কি ব্যাপার রুবেল মন খারাপ কেন? আমার রুমমেট গতকাল আমেরিকা চইল্যা গেছে ভাই! এতে মন খারাপের কি আছে? না ভাই বেড়াইতে যায় নাই, একবারে চইল্যা গেছে! এখানে পোষাইতে পারতাছিল না!
মানে কি? হ ভাই, চার মাস হইছে ! এইখানে কোনো কাজ পায় নাই, কয়দিন বইসা খাওন যায়, ১৬ লাখ টাকা খরচ কইরা আইছে ভিজিট ভিসায়। বাড়িতে টাকা পয়সা দিতে পারতাছিলো না। ধারের টাকার জন্য চাপ দিতাছে মাইনসে। কয়দিন আর সহ্য করবো! উপায় ন পাইয়া দালাল ধইরা বর্ডার পার হইয়া গেছে গা, ওইখানে নাকি কাজের অভাব নাই!
রুবেল মৃধা, অল্প বয়স, পড়ালেখা খুব একটা করতে পারেনি। প্রায় ১৫ লাখ টাকা খরচ করে কানাডায় এসেছে, মাস চারেক হলো। এয়ারপোর্ট থেকেই এসাইলাম ক্লেম (রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে আবেদন) করেছে। ওয়ার্ক পারমিট হাতে পেতে লেগেছে তিনমাস! এখনও কোনো কাজের ব্যবস্থা করতে পারেনি। রুমমেটদের অনেকে আমেরিকায় চলে গেছে দেখে প্রচণ্ড হতাশ, কূল কিনারা কিছু দেখতে পাচ্ছে না।
আমি যে বাসাটায় থাকি সেই ব্লকের চার পাঁচটা বাড়ি পরেই এক বাংলাদেশি কানাডিয়ান নাগরিকের নিজের বাড়ি। তিনি সিঙ্গেলদের জন্য কম খরচে রুম ভাড়া দেন, তার তিনটি এপার্টমেন্টে প্রায় ৩০ জনের বাস। রুবেল সেখানেই থাকে। এই মেস বাড়িটায় বাংলাদেশ ও ভারতীয়দের সংখ্যাই বেশি, কিছু আছে আফ্রিকান। গত সপ্তাহে এই বাড়ি থেকে ১০ জন আমেরিকায় পালিয়ে গেছে, যার মধ্যে ৪ জন বাংলাদেশের!
বর্ডার পার হওয়ার বিশেষ কৌশল আছে। মোবাইল ফোনে দিক নির্দেশনা দেয় দালালরা। নির্দেশনা মতো হেটে গেলেই পার হওয়া যায় বর্ডার। আমেরিকায় ঢুকে পুলিশের কাছে ধরা দিলেই মিলে যায় ডকুমেন্ট! সেই ডকুমেন্ট দিয়ে কাজ পাওয়া নাকি বেশ সোজা। এসব তথ্য রুবেলই জানালো, তবে সে নিজে খুবই সচেতন, জানালো, যত কষ্টই হোক এখানেই (কানাডায়) থাকবেন !
ঠিক এক বছর আগে ছিলো উল্টো চিত্র!
এসাইলাম প্রার্থীরা নিউইয়র্ক সিটি থেকে পালাচ্ছে। তারা সীমান্ত ক্রস করে আশ্রয় প্রার্থনা করছে পার্শ্ববর্তী দেশ কানাডায়। নিরাপদ ও উন্নত জীবনের সন্ধানে তাদের এই নতুন করে অভিযান। সিটির ক্রাইম, ড্রাগ ও নিরাপত্তা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। তাদের ধারণা, ছেলেমেয়েদেরকে নিউইয়র্ক সিটিতে ভালোভাবে গড়ে তোলা যাবে না। ড্রাগের ছোবলে পারিবারিক নিশ্চয়তা ও শান্তি ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। তারা মনে করছে, কানাডায় সামাজিক সুবিধা বেশি ও নিরাপত্তা তুলনামূলকভাবে অধিক। তাই অনেকেই সিটির আশ্রয়স্থল ত্যাগ করে ছুটছেন কানাডার দিকে। এই প্রতিবেদন করেছিলো নিউ ইয়র্ক পোস্ট।
উত্তর আমেরিকা সম্পর্কে যারা খোঁজ খবর রাখেন তাদের জানা আছে ,বহু বছর ধরেই ইমিগ্রান্টদের আমেরিকা থেকে কানাডায় পালিয়ে আসার ইতিহাস রয়েছে। একজন দু’জন করে নয় হাজার হাজার। ইন্টারনেটে রক্সাম রোড সার্চ করলেই বর্ডার পার হয়ে আসার অনেক গল্প চোখের সামনে আসবে। অবৈধ ওই পথ পাড়ি দেয়া নিয়ে বিশ্বের প্রভাবশালী গণমাধ্যমের অসংখ্য প্রতিবেদন এবং ডকুমেন্টারি রয়েছে। চলতি বছর ইমিগ্রান্টদের কেন এই উল্টো শ্রোত! বিশ্বের শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ কানাডা ছেড়ে পাশের দেশ কেন হুট করে জনপ্রিয় হয়ে উঠলো?
ইমিগ্রান্টদের দেশ কানাডা। পৃথিবীর যেখানেই যুদ্ধ হোক, সেসব দেশের উদবাস্তু মানুষকে বুকে টেনে নেয় কানাডা। মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে সবাই এক নামে চিনে কানাডাকে! সাম্প্রতিক সময়ে সিরিয়া, ইউক্রেন, ফিলিস্তিন, আফগানিস্তানের মতো যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশ থেকে আসা মানুষদের আশ্রয় কেন্দ্র হয়ে উঠছে কানাডা। উত্তর আমেরিকার আরেক দেশ মেক্সিকোর জনশ্রোতও কানাডার দিকে। ফেডারেল সরকারের বেশকটি প্রোগ্রাম রয়েছে, যার মাধ্যমে পৃথিবীর নানা দেশ থেকে প্রতি বছর লাখো মানুষকে নাগরিকত্ব দিয়ে আনা হয়। পড়াশোনা করতে আসে বিপুল সংখ্যক স্টুডেন্ট। এখানকার লোকের মুখে মুখে ,গত দুই বছরে নাকি সবচেয়ে বেশি ভিজিট ভিসা ইস্যু করা হয়েছে। যাদের বেশিরভাগই এখানে এসাইলাম ক্লেম করেছে।
ফলত, কানাডায় দেখা দিয়েছে বাসস্থানের সংকট। ছোট হয়ে গেছে চাকরির বাজার। এই সংকট মোকাবিলা করতেই হিমশিম খাচ্ছে সরকার। সামনের বছর কানাডার ফেডারেল নির্বাচন, সাম্প্রতিক জরিপ বলছে এসব কারণেই জনপ্রিয়তায় বিস্তর ঘাটতিতে আছে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রডো।
কানাডার মতো শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ কিছু না ভেবে পরিকল্পনা করবে এটা কি করে হয়! নানা রকম প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খায়, কিছুতেই হিসাব মিলাতে পারি না। ইদানিং হিসাব মিলানোর এক বন্ধু জুটেছে। সিলেটের সাইকুল ইসলাম ভাই কানাডার মন্ট্রিয়ালে বাস করেন! দারুণ সমাজ সচেতন মানুষ। কানাডার খুটিনাটি সম্পর্কে বিস্তর খবর রাখেন। প্রায় প্রতি সপ্তাহে একটা বিকাল তার সাথে পার্কে বসে গল্প করি। গল্পে গল্পে আলাপ হচ্ছিলো কানাডা ছেড়ে বাঙ্গালীদের আমেরিকায় পাড়ি দেয়ার বিষয়টি নিয়ে। তিনি দারুণ একটি ব্যাখা দিলেন। এটি তার মনগড়া ব্যাখা নয়, একেবারে তথ্য-পরিসংখ্যান ঘেটে আমেরিকা-কানাডার তুলনামুলক পার্থক্য বের করেছেন।
কানাডা: মোট জিডিপি ২.২ ট্রিলিয়ন ডলার।
আমেরিকা: মোট জিডিপি ২৮ ট্রিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ আমেরিকার ইকোনমি কানাডার চেয়ে ১৩ গুণ বড়।
কানাডা: মোট ০২ কোটি মানুষ বিভিন্ন খাতে চাকুরি করেন। এর মধ্যে ৬৮ লাখ চাকুরিজীবী উচ্চ আয়ের বেতন পান।
আমেরিকা: মোট ১৬ কোটি মানুষ বিভিন্ন খাতে চাকুরি করেন। এর মধ্যে ৬ কোটি মানুষ উচ্চ আয়ের বেতন পান।
কানাডা: বাৎসরিক গড় বেতন ৫৪,০০০ কানাডিয়ান ডলার (বাংলাদেশী টাকায় ৪৪ লক্ষ টাকা)।
আমেরিকা: বাৎসরিক গড় বেতন ৬০,০০০ ইউএস ডলার (বাংলাদেশী টাকায় ৭৪ লক্ষ টাকা)।
কানাডা: ১ বেডরুম স্ট্যান্ডার্ড বাসা প্রতি মাসের গড় ভাড়া ১,৯২২ কানাডিয়ান ডলার (চলতি বছর)।
আমেরিকা: ১ বেডরুম স্ট্যান্ডার্ড বাসা প্রতি মাসে গড় ভাড়া ১,৫১৮ ইউএস ডলার (চলতি বছর)।
কানাডা: রিফিউজি কেইসের গড় এক্সেপ্ট হার ৬১% (২০১৩-২০২২ পরিসংখ্যান)। একটি রিফিউজি কেইস ফাইনালাইজের সময়কাল ৬ মাস থেকে ৩ বছর।
আমেরিকা: রিফিউজি কেইসের গড় এক্সেপ্ট হার ৫৮% (১৯৮০-২০২৩ পরিসংখ্যান)। একটি রিফিউজি কেইস ফাইনালাইজের সময়কাল ৬ মাস থেকে ০৭ বছর।
কানাডা: এসাইলাম এপ্লিকেশন প্রসেসিং ফি এটর্নি ১ হাজার ডলার থেকে ৩ হাজার কানাডিয়ান ডলার। তবে বিভিন্ন প্যারালিগ্যালরা তাদের চাহিদা অনুসারে বিভিন্ন অংকের টাকা ডিমান্ড করে থাকেন।
আমেরিকা: এসাইলাম এপ্লিকেশন প্রসেসিং ফি এটর্নি ১ হাজার ডলার থেকে ৭ হাজার ইউএস ডলার। ডিপোর্টেশন ডিফেন্স ৪ হাজার ডলার থেকে ১২ হাজার ইউএস ডলার।
কানাডা: পার্মানেন্ট রেসিডেন্টরা বৎসরে ৬০ হাজার ডলার আয় দেখালে প্রত্যেকে মা-বাবাকে কানাডায় নিয়ে আসার এপ্লিকেশন জমা দিতে পারে। তবে কোন কানাডিয়ান রেসিডেন্সই ভাই-বোনকে কানাডায় স্থায়ী ভাবে নিয়ে আসার আপাতত কোন সিস্টেম নেই।
আমেরিকা: পার্মানেন্ট রেসিডেন্টরা নির্দিষ্ট পরিমান আয় দেখিয়ে তার মা-বাবা, ভাই-বোন সহ পরিবারের সবাইকে আমেরিকায় নিয়ে আসার এপ্লিকেশন জমা দিতে পারে। একটি নির্দিষ্ট সময় পরে এই এপ্লিকেশনে পরিবারের সবাই আমেরিকায় চলে আসতে পারে।
কানাডা: গাড়ির ড্রাইভিং লাইসেন্স অর্জনকাল কমপক্ষে ১ বছর। কানাডায় গাড়ির ড্রাইভিং লাইসেন্স অর্জন পৃথিবীর কঠিনতম কাজের একটি।
আমেরিকা: এক মাসে গাড়ির ড্রাইভিং লাইসেন্স অর্জন সম্ভব এবং সহজ উপায়ে তা সম্ভব।
কানাডা: বেকার সংখ্যা ৬.২%
আমেরিকা: বেকার সংখ্যা ৪%
কানাডা: ৬৫% মানুষ নিজস্ব বাসা-বাড়িতে বসবাস করেন।
আমেরিকা: ৬৬% মানুষ নিজস্ব বাসা-বাড়িতে বসবাস করেন।
কানাডা: জনপ্রতি প্রতি মাসে গড় খরচ ১,৭০৮ কানাডিয়ান ডলার (১ লক্ষ ৪১ হাজার বাংলাদেশী টাকা)।
আমেরিকা: জনপ্রতি প্রতি মাসে গড় খরচ ২৫০০ থেকে ৩৫০০ ইউএস ডলার (৩ লক্ষ থেকে ৪ লক্ষ ৩০ হাজার বাংলাদেশী টাকা)।
কানাডা: কানাডিয়ানরা মিতব্যয়ী নিরিবিলি জীবন-যাপনে অভ্যস্ত এবং সেটি খুব পছন্দ করেন।
আমেরিকা: বিশ্বের সব বিখ্যাত এবং ধনকুবের মানুষের বসবাস এই দেশে। আমেরিকানরা আড়ম্বরপূর্ণ জীবন-যাপন ভালবাসেন।
কানাডা এবং আমেরিকায় ওয়ার্কার শ্রেনীর মানুষদের জন্য কানাডার বাৎসরিক গড় বেতন ৪৪ লক্ষ টাকা এবং আমেরিকায় বাৎসরিক গড় বেতন ৭৪ লক্ষ টাকা। একজন লোকের দুদেশের মধ্যকার বেতনের গড় পার্থক্য প্রায় ত্রিশ লক্ষ টাকা। এ থেকে স্পষ্ট কানাডার চেয়ে আমেরিকায় বেতন প্রায় দ্বিগুণ। এটি সবচে বেশী আকৃষ্ট করছে ইমিগ্রান্টদের।
এখন প্রশ্ন হলো সাইকুল ভাই যে তুলনামুলক পার্থক্য খুঁজে বের করলেন এই পার্থক্য কম বেশী সব সময়ে ছিলো। তাহলে মানুষ সব জেনেশুনে এক বছর আগেও কেন কানাডাকে বাসযোগ্য তালিকায় উপরে রাখতো? ইমিগ্রান্টরা সবার আগে চায় কোথায় সহজে মিলবে নাগরিত্ব, তারপর পর দেখে সমাজিক নিরাপত্তা। দুটির বিচারে এখনও এগিয়ে কানাডা!
শান্তির দেশ কানাডায় অশান্তিতে আছে মুলত ভিজিট ভিসায় বাংলাদেশ থেকে এসে যারা এসাইলাম ক্লেম করেছে। বিশেষ করে টরেন্টো ও মন্ট্রিয়াল শহর বেছে নিয়েছেন যে প্রবাসীরা। সবচে বেশী চাপে টরেন্টো, তারপর মন্ট্রিয়াল শহরের নতুনরা। এই দুটি বড় শহরে কাজের সুযোগ একেবারেই কম। যে সকল প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ আছে সেখানে আবার ইংরেজি কিংবা ফ্রেঞ্চ জানতে হয়। ভাষার দক্ষতা না থাকায় চাকুরি পাচ্ছে না দেশ থেকে আসা বেশীরভাগ মানুষ। সরকারের সোশ্যাল ডিপার্টমেন্ট থেকে যে অর্থ পাচ্ছেন তাতে বড় শহরে টিকে থাকা মুস্কিল হয়ে পড়ছে। ফলে বিকল্প পথ খুঁজতে গিয়ে আমেরিকায় পাড়ি দিচ্ছেন বহুসংখ্যক বাংলাদেশি।
অনেকে বুঝে না বুঝে কিংবা উপায়ন্তর না পেয়ে আমেরিকায় পাড়ি দিচ্ছেন! কিন্তু এভাবে একটা দেশে এসাইলম ক্লেম করে অবৈধভাবে আমেরিকায় পাড়ি দিলে শেষ পর্যন্ত সেখানে বৈধতা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে, দিনশেষে আম-ছালা দুটোই যাবে।
দেশীদের প্রতি অনুরোধ অবৈধ পথ পাড়ি দেয়ার আগে আরও একবার ভেবে নিন! সাময়িক ভালো থাকার আশায় সুন্দর ভবিষ্যত কেন নষ্ট করবেন?
সামসুর রহমান (আরেফিন), সাংবাদিক মন্ট্রিল, কানাডা