মূল মালায়ালাম গল্প: কমলা দাস অনুবাদ: আদনান সহিদ মালায়ালাম ভাষার শীর্ষ কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে কমলা দাস অন্যতম। তার জন্ম কেরালার দক্ষিণ মালাবারের পুণ্যাউরকুলামের এক রক্ষণশীল পরিবারে। বাবার চাকরি সূত্রে শৈশবের বড় একটা অংশ কাটিয়েছেন কলকাতায়। তার লেখক ছদ্মনাম মাধবীকুট্টি। ১৯৯৯ সালে ৬৫ বছর বয়সে ধর্মান্তরিত হওয়ার পর কমলা সুরাইয়া নাম ধারণ করেন তিনি। মালায়ালাম ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই লিখতে পারদর্শী কমলা দাস একাধারে লিখেছেন প্রচুর কবিতা, ছোটগল্প, অর্ধশতাধিক উপন্যাস ও আত্মজীবনী। মালায়ালাম ভাষায় ‘থানেপ্পু’ ছোটগল্প রচনার জন্য তিনি ‘কেরালা সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার’, সাহসী সাংবাদিকতার জন্য ‘চমন লাল পুরস্কার’, এশীয় কবিতায় অবদানে ‘পিইএন পুরস্কার’ এবং ‘নীরামাথালাম পুথা কালাম’ উপন্যাসের জন্য ‘ভায়ালার অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করেছেন। এ ছাড়াও ‘এশিয়ান ওয়ার্ল্ড প্রাইজ’, ‘কেন্ট অ্যাওয়ার্ড’, ‘কেন্দ্র সাহিত্য একাডেমি অ্যাওয়ার্ড’, ‘মুত্তাথু ভার্কি অ্যাওয়ার্ড’ ইত্যাদি পুরস্কারও সগৌরবে তার নামের পাশে যুক্ত হয়েছে। ১৯৮৪ সালে নোবেল পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায়ও মনোনীত ছিলেন এই প্রথিতযশা সাহিত্যিক। নেয়পায়াসাম মূলত কেরালার পুডিং ধাঁচের ‘ঘি’ মিশ্রিত এক ধরনের ঐতিহ্যবাহী সুগন্ধি মিষ্টান্ন, যা বিশেষ উৎসব উপলক্ষে পরিবেশন করা হয়। নেয়পায়াসাম মিষ্টান্নের আশ্রয়ে গল্পকার এখানে মালায়ালাম এক মধ্যবিত্ত পরিবারে গুরুত্বপূর্ণ নারীর মৃত্যুতে সদস্যদের মাঝে সৃষ্ট মনোদৈহিক সাংসারিক সংকট, অনিশ্চয়তা ও নীরব ভালোবাসা তুলে ধরেছেন। গল্পটি মালায়ালাম থেকে ‘সুইট মিল্ক’ শিরোনামে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন সিধু ভি. নায়ার। ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন আদনান সহিদ।
অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শেষে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে রাতে বাড়ি ফিরছিল লোকটি। তাকে আমরা ‘আচ্ছান’ নামেই ডাকতে পারি। শহরের বুকে তার তিন সন্তানই কেবল তার প্রকৃত মূল্য বুঝতে পারত। তারা ‘আচ্ছা’ বলে ডাকত তাকে।
বাড়ি ফেরার বাসে অপরিচিত লোকজনের ভিড়ে বসে বিশেষ একটি দিন ও সেদিনের প্রতিটি মুহূর্তের কথা ভাবছিল আচ্ছান।
প্রতিদিন সকালে তার নিয়মমাফিক ঘুম ভাঙত বিশেষ এক কণ্ঠস্বর শুনে।
‘উন্নিয়ে, এভাবে মুখ ঢেকে ঘুমিও না। আজ সোমবার।’ বড় ছেলেটাকে এভাবে ঘুম থেকে ডাকত সেই কণ্ঠস্বর। তারপর যখন রান্নাঘরে ঢুকত, তার সাদা শাড়িটাতে বড় ধরনের ভাঁজ পড়ত কয়েকটা। বড় একটা মগে করে আচ্ছানকে কফি দিত সে। তারপর কী? তারপর এমন কিছু কী সে করত, যা ভোলার মতো নয়, কিন্তু ভুলে গেছে আচ্ছান? অনেক চেষ্টা করেও কিছু মনে করতে পারল না।
‘এভাবে মুখ ঢেকে ঘুমিও না। আজ সোমবার।’ বাক্যটা বারবার মাথায় ঘুরছে তার। মনে মনে বাক্যটা প্রার্থনার মতো করে জপতে লাগল যেন ভুলে গেলেই অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে!
সকালে কাজে বের হওয়ার সময় বাচ্চাগুলো আচ্ছানের সঙ্গেই বের হতো। তাদের মা ছোট অ্যালুমিনিয়ামের বাক্সে সবার জন্য যখন টিফিন দিয়ে দিত তার ডান হাতে হলুদের স্পষ্ট দাগ লেগে থাকতে দেখা যেত নিয়মিতই।
কাজে গিয়ে আচ্ছানের স্ত্রীর কথা তেমন মনে হতো না বললেই চলে। বছর দুয়েক আইনি লড়াইয়ের পর বাবা-মার অমতে তাদের দুজনের বিয়ে হয়। এ নিয়ে অবশ্য তাদের কখনো অনুশোচনা হয়নি। অর্থের অভাব কিংবা বাচ্চাদের অসুস্থতা প্রায়ই হতাশ করে তুলত তাদের। বাচ্চাদের মা অবশ্য এসব হতাশা পাত্তাই দিত না। তবে আচ্ছানের মুখের হাসি ঠিকই উধাও হয়ে যেত। তবে যা-ই ঘটুক না কেন, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ভালোবাসা অটুট থাকত। তিন ছেলেও তাদের বাবা-মাকে বেশ পছন্দ করত। উন্নির বয়স দশ, বালানের সাত আর রাজনের পাঁচ বছর। ছেলেগুলোর চেহারায় সবসময় একটা অপরিচ্ছন্ন ভাব বজায় থাকত, তাদের না ছিল সৌন্দর্যবোধ, না ছিল মেধা! তারপরও বাবা-মা সবসময় বলাবলি করত
‘উন্নি কত কিছু বানাতে পারে। একদিন সে ইঞ্জিনিয়ারই হবে দেখো।’
‘বালানকে আমরা ডাক্তার বানাব। ওর কপালটা দেখেছ? কত চওড়া? চওড়া কপালের মানুষ মেধাবী হয়।’
‘রাজন তো অন্ধকার ভয়ই পায় না। খুবই সাহসী। তাকে সেনাবাহিনীতে ভর্তি করে দেওয়া উচিত।’
শহরের এক মধ্যবিত্ত পাড়ায় সরু গলিতে ছিল তাদের বাস। দোতলায় তিন রুমের একটা বাসায় থাকত ওরা, বারান্দাটায় দুজন মানুষ ঠাসাঠাসি করে কোনোমতে দাঁড়াতে পারত। তাদের মা একটা টবে পাণিনির গাছ লাগিয়েছিল, ফুল ফোটেনি এখনো।
রান্নাঘরের দেয়ালে পিতলের চামচ, খুন্তিগুলো ঝোলানো থাকত। চুলার ধারে পাতা থাকত একটা কাঠের পিঁড়ি। বাবা কাজ শেষে ফিরলে ছেলেদের মা সেখানে বসে চাপাতি রুটি বানাত।
বাসটা থামতেই নেমে পড়ল আচ্ছান। নামতে না নামতেই হঠাৎ পায়ে টনটনে ব্যথা অনুভব করল। আর্থ্রাইটিসের ব্যথা শুরু হলো নাকি আবার? বিছানায় পড়ে গেলে বাচ্চাগুলোকে দেখবে কে এখন? হঠাৎ তার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে এলো। ময়লা রুমালটা দিয়ে চোখ মুছে তাড়াতাড়ি পা চালাল সামনে।
বাচ্চাগুলো কি ঘুমিয়ে পড়ল এতক্ষণে? কিছু খেল কি? নাকি কাঁদতে কাঁদতেই ঘুমিয়ে গেল? সত্যিই বাচ্চাগুলো এখনো অনেকটাই অবুঝ। তাদের মাকে সেদিন যখন ট্যাক্সিতে তোলা হচ্ছিল, উন্নি ঠাঁয় দাঁড়িয়ে সে দৃশ্য দেখছিল। সবচেয়ে ছোট ছেলেটা কাঁদছিল কেবল ট্যাক্সিতে চড়ার বায়না করে। মায়ের মৃত্যুর অর্থ আসলেই বুঝে উঠতে পারেনি তারা সেদিন।
সত্যি বলতে আমিও কি বুঝেছিলাম সেই মৃত্যুর মানে? একবার ভাবল আচ্ছান। না! কখনো ভাবিইনি এক সন্ধ্যায় সে হুট করে পড়ে যাবে আর চলে যাবে সবাইকে ছেড়ে! সামান্যটুকু বিদায়ও না নিয়ে!
কাজ থেকে ফিরে আচ্ছান রান্নাঘরের জানালা দিয়ে উঁকি দিল। স্ত্রীর কোনো চিহ্ন দেখতে পেল না সেখানে। কেবল খাঁ খাঁ এক শূন্যতা!
সামনের উঠানে ছেলেদের খেলার শব্দ শুনতে পেল সে। উন্নির চিৎকার শোনা গেল ‘চমৎকার শট!’
চাবি দিয়ে সেদিন সদর দরজা খুলেছিল আচ্ছান। মেঝেতে পড়ে থাকা স্ত্রীর নিথর দেহ আবিষ্কার করে চমকে উঠেছিল। মুখটা হাঁ করে খোলা! মনে হয়েছিল হয়তো পিছলে পড়ে গেছে সে। হাসপাতালে নেওয়ার পর ডাক্তার বলল, ‘প্রায় ঘণ্টা দেড়েক আগেই মারা গেছে রোগী, হৃৎস্পন্দন বন্ধ হয়ে।’
মৃত স্ত্রীর কথা ভাবতে ভাবতে আবেগ উথলে উঠল তার। কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ রাগ উঠল স্ত্রীর ওপর কীভাবে পারল সে তাকে ছেড়ে যেতে! সব দায়দায়িত্বের বোঝা কাঁধে চড়িয়ে এভাবে চলে যায় কেউ!
বাচ্চাগুলোকে গোসল করাবে কে এখন? কে তাদের খাওয়াবে? অসুস্থ হলে সেবাই বা করবে কে?
‘আমার স্ত্রী আর নেই! আজ হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছে সে। আমার দুদিনের ছুটি চাই।’ ফিসফিসিয়ে যেন নিজেকেই শোনাল সে।
অদ্ভুত এক ছুটির দরখাস্ত! স্ত্রীর অসুস্থতার জন্য ছুটি নিচ্ছে না আচ্ছান। ছুটি নিচ্ছে কারণ তার স্ত্রী মারা গেছে! অফিসের বড়কর্তা হয়তো তাকে ডাকবেন, দুঃখ প্রকাশ করবেন। কে চেয়েছিল এমন দুঃখ! স্ত্রীকে অচেনা মনে হতে লাগল তার। অচেনা মনে হলো তার কোঁকড়ানো চুলের ডগা। তার ক্লান্ত হাসি, ধীর পায়ে চলা সব হারিয়ে গেছে যেন নিমিষেই! সবকিছু!
বাসার দরজা খুলে ঢুকতেই সবচেয়ে ছোট ছেলেটা দৌড়ে এসে বলল তাকে, ‘মা এখনো আসেনি।’
এত তাড়াতাড়ি কীভাবে ভুলে গেল ছেলেটা সব কিছু! সত্যিই কী সে ভাবছে ট্যাক্সিতে বয়ে নিয়ে যাওয়া সেদিনের মায়ের মৃতদেহটা ফিরে আসবে আবার? ছেলেটাকে রান্নাঘরে নিয়ে গেল সে।
‘উন্নি’, বড় ছেলেকে ডাকল।
‘কী? বলো আচ্ছা।’
উন্নি রান্নাঘরে এসে বলল, ‘বালান ঘুমিয়ে পড়েছে।’
‘ঠিক আছে। তোমরা খাওয়া-দাওয়া করেছ কিছু?’
‘না।’ উন্নির উত্তর।
টেবিলের ওপর রাখা খাবারের ঢাকনাগুলো সরাল সে : চাপাতি, ভাত, আলুর তরকারি, চিপস, দই সব তাদের মায়ের রান্না। কাচের একটা বাটিতে বাচ্চাদের জন্য প্রায়ই রান্না করত সে নেয়পায়াসাম নামের মিষ্টান্নটা।
না! এই মিষ্টান্ন বাচ্চাদের খেতে দেওয়া যাবে না। মৃত্যুর ছোঁয়া লেগে গেছে এতে।
‘এগুলো ঠান্ডা হয়ে গেছে। আমি তোমাদের জন্য কিছু উপ্পুমাভু বানাচ্ছি।’ বললাম আমি।
‘ঠিক আছে।’ উন্নি বলল।
‘মা কখন আসবে? মা-ই কি তা ভালো বানাতে পারত না?’
দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। ভাবল প্রকৃত সত্যটা জানানোর জন্য আরেকটা দিন অপেক্ষা করা যাক। আজ রাতে বাচ্চাদের আর কষ্ট দিয়ে লাভ নেই।
‘মা আসবে।’ আচ্ছান উত্তর দিল।
মেঝেতে দুটি পরিষ্কার খাবার বাটি পাতল সে।
বালান ঘুমাচ্ছে ঘুমাক।
‘আচ্ছান, নেয়পায়াসাম!’ বেশ উচ্ছ্বসিত হয়ে ছোট ছেলে, রাজন মিষ্টান্নর বাটিতে হাত চুবিয়ে দিল। তার মা যে কাঠের পিঁড়িটাতে বসত সেটাতেই বসে আছে সে।
‘উন্নি, তুমি কি নেয়পায়াসামটা বেড়ে দেবে? আচ্ছানের শরীর ভালো লাগছে না, মাথাব্যথা করছে।’
থাক, বাচ্চারা খাক! সাধ মিটিয়েই খাক। আর কখনো তো মায়ের হাতের রান্না জুটবে না কপালে!
বাচ্চারা মায়ের হাতের নেয়পায়াসাম খাওয়া শুরু করল। নীরব, নিস্তব্ধ দৃষ্টিতে বাবা তাদের খাওয়া দেখতে লাগল বসে বসে।
‘উন্নি, তুমি ভাত খাবে না?’
‘না, আমরা শুধু নেয়পায়াসামই খাবো। খুব মজা হয়েছে এটা!’
‘হ্যাঁ! মা চমৎকার নেয়পায়াসাম রান্না করেছেন।’ কণ্ঠে যেন আনন্দ ঝরে পড়ছে রাজনের।
হঠাৎ ওদের মাঝখান থেকে উঠে দ্রুত হেঁটে বাথরুমের দিকে চলে গেল আচ্ছান, তাদের বাবা।