স্কালোনির কৌশল-চাপহীন মেসি, যে ৬ কারণে আর্জেন্টিনা দাপুটে

২০১৮ বিশ্বকাপের পর থেকেই বদলে গেছে আর্জেন্টিনা। যার সূত্র ধরেই ২০২১ সালে তাদের ঘরে উঠেছিল কোপা আমেরিকা। যা ২৮ বছর পর কোনো আন্তর্জাতিক শিরোপা ছিল আলবিসেলেস্তেদের। লিওনেল মেসির ছিল প্রথম। তারপর টানা ৩৬ ম্যাচ অপরাজিত থেকে এসেছিল কাতার বিশ্বকাপে। সেখানে প্রথম ম্যাচ হারলেও শেষ ৩৬ বছর ঘরে তুলে বিশ্বকাপ ট্রফি। বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর আরও অদম্য দলটি। তাদেরকে যেন থামানোই যাচ্ছে না। ইতোমধ্যে উঠে গেছে টানা দ্বিতীয়বারের মতো কোপার ফাইনালে। কিন্তু প্রশ্ন জাগছে, কোন টোটকায় আর্জেন্টাইনদের ফুটবলে এমন বদল?

আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যম টিওয়াইসি স্পোর্টস তুলে ধরেছে ৬টি পয়েন্ট। যে ছয় কারণেই লিওনেল স্কালোনির শিষ্যদের ফুটবল পৌঁছে গেছে অনন্য মাত্রায়।

১. ডান পাশ

আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে শুরু থেকেই ডান পাশ সামলাচ্ছিলেন লিওনেল মেসি। কিন্তু একটা সময় তাকে পুরো মাঠজুড়েই খেলতে দেখা যেত তাকে। তবে স্কালোনি কোচ হয়ে আসার পর থেকে তার ওপর চাপ কমান। ডান পাশে থাকা বাকি ফুটবলাররাও তাই আরও কার্যকরী হয়ে উঠেছেন। মেসির অন্যতম ভরসা হিসেবে খ্যাত আনহেল ডি মারিয়া পেছন থেকে বল বানিয়ে দেন মেসিকে। পাশাপাশি রদ্রিগো ডি পল ও ম্যাক অ্যালিস্টারও আছে। মূলত এই ডান পাশটাই সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে আর্জেন্টিনাকে। মাঝমাঠ থেকেই তৈরি হচ্ছে বল। সেই বল আবার মেসির পায়ে গেলে তিনি যে শুধু একাই গোল করছেন তা নয়, মাঝেমধ্যে সতীর্থদের দিয়েও গোল করান। আজও যেমন মাঝমাঠের ডান পাশের একজন ডি পলের সহায়তায় গোল করেছেন আলভারেজ।

২. আলভারেজের অবস্থান ও চাপহীন মেসি

কোপার এই আসরে লাউতারো ছিলেন শুরু থেকে একাদশে। চার ম্যাচ খেলে তিনি করেছেন ৩ গোল। তবে সেমিফাইনালে আজ আলভারেজ ছিলেন স্কালোনির প্রথম পছন্দ। সিদ্ধান্তটা যে ভুল ছিল না, সেটা ২২ মিনিটে গোল করেই প্রমাণ করেন ম্যানচেস্টার সিটির এই ফুটবলার। এর কারণ, প্রথমত তিনি প্রতিপক্ষের মাঠের সেন্টার ও লেফট উইংয়ের এমন জায়গায় অবস্থান করছিলেন, যেন মেসি চাপহীন হয়ে যান। কারণ আক্রমণে আলভারেজ থাকলে প্রতিপক্ষের ডিফেন্স আলভারেজকেই ঘিরে ধরবে। মেসির দিকে আর নজর থাকবে না। ম্যাচে সেটাই হয়েছে। যদিও এত কড়া পাহাড়াকে ডিঙিয়ে গোল পেয়েছেন তিনি। আর দ্বিতীয়ার্ধে ৫১ মিনিটে মেসি এসেও হাজির। ২-০ গোলের জয়ের পথে এই কৌশলটাও ভূমিকা রেখেছিল।

৩. ২১-এর রূপে ফিরেছেন ডি পল  

গঞ্জালো মন্টিয়েল ও ডি মারিয়ার ড্রিবলের সাথে তাল মিলিয়ে চলছে স্কালোনির দলটির। প্রতিপক্ষরা তাদেরকে সবসময় রাখছে কড়া পাহাড়ায়। কিন্তু এমন সময় একজন ফ্রি থেকে বল বানাতে সিদ্ধহস্ত হয়ে উঠছেন। আর তিনি রদ্রিগো ডি পল। আজও যেমন বাকিদের পাহাড়া দিতে গিয়ে তিনি ছিলেন চাপমুক্ত। তাই আলভারেজকে বল বানিয়ে দিতে পেরেছিলেন। একইরূপে তাকে দেখা গিয়েছিল ২০২১ সালের কোপা আমেরিকাতেও। সেই আসরের ফাইনালেও ২২ মিনিটে ডি মারিয়া গোল করেছিলেন। যার পেছনের নায়ক ছিলেন রদ্রিগো ডি পল। আজও ২২ মিনিটেই আলভারেজের গোলে অ্যাসিস্ট করেছিলেন তিনি।

৪. মেসি, প্রতিনিয়তই যিনি ছড়িয়ে যাচ্ছেন আলো

ইকুয়েডরের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে টাইব্রেকের প্রথম শটটি মিস করেছিলেন মেসি। যা ছিল বহুকাল পর তার জীবনে আসা ভয়াল ঘটনা। তবে এক ম্যাচ পর আজ কানাডার বিপক্ষে সেই ছাপ ছিল না। যেন ক্রমশই ছাড়িয়ে গেছেন নিজেকে। কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে ডি মারিয়ার সঙ্গে জুটি বেধে করেছিলেন গোল। আজ ডি মারিয়া গোল পাননি, তবে গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচে মেসি ঠিকই যথাসময়ে গোল করে এগিয়ে নিয়েছেন দলকে। যে চোটে ভুগছিলেন, সেটারও কোনো ছাপ আজ ছিল না তার।

৫. এনজো ফার্নান্দেজ

কাতার বিশ্বকাপে তিনি হয়েছিলেন উদীয়মান ফুটবলার। এবারের কোপার আসরেও তিনি তার স্বাক্ষর রেখে যাচ্ছেন। কানাডার বিপক্ষে অন্য রূপে যেন হাজির হলেন তিনি। হোল্ডিং মিডফিল্ডার হিসেবে, থার্ড সেন্টার-ব্যাক হিসেবে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিলেন তিনি, যেমনটা করেছিলেন ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালে। তাতে করে ডি পল এবং অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের কাজটাও হয়ে গিয়েছিল সহজ। কানাডা যখন আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগে আক্রমণে গিয়েছে ততবার তিনি প্রতিরোধ করেছেন। পুরো ৯০ মিনিট আর্জেন্টিনার রক্ষণ সামলেছেন তিনি।

৬. ফাইনালের আগে স্কালোনির কৌশল

খেলার শেষ আধা ঘণ্টার দিকে আর্জেন্টিনার দলের কোচ লিওনেল স্কালোনি বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন। এই সময়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিবর্তন আনেন। নিকোলাস তাগলিয়াফিকোর আগের ম্যাচে কার্ড ছিল। আজও কার্ড দেখলে দুই হলুদ কার্ড হয়ে গেলে ফাইনালে তাকে পাওয়া যাবে না। তাই ৬৪ মিনিটে তাকে উঠিয়ৈ নিয়ে নিকোলাস ওতামেন্দিকে মাঠে নামান স্কালোনি। যখন জয়ের প্রান্তে দল তখন ডি মারিয়া, ম্যাক অ্যালিস্টার, মন্টিয়েল এবং জুলিয়ান আলভারেজকে উঠিয়ে নেন। তাদের বদলে নামান নিকোলাস গঞ্জালেজ, এজেকুয়েল পালাসিওস, নাহুয়েল মোলিনা এবং লাউতারো মার্টিনেজ প্রবেশ করেছিলেন। ইকুয়েডরের বিপক্ষে যারা শেষ করেছিল, কানাডার বিপক্ষে আজ তারাই শুরু করেছিল। স্কালোনির এই চালাকি অবশ্য বিফলে যায়নি।