সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহালের প্রতিবাদ ও কোটা সংস্কারের দাবিতে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বৃহস্পতিবার (৪ জুলাই) বেলা পৌনে ১১টা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে এ কর্মসূচি পালন করেন তারা। পরে দুপুর ১২টা ১০ মিনিটের দিকে অবরোধ প্রত্যাহার করেন শিক্ষার্থীরা।
আন্দোলন চলাকালে বৃষ্টি বাগড়া দিলে সেই বৃষ্টি উপেক্ষা করে আন্দোলন চালিয়ে যান শিক্ষার্থীরা। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তাদের এই আন্দোলন চলবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।
এর আগে সকাল সাড়ে ৯টা থেকেই শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যারিস রোডে জড়ো হতে থাকেন। সকাল ১০টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যারিস রোডে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন তারা। পরে মিছিল নিয়ে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করেন। এ সময় বৃষ্টি শুরু হলে শিক্ষার্থীরা বৃষ্টিতে ভিজেই আন্দোলনকে বেগবান করেন। তবে মহাসড়ক অবরোধকালে অ্যাম্বুলেন্স ও রোগী বহনকারী ইজিবাইক ও মাইক্রোবাসকে যাতায়াতের ব্যবস্থা করে দেন শিক্ষার্থীরা। পরে দুপুর সোয়া ১২টার দিকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন তারা। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক থেকে কাজলা গেট হয়ে প্যারিস রোডে এসে শেষ হয়। এতে বিভিন্ন বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের দুই হাজারেরও অধিক শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন।
‘শিক্ষার্থীবৃন্দ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়’- এর ব্যানারে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। বিক্ষোভ চলাকালে শিক্ষার্থীরা চারটি দাবি উত্থাপন করেন। দাবিগুলো হলো, ২০১৮ সালের পরিপত্র বহাল সাপেক্ষে কমিশন গঠন করে সরকারি চাকরিতে কোটাপদ্ধতি সংস্কার করতে হবে, তবে কোটায় প্রার্থী না পাওয়া গেলে মেধাকোটায় শূন্যপদ পূরণ করতে হবে; ব্যক্তি তার জীবদ্দশায় সব ধরনের সরকারি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় একবার কোটা ব্যবহার করতে পারবে, এর মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা অন্তর্ভুক্ত থাকবে; প্রতি জনশুমারির সাথে অর্থনৈতিক সমীক্ষার মাধ্যমে বিদ্যমান কোটার পুনর্মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে; দুর্নীতিমুক্ত, নিরপেক্ষ ও মেধাভিত্তিক আমলাতন্ত্র নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা এ আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন। এরই ধারাবাহিকতায় আগামীকাল শুক্রবার সকাল ১০টায় একই কর্মসূচি পালন করা হবে বলে জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
এ সময় শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন লেখা-সংবলিত প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন। কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীরা ‘সারা বাংলা খবর দে, কোটা পদ্ধতির কবর দে’, ‘দেশটা নয় পাকিস্তান, কোটার হোক অবসান’, ‘মেধাবীদের কান্না, আর না আর না’, ‘কোটা-বৈষম্য নিপাত যাক, মেধাবীরা মুক্তি পাক’, ‘মেধাবীদের যাচাই করো, কোটাপদ্ধতি বাতিল করো’, ‘মুক্তিযুদ্ধের বাংলায় কোটা পদ্ধতির ঠাঁই নাই’, ‘১৮-এর হাতিয়ার, গর্জে উঠুক আরেকবার’, ‘বৈষম্যর বিরুদ্ধে লড়াই করো একসাথে’, ‘ঝড় বৃষ্টি আধার রাতে, আমরা আছি রাজপথে’ ইত্যাদি স্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ করেন। এ ছাড়া বিক্ষোভ চলাকালে বিখ্যাত কবিদের বিভিন্ন প্রতিবাদী কবিতা ও সংগ্রামী গান পরিবেশন করা হয়।
বিক্ষোভ কর্মসূচির মুখপাত্র ও রাকসু আন্দোলন মঞ্চের সদস্য সচিব আমানুল্লাহ আমান বলেন, ‘আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। আমরা হাইকোর্টের বিচারকদের মতো জ্ঞান রাখি না। তবে আমরা এটা জানি, এক শতাংশের কম জনসংখ্যার জন্য ৩০ শতাংশ কোটা অন্যায্য। এটা বুঝতে পৃথিবীর কোনো আইন জানা লাগে না। আমাদের দাবিগুলো স্পষ্ট, আমাদের আইন বুঝার দরকার নেই। দাবি কিভাবে আদায় করতে হয় তা বঙ্গবন্ধু আমাদের শিখিয়েছেন। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের ধারাবাহিক আন্দোলন চলমান থাকবে।’
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাত্মতা জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন খান বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো যৌক্তিক। এই রাষ্ট্রের জন্মের পেছনে সমতাভিত্তিক সমাজব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা অন্যতম প্রধান কারণ ছিল। রাষ্ট্রের চোখে সকল নাগরিক সমান। এ ব্যাপারে কোনো বিভেদ সৃষ্টি করলে সেটা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী হবে।
গত ৫ জুন সরকারি প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধাসহ অন্য কোটা বাতিল করে জারি করা পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। ফলে সরকারি চাকরিতে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহাল থাকবে। মুক্তিযোদ্ধা সন্তানের করা এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা রুল যথাযথ ঘোষণা করে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ এ রায় দেন।