‘সৈয়দ’ হতে চেয়ে ড্রাইভারই রয়ে গেলেন আবেদ আলী

মাদারীপুরের ডাসার উপজেলার পশ্চিম বোতলা গ্রামের ছেলে সৈয়দ আবেদ আলী। মাত্র ৮ বছর বয়সে ঢাকায় চলে যান, সেখানেই নানা রকম ছোটখাটো কাজ করতেন। এক সময় গাড়ি চালানো শিখে চাকরি নেন সরকারি কর্মকমিশনে। সম্প্রতি খবর বেরিয়েছে নুন আনতে পান্তা ফুরোনো এই মানুষটি বনে যান কোটি টাকার সম্পদের মালিক। যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে মূলধারার মিডিয়ার আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

গত ৫ জুলাই বাংলাদেশ রেলওয়ের উপসহকারী প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসে জড়িত অভিযোগে সরকারি কর্মকমিশনের দুজন উপপরিচালক, দুজন সহকারী পরিচালকসহ ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে পিএসসির সাবেক গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলীও ছিলেন। জানা যায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের সিন্ডিকেটের মূল হোতা এই আবেদ আলী যার বিরুদ্ধে ১০ বছর আগেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে পাবলিক পরীক্ষা আইনে করা মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ। ২০১৫ সালে আবেদ আলীসহ অন্যদের বিরুদ্ধে বিচার শুরুর আদেশ দেন ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালত। ৯ বছরে এ মামলার ১২ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র দুজনকে আদালতে হাজির করতে পেরেছে রাষ্ট্রপক্ষ। ফলে আবেদ আলীর বিচার হয়নি। সেই সুযোগে তিনি সরকারি চাকরিতে নিয়োগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে সিন্ডিকেট করে বিসিএসসহ অন্যান্য নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস চালিয়ে গেছেন। ফলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি কীভাবে অপরাধ ও অপরাধীকে লালন করে, সে নিয়ে অনেক আলাপের সুযোগ আছে। তবে, এখানে এই ঘটনাটি ধরে অন্য একটি প্রসঙ্গ নিয়ে কিছু জরুরি কথা বলা দরকার বলে মনে করি।

ঐতিহাসিক কাল পরিক্রমার উত্তর-আধুনিক পর্বে আমরা এমন এক বাস্তবতার ভেতর বাস করছি যেখানে আদর্শিক অবস্থান থেকে বিচ্যুতি, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ বিচ্ছিন্নতা চোখে পড়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বীভৎসতা ও গণহত্যার পরিপ্রেক্ষিতে মানবজন্মের উদ্দেশ্য ও সার্থকতার প্রশ্নে সর্বোপরি যে কোনো আদর্শগত অভিব্যক্তির প্রতি বিশ্বাস ক্ষীণ হয়ে এসেছিল। তবে এই কালপর্বে বিশ্বজুড়ে জাতিরাষ্ট্রের প্রতি এক রকম আশা তৈরি হতে দেখা যায়। কিন্তু সেটাও জাতীয়তাবাদের নামে নানা রকম অবিমৃষ্যকারিতার জন্ম দিতে থাকে। বাইপোলার বিশে^র চটকদারিতা, ঠা-া যুদ্ধের পাটাতন আর নয়া নয়া ব্যবস্থায় খাবি খেতে থাকে সময়। ইত্যবসরে বিশ্বায়নের ঘোড়ায় চড়ে আসে মুক্তবাজার অর্থনীতি, নয়া উদারনীতিক প্রেসক্রিপশন। রাষ্ট্র তার কার্যকারিতা হারাতে থাকে। বিকারহীন সহিংসতা, সামাজিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতার যে মানদণ্ড তা গুঁড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা সৃষ্টি হয়। সেই সঙ্গে যে কোনো প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে ধর্ম ও রাষ্ট্র কাঠামো অনেকের কাছেই বাতিল হয়ে পড়েছিল। দেশে সাম্প্রতিক সময়ে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অবৈধ উপায়ে সম্পদশালী হওয়ার একের পর এক নজির যেভাবে উন্মোচিত হচ্ছে তাতে উত্তর-আধুনিক সেই অরাজকতার কথাই মনে পড়ে যায়, যা আসলে যে কোনো ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থার ঘোষণা রাখে। তবে, ক্লাস স্ট্রাগল বা শ্রেণিচেতনা ও তার সংগ্রাম জারি থাকে এর মধ্যেও। যেমন, যে আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় আবেদ আলীরা তৈরি হয় সেখানেও এই শ্রেণিগত প্রশ্নের খোঁজ পাওয়া যায়। ফলে আবেদ আলীদের ক্ষেত্রে সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়ার জোয়ারে কিছুটা ভিন্নতা চোখে পড়ে। অনেকের মন্তব্যে স্পষ্ট আক্ষেপ একটা ড্রাইভারের এত টাকা!

পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সামাজিক মর্যাদা অর্জনের তরিকা একটাই নিজেকে বুর্জোয়া শ্রেণির একজন সদস্য হিসেবে প্রমাণ করা। আর বুর্জোয়া হওয়ার মূল শর্ত যে কোনো উপায়ে পুঁজির মালিক হওয়া। কিন্তু বাস্তবতা এমন যে স্বাভাবিক পন্থায় এই রাষ্ট্রব্যবস্থা একজন সাধারণ মানুষের বৈধভাবে পুঁজি অর্জনের পথ অবাস্তব করে রেখেছে। ফলে আবেদ আলীও বিপরীত পথে হাঁটেননি। তিনি পুঁজি অর্জনের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ও সহজ পথ খুঁজে বের করেছেন। ২০১৪ সালে আবেদ আলীর বিরুদ্ধে জমা দেওয়া অভিযোগপত্রে বলা হয়েছিল, সাড়ে ছয় লাখ টাকার বিনিময়ে আবদুর রহমান নামের এক পরীক্ষার্থীকে চাকরির প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। আবদুর রহমানের কাছেই জানা যায়, কীভাবে পিএসসির সে সময়ের সাঁটমুদ্রাক্ষরিক তারিকুল ইসলাম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটের শিক্ষার্থীদের সহায়তায় বিসিএস ক্যাডার, নন-ক্যাডারসহ সব পরীক্ষা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্নপত্র বাইরে নিয়ে আসতেন আবেদ আলী। ইন্টারনেটের মাধ্যমে পিএসএসির অসাধু কর্মচারীদের যোগসাজশে এটি করা হতো। পরে মেধাবী শিক্ষার্থীদের দিয়ে উত্তরপত্র পূরণ করে সেটি পরীক্ষার এক ঘণ্টা বা আধা ঘণ্টা আগে পরীক্ষার্থীদের কাছে পাঠানো হতো।

হলিউড, বলিউডের সিনেমা বা হালের ওটিটির কন্টেন্টে এমন স্ক্যামের চিত্রায়ণ তো আমরা হরহামেশাই দেখছি। ‘হিরোয়িক’ ও টানটান উত্তেজনাময় এসব গল্প আমরা গোগ্রাসে গিলি এবং নিজেরাও শর্টকাটে বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন দেখি। আর সে কারণেই কি একজন ড্রাইভারের এমন স্ক্যামের বিষয়টি অনেকের শ্রেণিচেতনায় হালকা করে হলেও আঘাত হানছে? অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়, পিএসসির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে বেশ কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী চাকরি জীবনের শুরু থেকেই রয়েছেন। দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার সুবাদে অবৈধ সিন্ডিকেট গড়ে তোলার সুযোগ পেয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের কিছু সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারীর চাকরিতে যোগদানের আগে সহায়-সম্বলহীন ছিলেন; তারা এখন সরকারি অনুমোদনক্রমে জমি, ফ্ল্যাট, বাড়ি-গাড়ি, অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছেন। সৈয়দ আবেদ আলীর মতো একজন কর্মচারী প্রতি বছর দেশের বাইরে ভ্রমণের অনুমতি পেয়েছেন, যাতে পিএসসি কর্র্তৃপক্ষের অসতর্কতা বা উদাসীনতা পরিলক্ষিত হয়।

শুধু দেশের বাইরে ভ্রমণই নয়, আবেদ আলী অন্তত ৫০ কোটি টাকার সম্পদের মালিক বলে জানা গেছে। ঢাকায় একটি ছয়তলা বাড়ি, তিনটি ফ্ল্যাট ও একটি গাড়ি রয়েছে। গ্রামের বাড়িতে ডুপ্লেক্স ভবন, মার্কেট, মসজিদ, ঈদগাহ নির্মাণ করেছেন। একরের পর একর জমি কিনেছেন। এলাকায় তিনি দানবীর হিসেবে পরিচিত। ২০২৩ সাল থেকে স্থানীয় রাজনীতির মাঠে সক্রিয় হয়ে ওঠেন আবেদ আলী। দামি গাড়িতে চড়ে গণসংযোগ করতেন আবেদ আলী ও তার ছেলে সৈয়দ সোহানুর রহমান (সিয়াম)। বাবা-ছেলে প্রচুর দান-দক্ষিণা করতেন, যার ছবি-ভিডিও ফেসবুকে পোস্টও করতেন। গত কোরবানির ঈদেও দামি গাড়িতে চড়ে ১০০ জনকে এক কেজি করে গোশত দেন সোহানুর। সেই ভিডিও শেয়ার করেন নিজের ফেসবুকে। তিনি ডাসার উপজেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি পদে ছিলেন, যে পদ থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। বেরিয়ে এসেছে আরও মজার তথ্য। সম্পদশালী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের পদবিও বদলে ফেলেন আবেদ আলী। পশ্চিম বোতলা গ্রামের মৃত আবদুর রহমান মীরের ছেলে আবেদ আলী। তার আরও দুজন ভাই আছেন। বড় ভাই জাবেদ মীর কৃষিকাজ করেন। ছোট ভাই সাবেদ মীর এলাকায় জমিজমা দেখভাল করেন। আরও জানা গেছে পশ্চিম বোতলা গ্রামে সৈয়দ বংশের কোনো বাড়ি নেই। সেখানে মীর বংশের ছয়টি পরিবার থাকে। আবেদ আলী মীর বংশের ছেলে। অর্থবিত্তের সঙ্গে তিনি মীর পদবি পাল্টে নামের আগে সৈয়দ পদবি ব্যবহার শুরু করেন। বিভিন্ন মহলে এর সুযোগও নিতেন।

মার্কসীয় তত্ত্বমতে, একই অর্থনৈতিক স্বার্থরক্ষায় সচেতনভাবে যারা সামষ্টিক কর্মে লিপ্ত হয় তারা একই শ্রেণিভুক্ত। তাহলে ড্রাইভার আবেদ আলী, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ এবং সাবেক এনবিআর সদস্য মতিউর রহমান একই শ্রেণির। কিন্তু কোটি টাকার সম্পদ গড়ে, সন্তানদের দেশের বাইরে পড়িয়ে, এলাকায় দান-দক্ষিণা করে এবং সর্বোপরি এত বড় অপরাধের সিন্ডিকেট চালিয়েও আবেদ আলী একজন ড্রাইভারই রয়ে যান। আর মুখে মুখে বলতে থাকি সব পেশাই সম্মানের...। শুধু তাই নয়, তিনি যাদের গাড়ি চালিয়েছেন বিভিন্ন সময়ে, মালিক হিসেবে তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। কারণ আমাদের সামন্তবাদী চিন্তায়, অধীনের গতিবিধি প্রভু জানবে না কেন? আর অটুট থাকে একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে দশকের পর দশক ধরে গড়ে ওঠা দুর্নীতির অভেদ্য জাল, যেখান থেকে আবেদ আলীর মতো একটি মাকড়সাকে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে কেবল। প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধ কাঠামো এবং তার স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের দিকে আমরা নজর ফেরাতেই পারি না।

লেখক: সাংবাদিক

naziabdafrin@gmail.com