস দিতে গিয়ে পেপের পা থেকে বল ফসকে যায়। সামনেই ছিলেন সেসকো। বল নিয়ে এগোতে থাকেন তিনি। সামনে একা পর্তুগালের গোলকিপার ছাড়া কেউ ছিলেন না। কোনাকুনি শট মেরেছিলেন সেসকো। অনেকটা বিশ্বকাপ ফাইনালের দিবু মার্তিনেজের মতো সেই শটটি বাঁ পা দিয়ে বাঁচিয়ে দেন দিয়োগো কস্তা। এরপর টাইব্রেকারে রচনা করেন নিজের বীরত্বের গল্প। বলেন, ‘আমি মনে করি এটিই আমার জীবনের সেরা ম্যাচ ছিল। এমন একটি ম্যাচ যেখানে আমিই সবচেয়ে কার্যকর ছিলাম। দলকে সাহায্য করতে পেরে আমি অনেক অনেক খুশি ও রোমাঞ্চিত।’ এবার কিলিয়ান এমবাপ্পেদের বিপক্ষে তার বীরত্বগাথার দ্বিতীয় পর্ব দেখতে চাইবেন পর্তুগিজ ও রোনালদো সমর্থকরা।