দাবা দিয়ে বাবাকে বাঁচিয়ে রাখবেন জিয়াপুত্র

দাবা ফেডারেশনে আন্তর্জাতিক আরবিটর হারুনুর রশীদের কক্ষে বড় বোনকে পাশে নিয়ে অধীর আগ্রহ নিয়ে বসেছিলেন তাসমিন রহমান লাবণ্য। দৃষ্টি আটকে ছিল কম্পিউটারের স্ক্রিনে। সেখানে ছেলে তাহসিন তাজওয়ার জিয়া ও অনত চৌধুরীর মধ্যে প্লে-অফের লাইভ ম্যাচটা চলছিল। প্রথম গেম কালো ঘুঁটি নিয়ে জিতেছিলেন তাহসিন। তবে দ্বিতীয়টায় ছিলেন পিছিয়ে। হঠাৎই চিত্রটা বদলে যায় অন্য একটা ভুল চালে। ম্যাচটা তখনই ড্র করে ফেলেন তাহসিন। গেম পরিচালনার দায়িত্বে থাকা একজন ছুটে এসে যখন খবরটা দিলেন, বোনকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লেন লাবণ্য। এই কান্না যতটা না ছেলের অর্জনের, তার চেয়েও বেশি প্রিয় স্বামীকে হারানোর। এই দাবা খেলতে খেলতেই যে ৫ জুলাই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন লাবণ্যের স্বামী বাংলাদেশের দ্বিতীয় গ্র্যান্ডমাস্টার জিয়াউর রহমান। বেঁচে থাকতে যার স্বপ্ন ছিল ছেলে তাহসিনকে সঙ্গী করে সেপ্টেম্বরে হাঙ্গেরিতে দাবা অলিম্পিয়াডে খেলতে যাওয়ার। এমনকি নিজে দল থেকে সরে গিয়েও চেয়েছিলেন তাহসিনকে পাঠাতে। আকস্মিক মৃত্যু গ্রাস করেছে জিয়াকে। তবে বাবার স্বপ্ন পূরণ করে ঠিকই অলিম্পিয়াডগামী বাংলাদেশ দলে জায়গা করে নিয়েছেন তাহসিন।

বুধবার শেষ হওয়া ১৩তম ও শেষ রাউন্ডে গ্র্যান্ডমাস্টার এনামুল হোসেন রাজিবের সঙ্গে ড্র করে যৌথভাবে পঞ্চম স্থান পেয়েছিলেন তাহসিন ও অনত। তাই বৃহস্পতিবার বিকেলে দাবা ফেডারেশনে হয় প্লে-অফ। প্রথম গেমটা জিতে বাংলাদেশ দলে সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল করেন ১৮ বছরে তাহসিন। তবে পরের গেমে অনত জয়ের পথে ছিলেন। তবে একটা ভুল চালেই পিছিয়ে পড়েন অনত। সুযোগটা কাজে লাগিয়ে ম্যাচটা ড্র করেন তাহসিন। তাতেই পঞ্চম স্থান নিশ্চিত হয়ে যায় তার। পাশাপাশি মনন রেজা নীড়, নিয়াজ মোরশেদ, এনামুল হোসেন রাজিব ও ফাহাদ রহমানের সঙ্গী হয়ে হাঙ্গেরি যাওয়াও নিশ্চিত হয় তার। খেলা শেষে ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদকের কক্ষে এসে মাকে জড়িয়ে কেঁদে ফেলেছিলনে তাহসিন। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে উপস্থিত সংবাদমাধ্যমের কাছে প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে তাহসিন বলেন, ‘একটু স্বস্তি লাগছে টুর্নামেন্টটা শেষ হলো। আমি আসলে জানতাম না যে আমাকে টাইব্রেক খেলতে হবে। প্লে-অফের প্রথম গেমটা আমি জিতেছিলাম। দ্বিতীয় গেমটা অবশ্য হারছিলাম। প্রতিপক্ষের একটা ভুল চালে গেমটা ড্র করতে পারি। আব্বুকে খুব মিস করছি। আগের অলিম্পিয়াডে সুযোগ পেতে আমাকে টাইব্রেক খেলতে হয়েছিল। সে সময় আব্বু বাইরে ছিল। এবার আর ছিল না...।’

তাহসিনের কথা শেষ হতেই পাশে বসা জিয়ার স্ত্রী জানালেন জিয়ার ইচ্ছের কথা, ‘জিয়া বলেছিল ফেডারেশন যদি রাজি হয় ও ক্যাপ্টেন হিসেবে যাবে। তবে খেলবে না। যেহেতু দুজন ইয়ং জেনারেশন যাচ্ছে (নীড় এবং ফাহাদ)। ও চাইছিল তাহসিনও যাক। নইলে তাহসিনের মনটা খারাপ হবে। ১২তম রাউন্ডে রাজিবের সঙ্গে খেলায় জিয়া জয়ের পথে ছিল। তাই ও তাহসিনের খেলায় নিয়ে খুব চাপে ছিল। কারণ খুব করে চাইছিল যাতে তাহসিন পঞ্চম হয়। যাতে বাবা-ছেলে দুজনই খেলতে পারে। ফলে এত বেশি প্রেসার নিয়ে নিয়েছিল। সেটাই হয়তো ওকে...’

বাবাকে হারানোর পর এই সময়টা ঘোরের মধ্যে কাটছে তাহসিনের। তারপরও বাবাকে হারানোর শোক একপাশে রেখে তাকে ফিরতে হয়েছে দাবার বোর্ডে। খেলতে হয়েছে শেষ দুই রাউন্ড ও প্লে-অফ, ‘আমি ঠিক জানি না, বুঝতে পারছি না, এখনো মানতে পারছি না যে আব্বু নেই। হয়তো আরও কিছুদিন সময় লাগবে বুঝতে। শুরুতে খেলায় মনোযোগ দিতে কিছুটা অসুবিধা হচ্ছিল। তখন নিজেকে বোঝাই যে এটাই আমাকে করতে হবে। কারণ এটাই আব্বুর স্বপ্ন ছিল। আব্বু খেলতে খেলতেই মারা গেছেন। এটা আমাকে কন্টিনিউ করতেই হবে। আমি শুধু খেলে গিয়েছি। জানি না, আল্লাহ হয়তো বাকিটা লিখে রেখেছিলেন।’

তাহসিনকে এখন অন্যদের সঙ্গে প্রস্তুত হতে হবে দাবা অলিম্পিয়াডের জন্য। আগেরবার জিয়া ছিলেন বলেই খুব বেশি ভাবতে হয়নি। এবারের যাওয়াটা অন্যরকম। তাই খুব করে চান বাবার মতো খেলেই দেশকে ভালো একটা ফলাফল উপহার দিতে, ‘আব্বু তো নেই। এত বছর তো তিনি খেলেছেন। বাবার মতোই খেলার মতো চেষ্টা করব।’

ছেলের এই অর্জন একটা মিশ্র অনুভূতি নিয়ে হাজির হয়েছে লাবণ্যর জন্য। জিয়া বেঁচে থাকতে সবসময় তার ছায়া হয়ে থাকতেন। যেখানেই জিয়া খেলতে যেতেন সেখানেই দেখা যেত লাবণ্যকে। স্বামী যাতে চিন্তাহীন খেলাটা চালিয়ে যেতে পারেন, তাই লোভনীয় সরকারি চাকরি ছাড়তে এক মুহূর্ত দ্বিধা করেননি। এখন লাবণ্যের সব ভাবনা ছেলে তাহসিনকে ঘিরে। ছেলেকে গ্র্যান্ডমাস্টার করার জিয়ার স্বপ্নপূরণের চ্যালেঞ্জটা নেবেন তিনি, ‘অর্জন তো সসময়ই ভালো লাগে। এই ভালোটা আসলে পরিপূর্ণ হলো না। আমার জিয়াই নেই যেহেতু, এই প্রাপ্তিটা আমি খুব একটা অনুভব করতে পারছি না। জিয়া বেঁচে থাকলে ছেলের অর্জনে খুব খুশি হতো। ও তো খেলার পাগল। ও নিজেই খেলতে চাইত। তাহসিনও যদি যেত ওর খুশিটা অনেক বেড়ে যেত। ওর বাবা কখনো ওকে একা ছাড়েনি। আমিও ছাড়িনি। আমি ওর পাশেই থাকব। যতদিন ও একা কোথাও যাওয়ার মতো পরিণত হবে না আমি ওর পাশে থাকব। মাত্রই তো জিয়াকে হারালাম। ও চলে গেল ৫ তারিখ, আজ ১১ তারিখ। এখনো মনে হচ্ছে না জিয়া নেই। মনে হচ্ছে ও ১০-১৫ দিনের জন্য কোথাও খেলতে গেছে, চলে আসবে। তাহসিনও তাই মনে করছে যে ওর বাবা চলে আসবে। জিয়া বলত আমরা তিনজন সবসময় একসঙ্গে থাকব। এখন তাহসিনকে গ্র্যান্ডমাস্টার বানাতে গেলে তো চ্যালেঞ্জ নিতেই হবে।’

জিয়ার মৃত্যুর পর তাহসিনকে আর পরের দুই রাউন্ড খেলতে দিতে চাননি লাবণ্য। আসলে বাবার মৃত্যুতে অনেক বেশি ভেঙে পড়েছিলেন তাহসিন। সেটা দেখেই লাবণ্য বারণ করেছিলেন। পরে অবশ্য তাহসিনের ইচ্ছেতেই খেলতে নিয়ে আসতে হয়েছে, জানালেন লাবণ্য, ‘আমি বলেছিলাম তুমি খেলো না। তোমার বাবাই যেহেতু এখন নেই, এখন আর হাঙ্গেরি নিয়ে মাতামাতি করার দরকার নেই। যেহেতু এখনো ঘোরটা কাটাতে পারেনি। সারাক্ষণই বাসায় কান্নাকাটি করছে। তবে ও বলল আমার খেলতেই হবে। বাবার স্বপ্ন ছিল আমি খেলি, তাই খেলব। তুমি আমার পাশে থেকো। এজন্য আমি নিয়ে এলাম ওকে।’

দাবা অঙ্গনে এখনো জিয়াকে হারানো শোকের ছায়া। এর মধ্যেই তাহসিনের অলিম্পিয়াডে সুযোগ পাওয়ায় বলতে গেলে সবাই খুশি। সবারই যে চাওয়াটা ছিল অভিন্ন। তাহসিন অলিম্পিয়াডে যাচ্ছেন। ভবিষ্যতে হয়তো আন্তর্জাতিক মাস্টার, গ্র্যান্ডমাস্টারও হবেন। তবে তা দেখতে পাবেন না জিয়া। সেই আক্ষেপটাই হয়তো বাকি জীবন বয়ে বেড়াতে হবে লাবণ্যকে।