হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে সেপ্টেম্বরে বসবে দাবা অলিম্পিয়াড। প্রতিবারের মতো এবারও ওপেন ও মহিলা বিভাগে অংশ নেবে বাংলাদেশের দুটি দল। সদ্যসমাপ্ত মহিলা দাবা চ্যাম্পিয়নশিপের সেরা পাঁচ দাবাড়ু মহিলা বিভাগে প্রতিনিধিত্ব করবেন বাংলাদেশের। দাবা কিংবদন্তি রানী হামিদ এবার ষষ্ঠ হওয়ায় শুরুতে ছিলেন না দলে। তবে রানার্স-আপ হওয়া শারমিন সুলাতানা শিরিন ব্যক্তিগত কারণে সরে দাঁড়ানোয় ৮২ বছর বয়সে বাংলাদেশ দলের হয়ে অলিম্পিয়াডে অংশ নেবেন রানী হামিদ। মহিলা দলের মতো ওপেন বিভাগে অংশ নেবেন জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের সেরা পাঁচ দাবাড়। যে দলের সদস্য হতে পারতেন সদ্যপ্রয়াত গ্র্যান্ডমাস্টার জিয়াউর রহমানও। জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে খেলা চলাবস্থায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন বাংলাদেশের দ্বিতীয় গ্র্যান্ডমাস্টার। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন পয়েন্ট তালিকার দ্বিতীয় স্থানে। যে কারণে অলিম্পিয়াডে জিয়ার থাকাটা নিশ্চিত হয়েছিল আগেই। তবে মৃত্যু নামক অবধারিত নিয়তির কাছে হেরে গেলেন তিনি। সেই আক্ষেপ নিয়ে তিনি এখন অনন্ত পথের যাত্রী।
অনেক ক্ষেত্রেই জিয়া ছিলেন অনন্য। জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে সবচেয়ে বেশিবার (১৪) শিরোপা জয়ের রেকর্ড তার। ফিদে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ পাঁচবার বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। জাতীয় দলে নাম লেখানোর পর থেকে সবকটি অলিম্পিয়াডে অংশ নিয়েছেন। ১৯৮৮ সাল থেকেই জাতীয় দলে খেলেছেন একটানা। এবারও বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার কথা ছিল। এটাই আক্ষেপ হয়ে ঝরল আন্তর্জাতিক আরবিটার হারুনুর রশীদের কণ্ঠে। সাবেক এই দাবাড়ু বয়সে জিয়ার বেশ বড়। হারুনের সতীর্থ ছিলেন জিয়ার বাবা পয়গামউদ্দিন আহমেদ। অতীতের স্মৃতি হাতড়ে হারুন বলেন, ‘জিয়া নিশ্চিত রানার্স-আপ হতো। চ্যাম্পিয়নশিপের সম্ভাবনাও ছিল। অথচ এভাবে ওর চলে যাওয়া মানতে পারছি না। ফেডারেশন অফিসে এলেই সেই মুহূর্তের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। খেলতে খেলতে এলিয়ে পড়েছিল ও। জ্বর-সর্দি নিয়ে খেলছিল বলে ভেবেছিলাম দুর্বলতার কারণে হয়তো জ্ঞান হারিয়েছে। বিশ্বাস ছিল হাসপাতালে নেওয়ার পর সুস্থ হয়ে উঠবে। কিন্তু নেওয়ার পথেই সব শেষ...।’
নিয়াজ মোরশেদ কেবল দেশের নয় দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার। এখনো খেলে যাচ্ছেন তিনি। অথচ এই কিংবদন্তিও কখনো বাংলাদেশ দল জিয়াকে ছাড়া কল্পনা করতে পারতেন না। হারুন বলেন, ‘একবার জিয়া দাবা অলিম্পিয়াডে খেলতে চাননি এক তরুণ খেলোয়াড়কে সুযোগ দিতে। শুনে নিয়াজ বলেছিল, এসব কী বলো জিয়া? তোমাকে ছাড়া তো জাতীয় দল চিন্তাই করা যায় না। এসব আর বলবে না।’
দেশের পাঁচ গ্র্যান্ডমাস্টারের মধ্যে জিয়াই ছিলেন ব্যতিক্রম। হারুন জানান, কেবল জিএম নয়, দেশের অন্য কোনো দাবাড়ু দাবাকে পেশা হিসেবে নেননি যেটা নিয়েছিলেন জিয়া, ‘ওর জীবনটাই দাবাকে ঘিরে। ওর সামনে অনেক বড় বড় সুযোগ ছিল। কানাডা, অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত দেশের নাগরিকত্ব নিয়ে জাতীয় দলে খেলতে পারত। শিক্ষাগত যোগ্যতা যা ছিল চাইলেই মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানির বড় পদে চাকরি করতে পারত, যেটা এখন করছে আরেক জিএম রিফাত বিন সাত্তার। সে সব কিছুই করেনি জিয়া। দাবাকে ভালোবেসে দেশকে ভালোবেসে এখানেই থেকে গেছে। খেলেছে আর দেশে-বিদেশে কোচিং করিয়েছে।’
এরপর যোগ করেন, ‘আসলে গুণীর কদর বেঁচে থাকতে তো আমরা করি না। ফিদের ওয়েবসাইট কিংবা ফেসবুক পেইজ খুলে দেখুন, বিশ্বের কত বড় বড় দাবাড়ু তার মৃত্যুতে শোক জানিয়েছে। কেবল বাংলাদেশ নয় ও বিশ্বের অনেক দাবাড়ুকে কোচিং করিয়েছে। ওর কোচিংয়ে ভারতের কমপক্ষে পাঁচ থেকে ছয়জন গ্র্যান্ডমাস্টার নর্ম পেয়েছে।’ সাবেক দাবাড়ু মোরসালিন আহমেদ জিয়া সম্পর্কে বলেন, ‘উনি খুব কমই ভারতে গিয়ে কোচিং করাতেন। বেশিরভাগ সময় ভারতের অনেক দাবাড়ু ঢাকায় এসে মাসের পর মাস থেকে জিয়ার কাছ থেকে দীক্ষা নিয়ে গেছেন। এছাড়া মালয়েশিয়া জাতীয় দলের কোচ ছিলেন তিনি। তার মতো প্রতিভা আর আসবে কি না বলা যায় না। বাংলাদেশের একমাত্র পেশাদার দাবাড়ু জিয়া এবং আমি মনে করি বিগত দুই দশকে দেশের সেরা দাবাড়ু তিনি। অথচ এটা নিয়ে তার কোনো অহংকার ছিল না। ভীষণ নিভৃতচারী, ভীষণ রকমের অন্তর্মুখী, নির্ঝঞ্ঝাট মানুষ ছিলেন জিয়া। তার মতো মানুষ এ যুগে পাওয়া সত্যি কষ্টকর। জিয়ার অকাল মৃত্যুটা দাবার মানুষ হিসেবে কোনোভাবেই মানতে পারছি না।’
দাবাই ছিল জিয়ার ধ্যানজ্ঞান। আর তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিলেন স্ত্রী তাসমিন রহমান লাবণ্য ও একমাত্র সন্তান ফিদে মাস্টার তাহসিন তাজওয়ার জিয়া। স্ত্রী-সন্তানের ওপর এতটাই নির্ভর ছিলেন যে দেশে-বিদেশে যেখানেই খেলতে যেতেন সেখানেই সঙ্গী হতেন তারা দুজন। যে কারণে কোচিং করিয়ে কিংবা খেলে যতটুকু আয় করতেন তার পুরোটাই ব্যয় হয়ে যেত বিমান আর হোটেল ভাড়ায়। সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে মোহাম্মদপুরে একটা ফ্ল্যাট করতে পেরেছিলেন জিয়া। ওইটুকুই। বাকি গল্পটা শুধুই আত্মত্যাগ ও অপ্রাপ্তির। কেবল নিজে আত্মত্যাগ করেননি। স্বামীকে সেরা দাবাড়ু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে স্ত্রী লাবণ্যের ত্যাগের অন্ত নেই। বিসিএস ক্যাডারের লোভনীয় চাকরি কেবলমাত্র স্বামীর সুবিধার্থে ছেড়ে দিতে একবারও ভাবেননি। সারাক্ষণ জিয়ার ছায়া হয়ে থেকেছেন। নিয়েছেন দেখভালের সব দায়িত্ব।
এখন জিয়া নেই। যাওয়ার পর দাবা বিশ্ব বুঝিয়ে দিচ্ছে কত বড়মাপের দাবাড়ু ছিলেন জিয়া। কিংবদন্তি হারানোর শূন্যতাটা পূরণ হওয়ার নয়। তবে জিয়াকে সেরা রূপে গড়ে তুলতে নিজেদের ভবিষ্যতের কথা না ভাবা লাবণ্য ও তাহসিনের দায়িত্ব এখন কে নেবে? দেশের প্রতি জিয়ার অবদানের কথা ভেবে কি এখন এগিয়ে আসবে সরকার? হারুনের চাওয়া, ‘জিয়ার পরিবারের পাশে সবার দাঁড়ানো উচিত। দাবাকে ভালোবেসে নিজের ভবিষ্যতের কথা কখনো ভাবেনি ও। এখন ওর স্ত্রী-সন্তানের দায়িত্ব আমাদের সবার নেওয়া উচিত।’