নারীমনের বিভ্রম ও সংকট

রক্তের অক্ষরে
অবিশ্রাম লিখিতেছে বৃদ্ধ মহাকাল
বিশ্বপত্রে জীবের ক্ষণিক ইতিহাস।
-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সময়ালোচিত লেখক আফসানা বেগম একাধারে গল্পকার, ঔপন্যাসিক ও অনুবাদক। তার গল্প-উপন্যাসে নারীর বাস্তবজগৎ ও মনস্তাত্ত্বিক বিষয়-আশয়গুলো সবিস্তারে বর্ণিত হতে দেখা যায়।

লেখকের বহুল আলোচিত ‘কোলাহল থামার পরে’ উপন্যাসে নারীর প্রতি সমাজ ও পুরুষের সহিংস মনোভাব, বিভিন্ন দেশের মধ্যে সংস্কৃতির পার্থক্য, জীবনযাপনের ধরনগুলো ‘প্রতিচ্ছায়া’ উপন্যাসে নেই, তবে সেখানে কেন্দ্রে নারী ছিল, এখানেও আছে, আর আছে স্ট্রিম অব কনশাসনেস।

স্ট্রিম অব কনশাসনেস বা চেতনপ্রবাহরীতি কেবল একটি শব্দ নয়, এ এক অনন্য, এক স্বতন্ত্র জঁর। উপন্যাসের বক্তা মিমির ব্যক্তিমনের অভ্যন্তরের সংকট কীভাবে দলা পাকিয়ে ঘাতকের রূপ নেয়, তা প্রকট হয়ে উঠেছে এখানে।

মা ও খালার যৌথ শাসনে জীবনের স্বাদ ও সাধ পূরণের সব দুয়ার থেকে বিতাড়িত হয়ে বেড়ে ওঠা মিমি বিয়ের কনে হিসেবে ছেলেদের সামনে নিজেকে উপস্থাপন করতে করতে একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পাভেলের সঙ্গে বিয়ে হয়। বিয়ের আগে পাভেল তার দীর্ঘদিনের পুরনো প্রেমিকা নিশীথিনীর কথা জানায়। মিমি সেটা মেনেও নেয়। পাভেল বিস্তারিত জানাতে চাইলেও মিমি তখন শুনতে চায় না। কিন্তু বিয়ের পর, একাকী থাকতে গিয়ে নিশি যেন অন্ধকার করে দেয় মিমির জীবন। তার জন্য পাভেলের সরল মনও খানিকটা দায়ী। নারী প্রকৃতির মতোই বিচিত্র, বৈচিত্র্যের শিরোমনি। কখনো কখনো সরলতাও অনেক সমস্যার সমাধান করে দেয়। পাভেল কিংবা আধুনিক মানুষ সম্পর্কে জড়ানোর আগে শেষের পথে এগোয়। কিন্তু মিলির ক্ষেত্রে তার ভিন্নতর ছায়া দেখা যায়। সে নিশিকে আবিষ্কারের চেষ্টায় মত্ত হয়ে ওঠে। ঘরের আয়না, আসবাব, দেয়ালে নিশির স্পর্শ খুঁজে বেড়ায়। এক সময় নিজেকে ওই নারীর আদলে সাজানোর চেষ্টা করে, ওই নারী হয়ে স্বামীর আদর চায়। কিছুদিন পর মিমির ভুল ভাঙে। তুমি আমাকে ভালোবাসো না, তুমি নিশিকে ভালোবাসো বলে পাভেলের কাছে অভিযোগ করে। মেকি, বানানো সবকিছু আবার ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেয়। কিন্তু বুকের গহিনে থাকা নিশির প্রতিচ্ছায়া মুছে ফেলতে পারে না, বরং আরও জাগ্রত হয়ে মিমির চারপাশে ঘুরে বেড়ায়। এ যেন ‘চোখের বালি’র বিনোদিনী, আশালতার সবকিছুকে তার অসহ্য লাগে, জোর করে ছিনিয়ে নেওয়ার তাড়না তৈরি হয়। কিন্তু মিমির তো জোর করার কিছু নেই। সব থেকেও তার নিজেকে না দেখার মুহূর্তগুলোর ভয় তাড়া করে। মিমি ও পাভেলের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। এই দুঃসহ সময়ে ধেয়ে আসে আরেকটা মেয়ে, নাম রুমঝুম... যে পাভেলের ছাত্রী, একটু বেশি কাছের, যা মিমিকে আরও খান খান করে দেয়। ‘আমি পুরো পাভেলকে চাই নইলে তার এক কণাও আমার লাগবে না। বাড়িতে নির্লিপ্ত আমার সঙ্গে। অথচ যখন পড়াতে যেত, তখন? রুমঝুমের সঙ্গে নিশ্চয়ই...।’ মিমি ঘনঘোর মনঃকষ্টের ভেতর দিয়ে যায়। তারা তিনজন মিলে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলার ভয় মিলিকে পেয়ে বসে। সে রুমঝুমকে সরিয়ে দেওয়ার কথা ভাবে। কিন্তু তাতে স্বস্তি মেলে না। নিশি কিংবা অন্য কেউ পাভেলের জীবনে এসে পড়বে না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই সে পাভেলকে ইঁদুর মারার বিষ প্রয়োগে হত্যা করার, সব সমস্যার বংশবৃদ্ধি করার শিকড় উপড়ে ফেলার ‘ফিনিশ’ হাতে নেয়। কারণ পাভেল সব কষ্টের, যন্ত্রণার মূল। সে না থাকলে নিশি থাকবে না, রুমঝুম থাকবে না। পাভেল থাকলে নিশি ও রুমঝমের প্রতিকৃতি তার পিছু ছাড়বে না। তাদের ভয়ানক ভালোবাসার দৃশ্যগুলো চোখের সামনে ফুলের মতো ফুটে উঠবে কারণ প্রেম ক্লাসরুমে হয়, করিডোরে হয়, বাড়িতে হয়, সাজানো ঘরে হয়, তখন সে কোথাও থাকবে না। এটা সে সহ্য করতে পারবে না।

পাভেলের মৃত্যুযন্ত্রণার আঘাতে দামি চিনামাটির বাসন ভেঙে যায়, সোফার কভারে চায়ের দাগ লেগে যায়, মিমি কষ্ট পায় ঢের... পরক্ষণেই তার ভুল ভাঙে, এসব তো বদলানো যায়। সে সিদ্ধান্ত নেয়, এবার হালকা রঙের কভার নিজে পছন্দ করে কিনবে। একবারও স্বামীর জন্য তার আপসোস হয় না... স্বামীর চেয়ে, মানুষের চেয়ে দামি হয়ে ওঠে তার কাছে আসবাব। কতটা দুঃসহ যন্ত্রণা, মনঃকষ্ট তথা বিকারের মধ্যে বিচরণ করলে একজন মানুষ এমন হয়ে ওঠে! তবে ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাসের মহম্মদ মুস্তফার মতো মিলি অতটা ক্লান্ত ও গুমট নয়, নিঃসঙ্গ। একজন বাকাল নদী অপলক দেখতে দেখতে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়, আরেকজন নিজেকে জয়ী করতে প্রাণ নিতে এগিয়ে যায়। কেন এমনটা করে? মিলি ও পাভেল তো দাম্পত্যজীবনে সুখী, আর্থিকভাবে সচ্ছল। ‘আন্না কারেনিনা’ উপন্যাসের শুরুতে টলস্টয় বলছেন, ‘কেন সব সুখী পরিবার একই রকম? এবং কেন অসুখী পরিবারগুলো একে অপরের থেকে আলাদা? প্রশ্নটা আমার যেমন লিখতে সহজ লাগছে, আপনার পড়তেও কোনো অসুবিধা হচ্ছে না; আসলে বিষয়টি এত সহজ নয়। অথবা, সহজ করে দেখার ইচ্ছে করলেও সহজ করে কি দেখা যায়?’ আন্না কারেনিনা ছিল সরল থেকে জটিল, বিচিত্র থেকে করুণ রসাত্মক। তবে মিলির জটিল হয়ে ওঠা, জটিল করে চিন্তা করার মানসিকতার সঙ্গে কারুণ্যের সম্পর্ক নেই। আছে তার জিনিস অন্য কেউ ভোগ করার রাগ, অন্য কেউ কেড়ে নেওয়ার ভয়, নিজের জিনিস কাউকে পেতে না-দেওয়ার দৃঢ়প্রতিজ্ঞা।

নারী-পুরুষের বৈবাহিক সম্পর্কে পূর্বাভিজ্ঞতার প্রভাব নাকচ করে দেওয়া যায় না। অতীত জীবন থেকে বহন করা ট্রমা অনেক সম্পর্ককে ধ্বংস করে দেয়। পারিবারিক পরিবেশ, বেড়ে ওঠা সময়ের পারিপার্শ্বিকতা থেকে প্রাপ্ত মূল্যবোধ জগদ্দল পাথরের মতো মস্তিষ্কে জমাট বেঁধে থেকে জীবনব্যাপী তা চালিত করে। সে অপ্রকাশক হয়, সে মর্ম যন্ত্রণায় দগ্ধ হয়, সে ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে যায়, কিন্তু কারও সঙ্গে শেয়ার করতে চায় না, নিজের মনমতো সমাধান চায়, যা শেষমেশ নিবিড় সম্পর্ক, কখনো কখনো নিরপরাধ সঙ্গীর জীবনকেও ধ্বংস করে দেয়। মিমির ভেতরেও সেই ধ্বংসকারী সত্তা জাগ্রত হয়। তখন বিবেক, বুদ্ধি, ভালোবাসা পড়শিরূপ ধারণ করে দর্শকের ভূমিকা পালন করে। কারণ, এর আগে মিমি কোনো কিছুতে জেতেনি, নিজের পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে জয়ের আনন্দ উপভোগ করেনি, এবার সুযোগ আসায় সে তার যথোপযুক্ত কাজে লাগায়। যদিও তা অহিংসক নয়, আত্মঘাতী, তবু...

মিমি চরিত্রে চিন্তাভাবনা, আকস্মিকতা, স্বতঃস্ফূর্ততা ও অসামঞ্জস্যতা পাঠককে ঘূর্ণাবর্তে ফেলে দেবে। ‘জাগরী’ উপন্যাসে সতীনাথ ভাদুড়ী চরিত্রের মনের গভীরে তন্ন তন্ন করে ঢুঁড়ে মানবিক চেতনার পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলাফল উন্মোচিত করে, মনের জটিল বিন্যাস চরিত্রের অভ্যন্তরে পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসন্ধানের মাধ্যমে পাঠকের সামনে হাজির করেছেন নিপুণ হাতে।

অনুরূপভাবে, মিমির আত্মঘাতী মর্মবেদনা অনায়াস দক্ষতায়, নিপুণ বিশ্বাসযোগ্যতায় ও সাবলীল বর্ণনায় তীব্র ও তীক্ষèতর এক বিস্ময়কর পরিণতি দান করেছেন লেখক।

বাক্যের গঠনে মগ্নচৈতন্যের প্রতিফলন খণ্ড খণ্ড হয়ে খানিকটা বিস্তৃতি লাভ করলেও বিরামচিহ্নের অনুপস্থিতির নজির মেলে না। উত্তম পুরুষে বলে যাওয়া উপন্যাসে কোনো খণ্ড বা অধ্যায় নেই। শুরু থেকে শেষাবধি নারীমনের উঁচু-নিচু ঢেউ, সুশ্রী-বিশ্রী চিন্তা, বর্ণনাশৈলীর গভীরতা চিত্তাকর্ষক।

এমন বেগবান ভাষা, এমন সহজতর ভাষা, এমন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরা ভাষা উপন্যাসের প্রাণপ্রতিষ্ঠা করেছে। মিলির খালা, মা কিংবা ছোট বোন শপিংমলে দেখা হওয়া অচেনা মানুষের মুখের মতো নয়, শীতের ঝরাপাতার মতো নয়; তারা যেন ছোটবেলার আনকোরা স্মৃতির মতো, বর্ষার কদমের মতো স্নিগ্ধ সুষমায় ভরপুর। তবে রুমঝুমকে আরও একটু স্পেস দিয়ে মত্থিত করলে মিমির সরলরৈখিক জটিলতার ঘনঘটা জমে ক্ষীর হয়ে যেত। পাভেলকে আরও সক্রিয় করলে মিমির মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের কর্কটরসে পাঠক মন জারিত হয়ে যেত।

ব্যক্তির মনস্তাত্ত্বিক সংকটের দিক থেকে উপন্যাসটি উর্বর। গল্প বলার ঢং ও স্বতঃস্ফূর্ততায়, ঘটনা-বিষয়বস্তুর বর্ণনার অসাধারণত্বে বিশেষ করে উপন্যাস পাঠ শেষে সচেতন পাঠক বিস্ময়াভিভূত হয়ে যাবেন, নবীন পাঠক রাগ-ক্ষোভ-ঘৃণা উগরে দেবেন।

প্রতিচ্ছায়া উপন্যাসের কিছু চমৎকার উদ্ধৃতি :

প্রায় নতুন বানানো বাদামি রঙের কভারে কী বিশ্রী একটা দাগ যে হলো। হয়তো কোনো দিন উঠবে না। কিন্তু তাতে কী, কভার তো আবার বদলে ফেলাই যায়।

আমি তো কতদিন ধরে তোমাকে চাচ্ছি, তুমি কেন বোঝ না?

নিজের ভেতর পুড়তে পুড়তে একদিন দেখলাম আমি নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছি। কদিন পরে তো ছাইটা দেখলেও কেউ চিনতে পারবে না যে, এই আগুন আমার ছিল।

নিজেরা ছোঁয় না কাউকে, কিন্তু ভিড়ের ঠেলায় মেয়েদের শরীরই তাদের ছুঁয়ে যায়। তাদের ওটুকুই মজা লাগে।

পাঠক, অনাকাক্সিক্ষত কিন্তু আরোপকৃত নয়, এমন নির্মম-নিষ্ঠুরতার ধাক্কা সহ্য করতে না পারলে উপন্যাসটি পড়ার দরকার নেই।